বুধবার, ০৩ মার্চ ২০২১, ০১:১৫ পূর্বাহ্ন

Notice :

শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা : ইয়াসমিন নাহার রুমা

মানব জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় হচ্ছে শৈশব। প্রতিটি শিশুই স্রষ্টার অপার বিস্ময়ের চাদরে আবৃত এবং সেই আবৃত চাদর অনাবৃত করার প্রচেষ্টা প্রতিটি শিশুর মাঝে বিরাজমান। বিস্ময়ের জগত নিয়ে শিশুদের ভাবনার অন্ত নেই। আজকের শিশুর হাতেই বর্তাবে আগামী পৃথিবীর স্বপ্ন নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তারাই আগামীর কর্তা, আগামীর নায়ক। প্রতিটি শিশুই জন্মের সময় নানা প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে যা তার অন্তরে লুকায়িত থাকে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার লুকায়িত প্রতিভা বিকশিত হয় আপন মহিমায়। সঠিক পরিচর্যা, পর্যাপ্ত আলো বাতাসে যেমন ছোট চারাগাছ মহীরুহে আবির্ভূত হয়। তেমনি শিশুর সার্বিক বিকাশে প্রয়োজন সুস্থ, সুন্দর, নির্মল পরিবেশ আর নিবিড় যতœ। শিশুর অপার বিস্ময়, অসীম কৌতুহল, অফুরন্ত আনন্দ ও উদ্যমের মত মানবিক বৃত্তির সুষ্ঠু বিকাশ সাধনের সূচনা পরিবারের মাঝে প্রথম শুরু হলেও বিদ্যালয়েই সর্বপ্রথম হাতে-কলমে বিকশিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ই শিশুর উন্নত জীবনের স্বপ্ন বুননের আঁতুড় ঘর। প্রাথমিক বিদ্যালয় শিশুর বয়স ও সামর্থ অনুযায়ী শারীরিক, মানসিক, আবেগিক, সামাজিক বুদ্ধিবৃত্তীয় তথা সার্বিক বিকাশে সহায়তা দেয়। আজীবনের শিক্ষণের ভিত্তি রচনা করে অর্থাৎ শিশুর সার্বিক বিকাশ সাধনে প্রাথমিক বিদ্যালয় অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আনন্দময় ও শিশুবান্ধব পরিবেশ থাকা খুব জরুরি।
কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন “হাওয়া খেলে পেট ভরে না আহার করলে ভরে, তবে আহারকে হজম করবার জন্যে মাঝে মাঝে হাওয়া খাওয়া প্রয়োজন” তাই শিক্ষা বলতে শুধু পাঠ্যপুস্তক পাঠকেই বুঝি না, বুঝি শিক্ষার্থীর পূর্ণাঙ্গ মানসিক বিকাশের মাধ্যমে আনন্দ নিয়ে পাঠ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অনন্য সুন্দর পরিবেশই পারে শিশুর স্বপ্ন নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে। বিদ্যালয়ে নতুন পরিবেশে নিয়ত খাপ খাওয়ানো শিশুটির সম্মুখে উন্মোচিত হয় বিস্ময়ের নবদিগন্ত নিজেকে আবিষ্কার করে নব নবরূপে। অনুকূল পরিবেশ পেলে অজানাকে জানার নব আনন্দে নব দিগন্ত জুড়ে ডানা মেলে উড়ে বেড়াবে শিশুর কৌতুহলি মন। তাই বলা হয় Primary education is the basis of all education।
বিদ্যালয়ে নির্মল, আনন্দঘন, শিশুবান্ধব, পরিবেশ সৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার সকল প্রাক-পাথমিক শ্রেণিকক্ষ সু-সজ্জিত করা হয়েছে। ১২৯ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থাপন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু কর্নার ও মুক্তিযুদ্ধ পাঠাগার। এতে শিশুরা দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বই পড়ায় আগ্রহী হবে এবং দেশের সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করবে। শিশুদের নৈতিক শিক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করে ১২০ টি স্কুলে স্থাপন করা হয়েছে সততা স্টোর এবং কোমলমতি শিুশুদের সুকুমার বৃত্তির বিকাশে প্রতিটি বিদ্যালয়ে খেলাধুলার জন্য ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। শিশুদের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ১২৯ টি বিদ্যালয়ে বিভিন্ন ফলের ও সৌন্দর্যবর্ধনকারী গাছের চারা বিতরণ করা হয়েছে। অভিভাবকদের সচেতন করার জন্য এবং শিশুদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরির জন্য বিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত মা সমাবেশের আয়োজন করা হচ্ছে। শিশুদের স্বপ্নময় করার জন্য মনীষীদের নামে শ্রেণিকক্ষের নামকরণ করা হয়েছে। বিদ্যালয়গুলোতে শিশুদের কথা বলার দক্ষতা বৃদ্ধি, উপস্থাপনার দক্ষতা বৃদ্ধি ও নেতৃত্ববোধ জাগ্রত করতে শ্রেণিকক্ষে প্রতিটি পাঠ শেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থী কর্তৃক ধন্যবাদ জ্ঞাপন প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিটি বিদ্যালয়ে শতভাগ দৃষ্টিনন্দন বাগান তৈরি, মিড ডে মিল চালু, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, শিশুতোষ সাহিত্যচর্চা, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন এবং পুরস্কারের ব্যবস্থা চালু করা প্রতিটি শিশুকে কুঁড়ি থেকে পরিপূর্ণভাবে প্রস্ফুটিত করতে পারে। সর্বোপরি মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক নির্দেশনা প্রদানের মাধ্যমে সোনার বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট সকলকে আপন মহিমায় সচেষ্ট হতে হবে। তাহলেই প্রতিটি শিশুর পরিপূর্ণ মানসিক বিকাশ সম্ভব হবে। স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে আরও সমৃদ্ধ আরও উন্নত বিশ্বের বুকে জ্বল জ্বল জলবে সাফল্যের দ্বীপ শিখা। তাইতো শিশুদের মানসিক বিকাশের বিষয়টিকে সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ইংরেজ কবি William Wordsworth বলেছেন— “I do not think there is any pleasure more delightful than that of marking the development of a child`s faculties. It could be the credo of every development Psychologist.”
[ইয়াসমিন নাহার রুমা, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সুনামগঞ্জ সদর।]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী