শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২০, ০৬:৪৭ অপরাহ্ন

Notice :

জলাবদ্ধতা, বান এবং পরিত্রাণ : সুখেন্দু সেন

পাহাড়ি ঢল, অতিবৃষ্টিতে ভাটি এলাকার বন্যা নতুন কোনো বিষয় নয়। কখনও অকালে নামে, কখনও ভরা মৌসুমে। অকাল বানে ফসলরক্ষা বাধ ভেঙ্গে তলিয়ে যায় হাওরের ফসল। কৃষকের হাহাকারে হাওরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। বৈশ্বিক মহামারীর বিপর্যস্ত সময়ে প্রকৃতির উদারতায় এবার তেমনটি ঘটেনি। যদিও ধানের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তিতে অনিশ্চয়তা তবুও ভালোভাবে বৈশাখের ফসল তুলতে পারায় কৃষকের মনে ছিল স্বস্তি।
প্রাকৃতিক নিয়মে যথাসময়েই মৌসুমী বৃষ্টি হচ্ছে। আমাদের কাছাকাছি বিশ্বের সর্বাধিক বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা চেরাপুঞ্জি এবং নাক বরাবর মওশন্ডরামে বৃষ্টির পরিমাণ বেশি হওয়ায় নেমে আসা ঢল এবং আষাঢ়ের অতিবর্ষণ ভরাট নদীগুলো ধারণ করতে না পারায় কূল ছাপিয়ে জনপদ ভাসিয়ে দিয়েছে। ফলে বানভাসি মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। একে তো করোনার কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত তার উপর বানের আঘাতে দুর্ভোগের মাত্রাটা আরো বেড়েছে।

বানে-জলে অভ্যস্ত ভাটির মানুষ। ছয়মাস জলাশ্রয়ী আর ছয়মাস স্থলাশ্রয়ী জীবনে বরং বর্ষাকালটাই ভাটি এলাকার জনজীবনের জন্য অনুকূল বলে বিবেচিত হয়ে আসছে আদিকাল থেকে। বর্ষায় জল হবে, মাঠ ঘাট ভরবে, আউশের ক্ষেত জল ভরভর হবে, নদী ভরবে, হাওরে ঢেউ উঠবে, আফাল বইবে এটাই স্বাভাবিক। আমাদের বালু-পাথর, ধান, মাছের যে গৌরব তা এই বর্ষারই অবদান। হাওরে হাওরে বিপুল জলরাশি আমাদের স¤পদ। কিন্তু প্রকৃতি ও পরিবেশ বিরুদ্ধ উন্নয়ন, অপরিকল্পিত সড়ক, বাঁধ নির্মাণ স্বাভাবিক পানি প্রবাহকে বিঘিœত করে প্রায় বছরই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলে। সেই সঙ্গে রয়েছে নদী ভরাট এবং খালগুলি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। পাকিস্তান আমল থেকেই পূর্ববঙ্গের ন্যায্য ও জনপ্রিয় দাবি ছিল বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান। কিন্তু স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর অতিক্রান্ত হলেও সে সমস্যার সমাধান না হয়ে সমস্যা আরো তীব্র হয়ে উঠেছে। নদী-খাল ভরাট হয়ে যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলেও এখন খুব একটা খাল দেখা যায় না। দেখা যায়না তেমন নৌ চলাচল। ঢলের পানি ধারণ করার মতো জায়গা কোথায়, আর পানি নেমে যাওয়ার পথ কোথায়।

বাঁধ দিয়ে পানির স্বাভাবিক গতি রোধ করে বন্যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে বলে মনে হয় না, ফসল রক্ষা, শহর রক্ষা করাও যাবে না। এটি পরীক্ষিত সত্য। কখনও তা হিতে বিপরীতও হয়।
মৌলভীবাজারের মনু নদীর বাঁধ কি ভয়াবহ বিপদ ডেকে এনেছিল তাঁর উদাহরণ চোখের সামনেই রয়েছে। নদী খননের পরিকল্পনার কথা দীর্ঘদিন থেকেই শুনা যাচ্ছে। শুধু সুনামগঞ্জের নদীই নয়, মেঘনা নদীর মোহনা খনন করে সমুদ্রমুখী পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করে তোলার পরিকল্পনাও নাকি রয়েছে। কিন্তু তা কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে বা কি গতিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা নেই।

খোদ রাজধানী থেকে আরম্ভ করে অনেক শহরেই জলাবদ্ধতা এক ভয়াবহ সমস্যা। আমাদের সুনামগঞ্জও এর ব্যতিক্রম নয়। গেলোবার ঠিক এমনি সময়ে শহর প্লাবিত হয়েছিল। যদিও এর স্থায়িত্বকাল ২৪ ঘণ্টার বেশি ছিল না। কিন্তু কারণটা একই। আষাঢ়ের বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢল নদীর দু’কূল ছাপিয়ে অলিগলি দিয়ে ঢুকে যায় শহরে। নববর্ষার উচ্ছল জল বেরুবার পথ না পেয়ে ঢু মারে পৌরবাসীর ড্রয়িং রুমে, রান্না ঘরে, বেডরুমে। আচমকা আক্রমণে বিপর্যস্ত নাগরিক জীবন। এর তিন মাস পর অক্টোবরে ক’দিনের বর্ষণ আবার প্লাবিত করেছিল শহরের রাস্তাঘাট। এবারের স্থায়িত্বকালটা বেশি হওয়ায় দুর্ভোগটাও বেশি। সময়টাও দুর্দশাগ্রস্ত, হতাশা জর্জর।

বন্যাকাল একসময় অতিবাহিত হবে। মানুষের জীবনে একদিকে অন্তত স্বস্তি ফিরবে। অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, জলাবদ্ধতা, জনদুর্ভোগ নিয়ে কিছুদিন আলোচনা-সমালোচনা চলবে। বানের পানি পৌরসভার ক্ষিণকায়া ড্রেন দিয়ে নিষ্ক্রমণ হলো নাকি বসতবাড়ির এ-দরজা দিয়ে ঢুকে ও-দরজা দিয়ে বেরুলো তা নিয়ে বিতর্ক হবে। বিতর্ক ভালো, তা যদি গঠনমূলক হয়। সমাধান মিলে। পানি যাওয়ার পথও হয়তো খুলবে।
বাস্তবিক অর্থে জলাবদ্ধতা বর্ধিষ্ণু সুনামগঞ্জ শহরের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগজনক সমস্যা। অল্প বৃষ্টিতেই জমাজল পথ খুঁজে পায় না। আটকে থাকে রাস্তার খানাখন্দে। নামমাত্র ফুটপাত দোকানদার, ফার্নিচার মার্ট, ওয়েলডিংওয়ালাদের দখলে। রাস্তার উপর মাসের পর মাস নির্মাণসামগ্রীর জঞ্জাল। রেস্টুরেন্টের জ্বলন্ত উনুন ফুটন্ত কড়াই নিয়ে ফুটপাতে অবস্থান নিয়ে তাপ ছড়ায়, পুরী-ভাজির ঘ্রাণও ছড়ায়। আর পথচারী বড় কষ্টে খানাখন্দ টপকে গা বাঁচিয়ে কোন রকমে পথ চলেও শেষ রক্ষা করতে পারে না। রাস্তাভরা অটো, সিএনজি, লেগুনা, প্রাইভেট কারের ত্রস্ত্রগতি ডোবাজলের পিচকারীতে পথচারীর ইজ্জতে হরহামেশাই কাদা লেপে দেয়।
শহরের বুক চিরে বহমান কিছু খাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অনেক আগেই। এগুলির স্বাভাবিক প্রবাহ থাকলে তা হতো শহরের জীবন রেখা, সৌন্দর্যে এবং প্রয়োজনে।

শহর ড্রেনগুলিও প্রায় ভরাট। একসময় সুনামগঞ্জ শহরের রাস্তার দু’পাশ খোলামেলা, ডোবা, পুকুরে পরিপূর্ণ ছিলো। প্রায় প্রতিটি বাসাবাড়ির সামনে পেছনে খালি জায়গায় ফুলবাগান, সবজিবাগান, গাছগাছালি। সত্যিকারের একটি পরিচ্ছন্ন ‘গ্রামশহর’। সময় বদলে গেছে। গ্রাম ছেড়ে শহরমুখিতায় জনভারাক্রান্ত পৌর এলাকায় পরিকল্পিত নগরায়ন হচ্ছে না। অতিবাণিজ্যিক চিন্তাভাবনায় সবকিছুই ইটপাথরে পূর্ণ হতে চলেছে। কেউ একইঞ্চি জায়গাও খালি রাখতে রাজি নয়। না চলাচলের জন্য, না জল নিষ্কাশনের জন্য।

এমনকি নিত্যদিনকার ময়লা-আবর্জনাও ফেলা হয় রাস্তার উপর যত্রতত্র। অনেক বাসাবাড়ির সেফটিক টেংকির সংযোগও দেয়া হয়েছে পৌরসভার আবদ্ধ ড্রেনে। ফলে ময়লা ভারাক্রান্ত ড্রেন ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। কার্যত আমরা শহরবাসীরাই কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে শহরটিকে আবদ্ধ করে ফেলতে বহুলাংশে দায়ী। বাদবাকি দায় নিশ্চিতভাবেই তাদের, যারা পৌরশহরটিকে পরিচ্ছন্ন রাখা, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা, অবৈধ স্থাপনা, অবৈধ দখল উচ্ছেদের দায়িত্বে নিয়োজিত।
মূলত গণসচেতনতা ও সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত ঐকান্তিক উদ্যোগই পারে সুনামগঞ্জ শহরটিকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষা করে বসবাসযোগ্য একটি সুন্দর পরিচ্ছন্ন শহরের পরিচয় নিশ্চিত করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী