শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৮:২০ অপরাহ্ন

Notice :

সুনামগঞ্জ কলেজের বিস্মৃত যোদ্ধা শহীদ মুহম্মদ আলী আসগর : শামস শামীম

বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ মাস্টারদা সূর্যসেন মহাপ্রয়াণের আগে বলেছিলেন, ‘মৃত্যু আমার দরজায় এসে গিয়েছে… এতো সুন্দর, এতো কঠিন… এতো পূতপবিত্র সময়ে আমি তোমাদের জন্য কী রেখে যাব? একটাই জিনিষ। সেটা হচ্ছে আমার স্বপ্ন মুক্ত ভারতের সোনালী স্বপ্ন…।’ পৃথিবীর মহাবিপ্লবীদের আত্মদান বৃথা যায়নি। তারা যে স্বপ্ন ও আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জনগণমনে আসন গ্রহণ করেছিলেন আজতক তা থেকে বিচ্যুত হননি। দিনকে দিন তাদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণায় সংক্রমিত হচ্ছে পৃথিবীর মানুষ।
আমাদেরও এমন প্রেরণাময় অনেক অগ্নিপুরুষ ছিলেন। সুনামগঞ্জ কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জগৎজ্যোতি দাস, শহীদ গিয়াস উদ্দিন, শহীদ তালেব আহমদ ও শহীদ মুহম্মদ আলী আসগর এমনই উজ্জ্বলতম নক্ষত্রনাম। তাঁরা পাকিস্তানী হানাদারমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন প্রথম যৌবনেই। সেই স্বপ্নে উজ্জীবিত হয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে জাতিরাষ্ট্রের জন্মযুদ্ধে জড়িয়েছিলেন। পৃথিবীর বুকে নিজস্ব পরিচয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। সেই স্বপ্নবুনন ও বাস্তবায়নে পাকিস্তানী হানাদারদের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে যৌবনের সোনারঙ দিনগুলো ব্যয় করেছিলেন। একটি অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক মানবিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন ছিল তাঁদের। পৃথিবীর সুন্দরতম সেই স্বপ্ন আজও পূর্ণ না হলেও তাঁদের আত্মদানে আমরা নতুন পরিচয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি। মহতী আত্মদানের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের সুফল ভোগ করেছি আমরা।
আমাদের জাতিরাষ্ট্র বিনির্মাণে মহান মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জ কলেজের ছাত্রদেরও গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। জাতির এই নক্ষত্র সন্তানেরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রোজ্জ্বল কিংবদন্তি। তবে নিজ প্রতিষ্ঠানে স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও তারা এখনো বিশেষ চর্চার বাইরে রয়ে গেছেন। একটি অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক রাষ্ট্র-সমাজ গঠনের জন্য আত্মদানকারী বীর যোদ্ধাদের জীবন ও কর্মে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করা প্রয়োজন। কারণ এই শিক্ষার্থীরাই একদিন রাষ্ট্রকাঠামোয় অবস্থান করে জাতি নির্মাণের কারিগর হিসেবে কাজ করবেন। কিন্তু কলেজের শিক্ষার্থী হিসেবে শহীদ চার বীর যোদ্ধা শহীদ মুহম্মদ আলী আসগর, শহীদ জগৎজ্যোতি দাস, শহীদ গিয়াস উদ্দিন ও শহীদ তালেব আহমদ বহুল চর্চিত হয়ে ওঠেননি। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের অনেকেই তাঁদের গৌরবের কথা জানেনা। তাদের অবদান জানানোটা একটা ঐতিহাসিক কর্তব্য বলে মনে করি। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কলেজের ছাত্র শহীদ জগৎজ্যোতি ও তালেব আহমদ বাদে অন্য দুইজন শহীদ গিয়াস উদ্দিন ও শহীদ মুহম্মদ আলী আসগর অনেকটাই অনালোচিত। বিশেষ করে মুহম্মদ আলী আসগর ইতিহাসের বিস্মৃতপ্রায় এক হারিয়ে যাওয়া যোদ্ধার নাম।
সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের ভাটি এয়ারাবাদ গ্রামের লালফর মিয়া ও মালেকা বানু দম্পতির সন্তান মুহম্মদ আলী আসগর। ৫ ভাই ও ৬ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। দিরাই উপজেলার রাজানগর হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৬৯ সনে। একই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন তালেব আহমদও। দুইজনই অন্তপ্রাণ বন্ধু ছিলেন। একসাথেই প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল ছাত্রলীগে নেতৃত্ব দেন। আলী আসগর ১৯৬৯-১৯৭০ সনের কমিটিতে ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭১ সনে তিনি ছাত্রলীগের কোষাধ্যক্ষ হয়েছিলেন বলে সাবেক ছাত্রনেতারা জানিয়েছেন। ১৯৬৯-১৯৭০ শিক্ষাবর্ষে তিনি সুনামগঞ্জ কলেজের বাণিজ্য বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ১৯৭১ সনে এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল তাঁর। এর আগেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে দেশের পক্ষেই অবস্থান নেন। প্রতিরোধ যুদ্ধেও সক্রিয় ভূমিকা ছিল মুহম্মদ আলী আসগরের।
সহযোদ্ধারা জানান, মুহম্মদ আলী আসগরের বিরাট নেতৃত্বগুণ ছিল। ছাত্র ইউনিয়নের বিপুল স্রোতের সময় যারা ছাত্রলীগের ঝাণ্ডা ধরেছিলেন তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তখন কলেজই ছিল রাজনীতির মূল জায়গা। নেতাদের ভরসা ও প্রচারকাজের মূলে ছিলেন ছাত্রনেতারাই। কলেজে ছাত্রলীগের কার্যক্রম বেগবান করতে মুজিবুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে কাজ করেন আলী আসগরসহ ছাত্রলীগ নেতারা। রাজনীতি পাগল এই ছাত্রনেতা প্রিয় বন্ধু ও একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক তালেব আহমদের সঙ্গে একই সময়ে প্রতিরোধ যুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সুনামগঞ্জ শহরে পাকিস্তানী আর্মিরা আসার পর ছাত্রনেতারা সাধারণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে যে জমায়েত করেছিলেন তাতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন আলী আসগর। প্রতিরোধ মিছিলে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে তিনিও যোগ দেন। ওই প্রতিরোধ যুদ্ধে প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এক কাতারে থেকে কাজ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে মুহম্মদ আলী আসগর দেশের জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নেন। কলেজে লেখাপড়া ও ছাত্র আন্দোলনের যুক্ত থাকায় অনেক বিষয়েই অভিজ্ঞ ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশ নেওয়ার বিষয়টি জানতোনা পরিবার। শেষ দিকে তাঁর ছোটভাই বিশ্বম্ভরপুরের চিনাকান্দি এলাকায় তালেব আহমদের সঙ্গে দেখা করে জানতে পারেন তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। এসময়ই পরিবার জানতে পারে মুহম্মদ আলী আসগর যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। সম্ভবত শাল্লার মাহমুদ নগরের এক ন্যাপ নেতার ছেলে জয়নালসহ কিছু তরুণ স্থানীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করেন। তারা স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা করে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা নেন। মুহম্মদ আলী আসগরও ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন। জুলাইয়ে শাল্লা উপজেলার আঙ্গাউড়ার কাছে এক মাঝিসহ শহীদ হন মুহম্মদ আলী আসগর। জয়নাল-আলী আসগর বাহিনীর অন্যরা পরে টেকেরঘাট সাবসেক্টরে যুদ্ধ করেন।
পরিবারের লোকজন জানিয়েছেন মুহম্মদ আলী আসগর নিয়মিত ডায়েরি লিখতেন। রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলির বিষয়ে ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করতেন। পাশাপাশি তার ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও রাজনৈতিক তথ্যও লিপিবদ্ধ থাকতো এই ডায়েরিতে। সেই মূল্যবান ডায়েরিটাও হারিয়ে গেছে।
বীরযোদ্ধা মুহম্মদ আলী আসগর সম্মুখ সমরে বীরোচিত ভূমিকা রাখলেও সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তিনি সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত। তাঁর নাম শহীদ মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই। সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদও এই যোদ্ধাসহ অন্যান্য শহীদ যোদ্ধা বা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সংগ্রহে তেমন কোন কাজ করেনি। বরং অফিসে মুক্তিযুদ্ধ সংক্রান্ত যেসব তথ্য ছিল তাও গায়েব হয়ে গেছে এমন অভিযোগ করেন খোদ মুক্তিযোদ্ধারাই। সুনামগঞ্জ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের মুক্তিযুদ্ধের নানা দলিল ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সময়ের শহীদদের তালিকায় নাম পাওয়া যায়নি মুহম্মদ আলী আসগরের।
গত কয়েক বছর ধরে শহীদ মুহম্মদ আলী আসগরের ভাতিজা মকবুল হোসেন তার চাচার স্বীকৃতির জন্য এখন চেষ্টা করছেন। মুজিব বাহিনীর নেতা মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুর রহমান চৌধুরী কিছুদিন আগে তাঁর স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর ভাতিজা মকবুলকে পুরনো পত্রপত্রিকাসহ এ সংক্রান্ত বেশ কিছু তথ্য সংগ্রহের কথা বলেছিলেন। কিন্তু তিনি মারা যাওয়ায় এখন সব ভেস্তে গেছে। তাই হতাশ আলী আসগরের পরিবার।
মুক্তিযুদ্ধের পরপর গোলাম রব্বানী ও গৌরাঙ্গ দেশী সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বিন্দু বিন্দু রক্তে’ পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের যে তালিকা ছাপা হয়েছিল তাতে মুহম্মদ আলী আসগরের নাম ছিল। একই সময়ে মহকুমা লেখক বুলেটিন শিরোনামে ছাত্রলীগ নেতা নূরুজ্জামান শাহী, মনোয়ার বখত নেক, রঞ্জিত চৌধুরী ও আব্দুন নূরের যৌথ প্রকাশনায় মুর্শেদি প্রেস থেকে প্রকাশিত ও আব্দুল হাই সম্পাদিত অর্ধ সাপ্তাহিক ‘দেশের কথা’ নামক বুলেটিনেও মুহম্মদ আলী আসগরের নাম ছিল। এই দেশের কথার প্রধান কারিগর ছিলেন আব্দুল হাই।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সরকারি কাগজপত্রে মুহম্মদ আলী আসগরের তথ্য না থাকলেও যুদ্ধের পরপরই সুনামগঞ্জ থেকে প্রকাশিত সংবাদপত্রে মুহম্মদ আলী আসগরের নাম শহীদ তালিকায় ছিল। যার কপি এখনো বিভিন্ন স্থানে সংরক্ষিত আছে। স্বীকৃতিহীন এই শহীদ যোদ্ধার ছাপার হরফের সেই নাম আমাদের যেন উপহাস করে চলছে। রাষ্ট্র ও সরকার তার স্বীকৃতিতে এগিয়ে আসবে এই প্রত্যাশা করি।
(মুহম্মদ আলী আসগরের ছবিটি তার পরিবারের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন লেখক)
[শামস শামীম: কবি ও সাংবাদিক। সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রাক্তন ছাত্র।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী