শনিবার, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:৪১ অপরাহ্ন

Notice :

গ্রামীণ খেলা কুস্তিতে মাতলো শহরবাসী

শামস শামীম ::
কুস্তিখেইড়ের পরিভাষাগুলো শহুরে মানুষের কাছে অজানা। এই অজানা শব্দগুলো বৃহস্পতিবার শহরবাসীকে নতুন করে দ্যোতনা দিয়েছে। ‘বাল্লা, আউকরা, বাইমা প্যাছ, বস্তাটান, ঘারি মোছকা’ এমন শব্দগুলোর উত্তেজনায় পুরো ‘থলা’র তামিশকিররা ‘ঈকার’ দিয়ে আনন্দ প্রকাশ করেছেন। ‘আমিন’দের অভিনন্দন জানিয়ে চ্যাম্পিয়ন সদর উপজেলার বিজয়ী ‘দাগার মাল’দের নিয়ে ‘হাইর’ গেয়ে সমর্থকরা বাড়ি ফিরেছেন আনন্দ চিত্তে।
সুনামগঞ্জের গ্রাম এলাকার ঐতিহ্যবাহী কুস্তিখেলা এবার প্রথম বারের মতো সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় জেলা শহরের স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পুরো স্টেডিয়াম ছিল লোকে লোকারণ্য। মাঠে প্রবেশ করতে না পেরে অনেকে ফিরে গেছেন হতাশ হয়ে। তবে শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী কুস্তিখেলা টিকিয়ে রাখতে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার উদ্যোগকে অভিনন্দন জানিয়েছেন আপামর মানুষ। পাশাপাশি সময়ের প্রয়োজনে কুস্তিখেলার নিয়মগুলো সংস্কারেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
বর্ষা মওসুমে সুনামগঞ্জের কয়েকটি উপজেলার মানুষের কাছে এই খেলা অত্যন্ত জনপ্রিয়। দিরাই, শাল্লা, জগন্নাথপুর, ছাতক ও ধর্মপাশা বাদে সব উপজেলায় মোটামুটি এই খেলা জনপ্রিয়। একসময় ভাইয়াপী কুস্তিখেইড় হতো। এক গ্রাম আরেক গ্রামকে আমন্ত্রণ জানাতো। গ্রামের সবাই আতিথ্য গ্রহণ করতে ছুটে আসতেন গ্রামে। খেলাকে কেন্দ্র করে বিয়েশাদিও হতো। যুবকদের শারীরিক ও মানসিক উন্নতি ঘটতো। পাশাপাশি সামাজিক সম্প্রীতি ও নতুন করে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ হতেন এলাকাবাসী। কুস্তিখেইড় উপলক্ষে গ্রামে গরু জবাই হতো, পরিবারের মেয়েদের আনা হতো নাইওর। নব্বই দশকে হঠাৎ করে এই খেলায় ভাটা পড়ে। বর্ষায় পানসী নৌকা সাজিয়ে হাইর গেয়ে স্বাগতিক গ্রামে যেতেন কুস্তিগীররা। উৎসবের আমেজ বিরাজ করতো স্বাগতিক ও আমন্ত্রিত গ্রামে। ২০০০ সালে আবার ঐতিহ্যবাহী খেলাটিকে জাগিয়ে তুলেন গ্রামের কুস্তিপ্রিয় মানুষেরা। প্রীতি কুস্তিখেলার পাশাপাশি টুর্নামেন্ট আকারে নতুন করে যাত্রা শুরু হয়। পুনর্জন্ম হয় কুস্তির। তবে এবার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ায় এর বিস্তৃতি ঘটবে বলে মনে করেন কুস্তিগীররা। কুস্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা খেলা পরিচালনার একটি সর্বজনীয় নিয়ম তৈরিরও আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে শহরের স্টেডিয়ামে আন্তঃউপজেলা কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
জানা গেছে, জেলা ক্রীড়া সংস্থার আয়োজনে কুস্তিখেলা কখনো হয়নি। পৃষ্ঠপোষকতাও ছিল না এই খেলায়। কেবল গ্রামের মানুষজনই জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী এই খেলাকে টিকিয়ে রেখেছিলেন। গ্রামের মানুষের দাবির প্রেক্ষিতে এবার সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থা আন্তঃউপজেলা কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই জেলা স্টেডিয়ামে সুনামগঞ্জ সদর, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ ও তাহিরপুর উপজেলার খেলোয়াড়দের নিয়ে আয়োজন হয় কুস্তির বড় আসরের। প্রতি উপজেলার বাছাই করা ১৩ জন করে কুস্তিগীর অংশগ্রহণ করেন। সকাল ১০টায় প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। এসময় পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানসহ প্রতিযোগিতার আহ্বায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। ১০টা থেকে শুরু করে বিকেল চারটা পর্যন্ত খেলা চলে।
উপজেলাভিত্তিক খেলা শেষে ফাইনাল পর্বে অংশ নেয় সুনামগঞ্জ সদর ও জামালগঞ্জ উপজেলা। বিজয়ী হয় সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা। উৎসবমুখর এই খেলাটি উপভোগ করতে স্টেডিয়ামের চারটি গ্যালারিসহ মাঠের ফাঁকা অংশই ছিল দর্শকপূর্ণ। প্রতিটি উপজেলার খেলায়ই ছিল তুমুল উত্তেজনা। উত্তেজনার সঙ্গে দর্শক সমর্থকরা নেচেছেন আনন্দে। ‘থলায়’ তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি করে বিজয়ী হন সদর উপজেলার কুস্তিগীররা। বিজয়ী কুস্তিগীররা রুমাল-গামছা ওড়িয়ে মাঠ নেচে বিজয় উদযাপন করেন এবং দর্শকদের ভালোবাসার জবাব দেন। পরে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
খেলা দেখতে জামালগঞ্জের দুর্লভপুর থেকে আসেন একসময়ের দাগার মাল ফরিদ মিয়া। এখন তিনি কুস্তিখেলার আমিন বা আম্পায়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফরিদ মিয়া বলেন, কুস্তি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খেলাই নয়, এলাকাবাসীর মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতিও গড়ে তুলে। সবচেয়ে জনপ্রিয় এই খেলাটি এতদিন উপেক্ষিত ছিল। এবার সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজন করায় আমরা অভিনন্দন জানাই। যুগের প্রয়োজনেই কুস্তিখেলার কিছু নিয়ম তৈরি করা উচিত। কারণ এক কুস্তিগীরের মোকাবেলায় আরেক কুস্তিগীর দুর্বল হলে তাকে শক্তিবান কুস্তিগীর কৌশলের বদলে হাত-পা দিয়ে আঘাত করে। এখানে কিছু নিয়ম করা হলে কোন দুর্ঘটনা ঘটবে না।
দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার বোগলাখাড়া গ্রামের কুবাদ বলেন, কুস্তির চেয়ে জনপ্রিয় খেলা সুনামগঞ্জে আর নেই। এখনো পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই টিকে আছে এই খেলাটি। এই খেলার জন্য দর্শকদের আমন্ত্রণ দিতে হয় না। খবর পেলেই গ্রাম থেকে মানুষ জড়ো হন। শহরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এই খেলা আয়োজন করায় শহরবাসী নিখাদ আনন্দ পেয়েছেন।
জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান ইমদাদ রেজা চৌধুরী বলেন, জনপ্রিয় এই খেলাটি এতদিন আমরা আয়োজন করতে পারিনি। তবে এবার আয়োজন করে আমরা বুঝতে পেরেছি এটা কত জনপ্রিয় খেলা। এখন থেকে আমরা নিয়মিত এই খেলার আয়োজন করব।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, যুবসমাজকে মাদক-জুয়া ও অসামাজিক কাজ থেকে ফেরাতে কুস্তিখেলা বিশেষ অবাদন রাখে। যুবসমাজকে মাঠে ফেরাতেই এই উদ্যোগ। তিনি বলেন, কুস্তিখেলায় বিপুল দর্শকই প্রমাণ করে এর জনপ্রিয়তার কথা। আগামীতে আরো বড় কুস্তিখেলার আসর বসানো হবে।
কুস্তিখেলার মাঠকে ‘থলা’ বলা হয়। দর্শকদের বলা হয় ‘তামিশকির’। কুস্তিগীরদের বলা হয় ‘মাল’, সেরাদের বলা হয় ‘দাগার মাল’। পরাজিত করার কৌশলগুলোকে বলা হয় প্যাছ, এই প্যাছগুলো ‘বাল্লা, আউকরা, বাইমা প্যাছ, বস্তাটান, ঘারি মোছকা’ নামে পরিচিত। বিজয়ীদের স্তূতিমূলক গাথাকে বলা হয় ‘হাইর’। কুস্তিগীরদের কোনভাবে মাটি ছোঁয়ালেই বা শূন্যে তোলা দিলে ‘পরা’ বা পরাজিত ধরা হয়। প্রাক্তন কুস্তিগীররা মাঠে ‘আমিন’ হিসেবে খেলা পরিচালনা করেন। কুস্তির এই পরিভাষাগুলো থলায় উপস্থিত গ্রামীণ মানুষেরা ব্যবহার করেন। কুস্তি খেলা কুস্তিখেইড় হিসেবে পরিচিত। এটা একসময় কেবল ভাইয়াপি (প্রীতি) ম্যাচ হিসেবে পরিচালিত হতো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী