সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০, ০৮:৩১ অপরাহ্ন

Notice :

জীবন ঐতিহ্যের শিল্পরূপে সমৃদ্ধ বাংলা মঙ্গলকাব্যের ধারা

:: দুলাল মিয়া ::
বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগে বিশেষ এক শ্রেণির ধর্ম বিষয়ক আখ্যান কাব্য ‘মঙ্গলকাব্য’ নামে পরিচিত। এগুলি খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। এগুলো মূলত ধর্মমূলক আখ্যান কাব্য। ‘মঙ্গল’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘কল্যাণ’। যে কাব্যের কাহিনী শ্রবণ করলে সকল অকল্যাণ নাশ হয় এবং পূর্ণাঙ্গ মঙ্গল লাভ ঘটে, তাকেই মঙ্গলকাব্য বলা হয়। ‘মঙ্গল কাব্যে’র ‘মঙ্গল’ শব্দটির সঙ্গে শুভ ও কল্যাণের অর্থ সাদৃশ্য থাকা ছাড়া ও এসব কাব্যের অনেকগুলো এক মঙ্গলবারে পাঠ আরম্ভ হয়ে পরের মঙ্গলবারে সমাপ্ত হত বলে এ নামে অভিহিত হয়েছে।
বিভিন্ন দেব-দেবীর গুণগান মঙ্গলকাব্য গুলোর উপজীব্য। তন্মধ্যে স্ত্রী দেবতাদের প্রাধান্যই বেশি। মনসা ও চণ্ডী তাঁদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। লৌকিক দেব-দেবীর কাহিনী অবলম্বনে রচিত মঙ্গল কাব্যগুলোতে (ক) বন্দনা (খ) গ্রন্থরচনার কারণ বর্ণনা (গ) দেব-খণ্ড ও (ঘ) নরখণ্ড বা মূলকাহিনী বর্ণনা-মোটামুটি এই চারটি অংশ থাকত। কবি কাব্যে নিজের পরিচয় উল্লেখ করতেন।
‘মঙ্গলকাব্য’ প্রধানত কাহিনী কেন্দ্রিক। মূল কাহিনীর সঙ্গে দেবলীলা, ধর্মতত্ত্ব ও নানা ধরনের বর্ণনার এমন কাব্য বিপুলায়তন লাভ করেছে। কেউ কেউ ‘মঙ্গলকাব্য’কে সংস্কৃত পুরাণের শেষ বংশধর বলতে চান, কেউবা, তাকে মহাকাব্য বলেছে, কেউ মঙ্গল কাব্যকে ধর্মগ্রন্থ বলে ভক্তি করেন, আবার কেউবা এ ধরনের সাহিত্য সৃষ্টি থেকে বাংলার তৎকালীন যথার্থ ঐতিহাসিক রূপ সন্ধান করতে আগ্রহশীল। তবে ‘মঙ্গলকাব্য’ যে একটি মিশ্র শিল্প তাতে সন্দেহ নেই। সংস্কৃত পুরাণের সঙ্গে এর বৈশিষ্ট্যগত কিছু সাদৃশ্য আছে। পুরাণে যেমন দেব মাহাত্ম্য বা রাজবংশের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, ‘মঙ্গল কাব্যে’র সীমাবদ্ধ পরিসরে প্রায় অনুরূপ ব্যাপার আংশিকভাবে সমাধা হয়েছে বলে লক্ষ্য করা যায়। তবে ‘মঙ্গলকাব্যে’ সংস্কৃত পুরাণের আদর্শ সামান্য ছায়াপাত করলেও তাকে পুরোপুরি পুরাণ বলা যায় না। লৌকিক ও পৌরাণিক আদর্শ মিশ্রিত লৌকিক দেবদেবীর মহিমা প্রচারক এবং ভক্তের গৌরববাচক এই মঙ্গলকাব্যগুলো আখ্যান কেন্দ্রিক ধর্মীয় সাহিত্য হিসেবে গৃহীত হতে পারে। মঙ্গলকাব্যে লৌকিক গ্রামীণ সংস্কার আর্যেতর দেববিশ্বাস এবং পৌরাণিক ব্রাহ্মণ্য সংস্কার ও চিন্তা ধারা ক্রমে ক্রমে সমন্বয় লাভ করে।
মঙ্গলকাব্যের নায়ক স্বর্গ ভ্রষ্ট দেবশিশু। তিনি নানাবিধ মানবিক জ্ঞানের অধিকারী। মানুষের স্বীকৃতির মধ্যেই মঙ্গলকাব্যের দেব সমাজের প্রতিষ্ঠা। সুতরাং মঙ্গল কাব্য পরোক্ষভাবে মানুষেরই জয়গান। সার্বজনীন মানবতার বিকাশ সাধনের জন্য মঙ্গলকাব্যের কাব্য মূল্য অটুট রয়েছে। মঙ্গল কাব্যগুলি দেব-দেবীর কাহিনী অবলম্বনে রচিত হলেও এতে বাঙালি জীবনের ইতিহাস প্রতিফলিত হয়েছে। আসলে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের শক্তিশালী সব আর্য দেবদেবীর ভিড়ে বাংলার স্থানীয় সব দেবদেবীরা নিগৃহীত হতে হতে হারিয়ে যেতে বসেছিল। আর্য দেবসত্তাদের বিরুদ্ধে অনার্য দেবসত্তাদের এক অস্তিত্বের লড়াই থেকেই বাংলা সাহিত্যে সূত্রপাত ঘটেছিলো মঙ্গলকাব্য ধারার। প্রায় সব মঙ্গলকাব্যেই শক্তিশালী আর্য দেবসত্তার পরাজয় ঘটেছিলো সমাজে অনার্য দেবসত্তার পূজা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ‘মঙ্গলকাব্যের’ বিভিন্ন ধারা গুলো হলোÑ
এক. ‘মনসামঙ্গল’ বাংলা মঙ্গল কাব্যের ইতিহাসে ‘মনসামঙ্গল’ প্রাচীনতম। এ কাব্যের কাহিনী বাংলার আদিম লোক সমাজে প্রচলিত সর্প পূজার ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। সর্পের অধিষ্টাত্রী দেবী মনসা। লৌকিক ভয়ভীতি থেকেই এ দেবীর উদ্ভব। তাঁর অপর নাম কেতকী ও পদ্মাবতী। এই দেবীর কাহিনী নিয়ে রচিত কাব্যই ‘মনসামঙ্গল’ নামে পরিচিত। কোথাও কোথাও তা ‘পদ্মপুরাণ’ নামেও অভিহিত হয়েছে। ‘মঙ্গলকাব্য’ ধারায় ‘মনসামঙ্গল’ বিশিষ্টতা অর্জন করেছে নিয়তির বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহের কাহিনীর জন্য। ‘মনসামঙ্গলে’র কাহিনী খুব উচ্চ শ্রেণির নয়। এখানে অসম্ভব ও অবাস্তবতার চিত্র বেশ ফলাও করে অঙ্কিত হয়েছে। সপ্তডিঙ্গা মধুকবের জলমগ্নতা, লখীন্দরের মৃত্যু, বেহুলার স্বর্গযাত্রা এবং মৃত স্বামী ও স্বামীর ছয় ভাইয়ের জীবন ফিরিয়ে আনা। মনসাকে চাঁদের পূজা দান এবং পৃথিবীতে মনসার পূজা প্রচলন ইত্যাদি সব কিছুর মধ্যেই অবাস্তবতার ছাপ লক্ষণীয়। চাঁদ সওদাগরের চরিত্র মহিমাময় হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অনমনীয় পৌরষ ও নির্ভীক আত্মাভিমান বেদীমূলে নিষ্পেশিত হয়েছে। ফলে চাঁদ সদাগর ট্র্যাজেডির নায়কের মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে।
‘মনসামঙ্গল’র কবিগণের মধ্য কানাহরিদত্ত, নারায়ণ দেব, বিজয়গুপ্ত, বিপ্রদাস পিপিলাই, দ্বিজবংশী দাস প্রমুখ। তবে এঁদের মধ্যে কানা হরিদত্ত ছিলেন মনসা মঙ্গলে’র আদি কবি। বিজয় গুপ্তের রচনায় এর প্রমাণ পাওয়া যায়Ñ
“মুর্খে রচিল গীত না জানে বৃত্তান্ত।
প্রথমে রচিল গীত কানা হরিদত্ত।”
চতুর্দশ শতকের প্রথম দিকে তাঁর আবির্ভাব ঘটেছিল বলে অনুমান করা যায়। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ মনে করেন, ‘কানা হরিদত্ত ছিলেন পূর্ববঙ্গের অধিবাসী।’
কানাহরিদত্তের পরেই সাধারণত বিজয় গুপ্তের নাম নির্দেশিত হয়। বাংলা সাহিত্যে সুস্পষ্ট সন-তারিখ যুক্ত মনসা মঙ্গল কাজের কবি বিজয় গুপ্ত বিজয় গুপ্তের জন্মস্থান ছিল বরিশাল জেলার অন্তর্গত ফুল্লশ্রী গ্রামে। তাঁর জন্মকাল আনুমানিক ১৪৫০ খ্রি.।
বিজয় গুপ্তের মনসা মঙ্গল অত্যন্ত জনপ্রিয়তা অর্জন করে ছিল। কাহিনী পরিকল্পনায় যেমন তাঁর বৈচিত্র ছিল, তেমনি ছন্দের ক্ষেত্রে ও তিনি বৈচিত্র সৃষ্টি করেছিলেন। উপমা প্রয়োগে ও তাঁর অভিনবত্ব ছিল।
বিজয় গুপ্তের প্রায় সমসাময়িক মনসামঙ্গলের অন্যতম কবি বিপ্রদাস পিপিলাই। বিজয় গুপ্তের মনসা মঙ্গল রচনার এক বৎসর পর তিনি ‘মনসা বিজয়’ কাব্য রচনা করেন। কবি নিজের আত্ম পরিচয় দিয়েছেন এভাবেÑ
“মুকন্দ পণ্ডিত সূত বিপ্রদাস নাম।
চিরকাল বসতি বাদুড়্যা বটগ্রাম।”
কবি স্বপ্নাদেশ পেয়ে ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সুলতান হুসেন শাহের রাজত্ব কালে ‘মনসা বিজয়’ কাব্য রচনা করেন।
মনসামঙ্গল’র অন্যতম কবি নারায়ণ দেব। নারায়ণ দেবের উদ্ভব কাল নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। ষোড়শ শতকের শেষ পর্যায় বা সপ্তদশ শতকের প্রথম পর্যায় নারায়ণ দেবের উদ্ভব অনুমান করা যায়।
আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতে, ‘নারায়ণদেব পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে আবির্ভূত হয়ে ছিলেন।” আসামবাসীরা তাকে ‘আসামী কবি’ বলে দাবি করেন। আসাম প্রদেশে তাঁর ‘পদ্মপুরাণ’ পাওয়া গেছে। তাঁর কাব্যটি তিন খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম খণ্ডে কবির আত্মপরিচয় ও দেব বন্দনা, দ্বিতীয় খণ্ডে পৌরাণিক কাহিনী এবং তৃতীয় খণ্ডে চাঁদ সদাগরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে।
‘মনসামঙ্গল’র অন্যতম শ্রেষ্ঠকবি দ্বিজবংশী দাস। তিনি ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার পতুয়ারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিজবংশী দাস তাঁর কাব্যকে স্বতন্ত্র মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছিলেন। কাজের গতানুগতিক আদর্শের ক্ষেত্রেও তিনি নতুনত্ব এনেছিলেন।
দুই. মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মঙ্গল কাব্যের ধারায় ‘চণ্ডীমঙ্গল’ একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। চণ্ডীদেবীর কাহিনী অবলম্বনে রচিত ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য এ দেশে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা অর্জন করে ছিল। চণ্ডী দেবীর উৎপত্তি সম্পর্কে নানামত প্রচলিত। সম্ভবত বংলার বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র প্রকৃতির যে সব স্ত্রী দেবতার পরিকল্প না করা হয়েছিল, তা কালক্রমে চণ্ডীনামে পরিচিতি লাভ করেছে। এই চণ্ডী দেবীর কাহিনী অবলম্বনেই ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের ধারা রূপায়িত হয়ে ওঠেছে।
‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের কাহিনী দুই খণ্ডে বিভক্ত। প্রথম আক্ষেটিক খণ্ড এবং দ্বিতীয় বণিক খণ্ড। প্রথম খণ্ডে ব্যাধ কালকেতুর কাহিনী আর দ্বিতীয় খণ্ডে ধনপতি সদাগরের কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এ ধরনের দুটি কাহিনী কেবল চণ্ডীমঙ্গলেই পাওয়া যায়, অন্যান্য মঙ্গল কাব্যে একটি মাত্র কাহিনী রয়েছে। তবে অপরাপর মঙ্গলকাব্যের মতোই চণ্ডী মঙ্গলের দেবখণ্ড আছে। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কাহিনীতে ব্যাধের ওপর চণ্ডীর প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে সমাজের নিচু পর্যায়ের মানুষের মধ্যে পূজা প্রচারের কথাবলা হয়েছে; আবার বণিকের উপর প্রভাব বিস্তার করে অভিজাত শ্রেণির মানুষের মধ্যে চণ্ডীর পূজা প্রচারের কথা বর্ণিত হয়েছে। ‘চণ্ডীমঙ্গল’র কবিদের মধ্যে মানিক দত্ত, দ্বিজ মাধব, মুকন্দরাম চক্রবর্তী, প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য।
‘চণ্ডীমঙ্গল’র আদিকবি হিসেবে মানিক দত্তের নাম পাওয়া যায়। মানিক দত্তের রচনা পাঠ করে মনে হয় কবি গৌড়’বা মালদহের লোক ছিলেন। তাঁর কাব্যে যেসব নদ-নদী ও গ্রামের কথা বলা হয়েছে সেসব মালদহ অঞ্চলে বিদ্যমান। কবির আত্মপরিচয় থেকে জানা যায় যে, তাঁর নিবাস ছিল ফুলুয়া নগর। এ স্থানটিকে মালদহ জেলার বর্তমান ফুলবাড়ি বলে অনুমান করা হয়। সম্ভবত কবি ষোড়শ শতকের বহু পূর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন। চণ্ডীর উৎপত্তির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কবি যে সৃষ্টি তত্ত্বের বর্ণনা দিয়েছেন তার মধ্যে অভিনবত্ব আছে।
দ্বিজমাধব ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যের অন্যতম রচয়িতা। দ্বিজ মাধব তাঁর কাব্যের নাম কোথাও ‘সারদা মঙ্গল’, কোথাও ‘সারদা চরিত’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিন ১৫৭৯ খ্রিস্টাব্দে এ কাব্য রচনা করেন বলে জানা যায়। মানব চরিত্র বিশ্লেষণের বিশেষ ক্ষমতা থাকার ফলে তাঁর কাব্যে কালকেতু ও ফুল্লবার ব্যাধ জীবনের বৈশিষ্ট্য সার্থকভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন।
ষোড়শ শতকে চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের সর্বাধিক প্রসার ঘটে। এ ধারার শ্রেষ্ঠ কবি ‘কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চক্রবর্তী’। তাঁর আত্মবিবরণী থেকে জানা যায় যে, তিনি বর্ধমান জেলার দামুন্যা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানকার ডিহিদার বা প্রধান রাজকর্মচারী মাহমুদ শরীফের অত্যাচারে কবি জন্মভূমি পরিত্যাগে বাধ্য হন এবং মেদিনীপুর জেলার আড়রা গ্রামের ব্রাহ্মণ জমিদার বাঁকুড়া রায়ের আশ্রয় নেন। বাঁকুড়া রায় তাঁকে নিজপুত্র রঘুনাথের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করেন। অল্প দিন পর পিতার মৃত্যু হলে রঘুনাথ নিজে জমিদার হন এবং কবিকে গুরুরূপে মান্য করে নিজের সভাসদ হিসেবে স্থান দেন এবং এ সময় তিনি কাব্য রচনায় ব্রতী হন। রঘুনাথের সভা সদরূপে থাকাকালীন তাঁর নির্দেশে মুকুন্দরাম ‘শ্রী শ্রী চণ্ডী মঙ্গল কাব্য’ রচনা করেন। রঘুনাথ কবি প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তাঁকে ‘কবিকঙ্কন’ উপাধি দেন। মুকুন্দরামের জন্ম এবং তাঁর কাব্যের রচনা কাল সম্পর্কে পণ্ডিতদের মতবিরোধ রয়েছে। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের মতানুসারে, ‘আনুমানিক ১৫৩৭ খ্রি. অর্থাৎ ষোড়শ শতাব্দীর পূর্বভাগে কবি জন্মগ্রহণ করেছিলেন।’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লার মতানুসারে তাঁর কাব্যের রচনা কাল ১৫৯৪ খ্রিস্টাব্দের শেষ থেকে ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।
কাব্য রূপায়ণে তাঁর কৃতিত্ব অতুলনীয়। চারিদিকের জীবনের বিচিত্র পরিচয় তাঁর কাব্যে বিধৃত। মানব জীবন সম্পর্কে কবির সুগভীর ও সূক্ষ্ম অভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়। মুকন্দরামের পরেও অবশ্য অনেকে চণ্ডীমঙ্গল রচনা করেছেন।
‘চণ্ডীমঙ্গল’র পরবর্তী কবিগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- দ্বিজরামদেব। তাঁর কাব্যের নাম ‘অভয়ামঙ্গল’। এ কাব্যটি ১৬৫৩ খ্রিস্টাব্দে রচিত হয়। কবি দ্বিজরামদেব দ্বিজমাধবকে অনুসরণ করে একাব্য লেখেছিলেন। ফলে তাঁর রচনায় বিশেষ কোনো মৌলিকতা নেই।
মুক্তারাম সেন চণ্ডীমঙ্গলের অন্যতম কবি। তিনি চট্টগ্রাম জেলার দেবগ্রাম বা বর্তমান আনোয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর কাব্যের নাম ‘সারদা মঙ্গল’। এ কাব্যটির রচনা ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে সম্পন্ন হয়।
সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে কবি হরিরাম ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্য রচনা করেন। তবে তাঁর এ কাব্যটিতে মুকুন্দরামের প্রত্যক্ষ প্রভাব বিদ্যমান।
চণ্ডীমঙ্গলের সর্বশেষ কবি অকিঞ্চন চক্রবর্তী। কবির নিবাস ছিল মেদিনীপুরের ঘটাল মহকুমার বেঙ্গারাল গ্রামে। কবির উপাধি ছিল ‘কবীন্দ্র’।
তিন. ধর্ম ঠাকুর নামে কোনো এক পুরুষ দেবতার পূজা হিন্দু সমাজের নিচু স্তরের লোকদের মধ্যে বিশেষত ডোম সমাজে প্রচলিত ছিল। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, “ধর্ম ঠাকুর হচ্ছেন বৌদ্ধ ধর্মেরই প্রচ্ছন্ন রূপ।” কিন্তু আধুনিক পণ্ডিতেরা একে বৌদ্ধ বেদতা না বলে সুদূর বৈদিক যুগের দেবতা রূপে বিবেচনা করেন। রাঢ় দেশে ধর্মঠাকুর একখনো জাগ্রত দেবতা, এখনো মহা সমারোহে তাঁর পূজা হয়ে থাকে। ধর্ম ঠাকুরের মাহাত্ম্য প্রচারের জন্য ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্য ধারার সূত্রপাত হয়েছে। ধর্ম মঙ্গল কাব্যের দুটি কাহিনী (১) রাজা হরিশ চন্দ্রের কাহিনী এবং (২) লাউসেনের কাহিনী। এর মধ্যে লাউসেনের কাহিনীই কাব্যে অধিকতর প্রাধান্য পেয়েছে। ঐ কাব্যের কবিদের মধ্যে ময়ূর ভট্ট, আদিরূপ রাম, খেলারাম, মানিকরাম, সীতা রাম দাস প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
মঙ্গলকাব্য ধারার সর্বশেষ কবি ভারত চন্দ্র রায় গুণাকর। তিনি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য অন্যতম শেষ কবি হিসেবেও মর্যাদার অধিকারী। মহারাজ কৃষ্ণ চন্দ্রের আদেশে তিনি ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্য রচনা করেন। তাঁর কাব্যে আধুনিকতার ছোঁয়া লক্ষ্য করা যায়।
এই সমস্ত মঙ্গলকাব্য ছাড়াও রয়েছে কালিকামঙ্গল, শিবমঙ্গল, ষষ্ঠীমঙ্গল, শীতলামঙ্গল, তীর্থমঙ্গল, ইত্যাদি। বাংলাদেশ বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে। এ রূপ অবস্থায় লৌকিক ও বহিরাগত বিভিন্ন ধর্মের যে সমন্বয় সাধিত হয়েছে, তারই চমৎকার ইতিহাস হচ্ছে ‘মঙ্গল কাব্য’। মঙ্গল কাব্যের উদ্ভব, বিকাশ এবং শেষ পরিণতি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এগুলোতে বাঙালি জীবনের ইতিহাস প্রতিফলিত হয়েছে। মধ্যযুগের বাংলার জীবন ইতিহাসে বহু অপ্রাপ্ত তত্ত্বের শূন্যস্থানপূর্ণ করেছে মঙ্গলকাব্য। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মঙ্গলকাব্যের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। এগুলো মূলত প্রাপ্ত জীবন ঐতিহ্যের শিল্পরূপ।
[লেখক: কবি ও প্রভাষক (বাংলা বিভাগ), জাউয়াবাজার ডিগ্রি কলেজ]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী