শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৪৫ অপরাহ্ন

Notice :

পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণ : চতুর্থ দফা বন্যার শঙ্কা

বিশেষ প্রতিনিধি ::
বন্যা পিছু ছাড়ছেনা সুনামগঞ্জবাসীর। এর আগে টানা তিন বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। এখন চতুর্থ দফা বন্যার মুখে সুনামগঞ্জ। গত তিন দিনে মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণে সুনামগঞ্জের সীমান্ত নদ-নদীসহ প্রধান নদী সুরমার পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। সুনামগঞ্জ পয়েন্টে সুরমার পানি শুক্রবার বিকেল ৩টায় বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বিপৎসীমার ৭.৮০ মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদিকে বন্যায় চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন আমনচাষী ও মৎস্যখামারিরা। একমাস বিলম্বিত চাষের পর কোনরকম ক্ষতি মেনে নিয়েই আমন চাষ করেছিলেন কৃষকরা। এখন সেই জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। পুরো ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় পানি কমলে কাচা ধানক্ষেত নেতিয়ে পড়ে নষ্ট হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, গত ৪৮ ঘণ্টায় চেরাপুঞ্জিতে প্রায় সাড়ে ৪শ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এই পানি এসে নামছে ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জে। সীমান্ত নদী উপচে পানি এসে প্রধান নদী সুরমায় চাপ সৃষ্টি করেছে। শুক্রবার দুপুর ৩টায় সুরমার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে ৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চলের রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি ও আমনক্ষেত ডুবে গেছে। এভাবে ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকলে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর সড়ক বিভিন্ন স্থানে ডুবে গেছে। এতে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে।
জানা গেছে, গত ২৬ জুন প্রথম দফা বন্যা হয় সুনামগঞ্জে। এতে প্রায় লাখো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘরবাড়ি ডুবে যায়। দ্বিতীয় দফা বন্যা হয় ৯ জুলাই ও ৩য় দফা বন্যা হয় ১৯ জুলাই। ওই দুটি বন্যায়ও লাখো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৫০০ আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয় জেলার বিভিন্ন স্থানে। টানা তিন বন্যায় জেলার প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পুকুরের শত কোটি টাকার মাছ ও অবকাঠামোর ক্ষতি হয়। টানা তিন বন্যায় বিলম্বিত হয় আমনচাষ। কৃষি বিভাগের মতে বিলম্বিত আমনচাষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর শেষ হয়। তাই সদ্য লাগানো এই ধান এখনো কাঁচা রয়ে গেছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা বর্ষণে বিভিন্ন এলাকার সদ্য লাগানো আমনক্ষেত ডুবে গিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। তবে গতকাল শুক্রবার হঠাৎ করে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার, সুনামগঞ্জ সদরের প্রায় সব আমনক্ষেত তলিয়ে গেছে। বিস্তৃত আমনক্ষেতে কোমর পানি দেখা গেছে।
শুক্রবার সকালে সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়ন ও তাহিরপুরের উত্তর বড়দল ইউনিয়নে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, আমনক্ষেতে এখন কোমর পানি। এখানে আমন ক্ষেত ছিল দেখে বুঝার উপায় নেই। ক্ষেতের পাশে অসহায় থাকিয়ে আছেন অনেক কৃষক। তারা বিশ্বাস করতে পারছেন না এক রাতের ব্যবধানে তাদের ক্ষেত এভাবে ডুবে যাবে।
সদর উপজেলার বড়ঘাট গ্রামের কৃষক সাজ্জাদুর রহমান বলেন, আমার সইত্তর বছরের জীবনে ইলা চাইরবার পাচবার বন্যা দেখছিনা। গিরস্থি খরছিলাম টাইন্যা টুইন্যা। এখন পানি আইয়া বুরাইয়া নষ্ট খইরা গেছেগি ধান।
একই এলাকার কুতুবপুর গ্রামের কৃষক সমিরুল ইসলামকে দেখা গেল তার স্কুল পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে মাছের খামার নেট দিয়ে মাছ আটকানোর চেষ্টা করতে। তবে রাতেই তার অনেক মাছ ভেসে গেছে। তিনি বলেন, বন্যায় চাইরবার মাছ ভাসাইয়া নিছে। এখন আমনের সব রোয়া নষ্ট খরিলিছে। বন্যায় সব লাইটখাট অইগিছে। আমার ২০ কিয়ার জমির পানির নিছে। ইবার আনা খাইয়া থাকতো অইব।
তাহিরপুরের উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রাজাই গ্রামের আদিবাসী নেতা এন্ড্রু সলোমার বলেন, আমার তিন একর জমি গত ১৫ সেপ্টেম্বর তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। এখন অবশিষ্ট ক্ষেতও বৃহস্পতিবার রাতে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। এখন পানি কমলেও আর ফলন পাওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, টানা চার বন্যার কারণে আমনচাষীরা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সালাহ উদ্দিন টিপু বলেন, তিনবারের বন্যার কারণে এবছর সুনামগঞ্জে আমনচাষ একমাস বিলম্বিত হয়েছে। এখন চতুর্থ দফা পানি এসে ক্ষেত ভাসিয়ে নিয়েছে। এখন ঢল ও বর্ষণে আমনক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরা বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। পানি না নামলে এবার আমন উৎপাদন ব্যাহত হবে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সবিবুর রহমান বলেন, চেরাপুঞ্জিতে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে আমাদের এখানে ঢলের পানি নেমে পানি বাড়ছে। সকালে সুরমার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ জেলায় ৩৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এভাবে চললে চতুর্থ দফা বন্যার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে শুক্রবার সকাল থেকে সুনামগঞ্জ-বিশ্বম্ভরপুর-তাহিরপুর উপজেলা সড়কের তিনটি স্পটে উপজেলা সড়ক ডুবে গেছে। এর আগের বন্যায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলো আবারও ডুবে গিয়ে নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শুক্রবার দুটি উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত লক্ষ করা গেছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, নদীর পানি বিপৎসীমার উপরে উঠার পর পর বন্যার আশঙ্কাকে সামনে রেখে বন্যা মোকাবেলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আমি সকল উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে বন্যা মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত থাকতে নির্দেশ দিয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী