শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৪০ অপরাহ্ন

Notice :

ছাতকে হচ্ছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল

শামস শামীম ::
মেঘালয় সীমান্তের কাছে সুনামগঞ্জের ছাতকে বাংলাদেশ সরকার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যসহ সেভেন সিস্টার খ্যাত সাত রাজ্যে বাংলাদেশের সহজলভ্য বাজারের কথা মাথায় রেখেই এটি বাস্তবায়িত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (৭ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কর্নাড সাংমা সৌজন্য সাক্ষাত করলে তিনি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মেঘালয়ের উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আগ্রহকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সুনামগঞ্জসহ সিলেট বিভাগের ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, ব্রিটিশ আমল থেকেই সুনামগঞ্জের ছাতক শিল্প কারখানার জন্য পরিচিতি পেয়েছে। মেঘালয়ের কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে ছাতকে সিমেন্ট, কাগজ ও স্লিপার কারখানা গড়ে ওঠেছে। এখনো মেঘালয়ের কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে এখানে লাফার্জ-হোলসিম ও আকিজ সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। মেঘালয়ের সঙ্গে লাফার্জ ও স্লিপার কারখানার দীর্ঘ কনভেয়ার বেল্ট রয়েছে, যা দিয়ে সহজে মেঘালয় থেকে কাঁচামাল আনা যাচ্ছে। একসময় তাহিরপুরের টেকেরঘাট খনিজ প্রকল্পের জন্যও চুনাপাথর নিয়ে আসা হতো খাসিয়া পাহাড় থেকে। সেখানে এখনো পরিত্যক্ত স্থাপনা পড়ে আছে। তাছাড়া মেঘালয়ের পুরো রাজ্যের সঙ্গে সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকার যোগাযোগও সহজ। যে কারণে ওখানে বাংলাদেশি পণ্যের বিরাট বাজার প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে। কয়েক বছর আগে দুই দেশের সীমান্তবাসীর বাজার-সদাইয়ের জন্য সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ডলুরায় একটি সীমান্ত হাট চালু হয়েছে। দোয়ারাবাজার ও তাহিরপুরেও আরো দুটি সীমান্ত হাট চালুর বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হলে এই অঞ্চলে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের বিকাশ ঘটবে বলে ব্যবসায়ীরা জানান।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি এলাকার পাদদেশে ছাতকের হাদাচাঁনপুর এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার লিখিত প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রেরণ করে জেলা প্রশাসন। ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়নের হাদাচাঁনপুরসহ তিনটি মৌজার প্রায় ২ হাজার ৯০০ একর জায়গায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মেঘালয়ের সঙ্গে ওই এলাকার সড়ক ও নৌপথ উন্নয়নেরও চিন্তা করছে সরকার। মূলত ভারতের মেঘালয় রাজ্যে বাংলাদেশের বাজার সম্প্রসারণ ও দুই দেশের উদ্যোক্তাদের কথা বিবেচনা করেই সম্ভাবনাময় এই অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করা হচ্ছে। সরকারিভাবে এটি অনুমোদিত হলেও এখনো অবকাঠামো নির্মিত হয়। তবে অবকাঠামো নির্মাণের লক্ষ্যে ছাতকের কৃতী সন্তান ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ড. নজিবুর রহমানও বিশেষ উদ্যোগ নিয়ে বাস্তবায়নের কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকার সীমান্তে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উৎপাদন এবং রপ্তানি বৃদ্ধি ও বহুমুখীকরণে উৎসাহ প্রদানের লক্ষ্যে পিছিয়ে থাকা ও অনগ্রসর এলাকায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে চায় সরকার। এখানে শিল্পায়ন করা হলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা সহজে ভারতের সেভেন সিস্টার খ্যাত মেঘালয়, অরুণাচল, আসাম, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা রাজ্যে সহজে ও কম খরচে পণ্য রপ্তানির সুযোগ পাবেন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রাধিকার প্রকল্পে রয়েছে এটি। গত বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রীও সুনামগঞ্জ সীমান্তের ওই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি তাদেরকে অবগত করেন। ওইদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘মেঘালয়ের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে পারেন, বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী সিলেট অঞ্চলে। যেহেতু সুনামগঞ্জে একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে’। গণভবনে বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেসসচিব ইহসানুল করিম বৃহস্পতিবার বিকেলে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘সুনামগঞ্জে প্রায় দুই হাজার একর জমির ওপর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। মেঘালয় থেকে নুড়ি (পাথর) আমদানি করতে বাংলাদেশ নৌপথকে ব্যবহার করতে পারে, যেহেতু নদী পথ ব্যবহার ব্যয় সাশ্রয়ী হয়। এর মাধ্যমে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারণের পাশাপাশি যোগাযোগ শক্তিশালী হবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনার্ড সাংমা ‘ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও বাংলাদেশ এবং এই উত্তর ভারতীয় রাজ্যটির মধ্যে সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করতে চান’ বলে প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সুনামগঞ্জের অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ এবং মেঘালয় রাজ্য সরকারের আগ্রহকেও ইতিবাচকভাবে দেখছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রীর সাক্ষাৎ এবং প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রসঙ্গে কথা বলায় সুনামগঞ্জের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটির অবকাঠামো নির্মাণকাজ শীঘ্রই শুরু হবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।
সুনামগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি ও সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান খায়রুল হুদা চপল বলেন, ছাতকে প্রাক্তন পাল্প এন্ড পেপার মিলটিও বেসরকারি ইপিজেড হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এখন ছাতকের ইসলামপুর সীমান্তে সরকারি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়টি খোদ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন। আমরা আশা করি এটির অবকাঠামোগত কাজ দ্রুত শুরু হবে। এতে দেশ-বিদেশের ও স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাও শিল্পায়নের মাধ্যমে জাতীয় ও স্থানীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবেন। তাছাড়া ভারতের সাতটি বাজারে সহজে আমরা প্রবেশ করতে পারব।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ বলেন, আমি গত সপ্তাহে প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি ঘুরে এসেছি। আমরা প্রায় তিন বছর আগে ২ হাজার ৯০০ একর জমি নির্ধারণ করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য লিখিত প্রস্তাব দিয়েছি। এই বিষয়ে এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব ড. নজিবুর রহমান মহোদয় কাজ করছেন। এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি অপার সম্ভাবনা নিয়ে আসবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী