শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন

Notice :

কী বিচিত্র দেশ! সেলুকাস : ইকবাল কাগজী

বরগুনার একজন রিফাত শরীফ নিহত হয়েছেন। নিহত শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ : মেরে ফেলা হয়েছে এমন। রিফাত আসলে মরেননি। তাঁকে মেরে ফেলা হয়েছে। মারা যাওয়া আর মেরে ফেলার মধ্যে একটি তফাৎ আছে। এই তফাৎটা বুঝতে ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষভাবে বিজ্ঞ হতে হয় না। ১৯৭১ সালে যুদ্ধকালে বাংলাদেশে ৩০ লক্ষ মানুষ মারা যাননি, প্রকৃতপ্রস্তাবে তাঁদেরকে মেরে ফেলা হয়েছিল। এমনকি তৎকালে যে-সব শরণার্থীরা ভারতের মাইলাম ক্যাম্পে ওলাওটার মহামারিতে মারা গিয়েছিলেন, এক অর্থে তাঁরা মারা যাননি, বরং তাঁদেরকে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য করে মেরে ফেলা হয়েছিল। এই যে ৩০ লক্ষ মানুষকে মেরে ফেলা হলো, যে এই সহজ কথাটা সহজে বুঝে না, বুঝতে হবে তার বাঙালিত্বে একটুখানি হলেও খাদ মিশে আছে। বাঙালির মধ্যে এই খাদটুকুর রাজনীতিক অস্তিত্বকেই বলে রাজাকারজীবিতা। ‘মারা যাওয়া’ আর ‘মেরে ফেলা’র মধ্যে যে-মৃত্যুর অধিষ্ঠান, সে-মৃত্যু স্বরূপে অভিন্ন হলেও মৃত্যুর কারণ ভিন্ন। মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে নেমে কেউ যদি এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, সাধারণত বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ মারা যান না তাঁদেরকে কোনও না কোনওভাবে মেরে ফেলা হয়, তা হলে তিনি খুব একটা ভুল করে ফেলেছেন বলে তাঁকে দোষারোপ করার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। এইরূপ দোষারোপ না করার সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়াকে কেউ অদ্ভুত বলে ভাবতে পারেন। সমাজে সংঘটিত ঘটনাপ্রপঞ্চ নিয়ে লোকে সাধারণত এমন করে ভাবতে অভ্যস্ত নয়। কিন্তু একটু তলিয়ে ভাবনা করলে বুঝা যায় যে, এই সিদ্ধান্ত আকাশকুসুম কল্পনার উপর ভর করে প্রতিষ্ঠিত নয়, এর ভিত্তিমূলে বাস্তব কারণের যথেষ্ট যৌক্তিকতা নিহিত আছে। যখন কোনও একটা দেশে দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীরা খাদ্যে ভেজাল মেশায়, আইন কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন তা প্রতিরোধ করতে পারে না, তখন সে-দেশের মানুষ ভেজাল খাদ্য খেয়ে মারা যায়। এটাই স্বাভাবিক। তারা বুঝতেও পারে না যে, তাদেরকে মেরে ফেলা হচ্ছে। ভেজাল খাদ্যগ্রহণান্তে মানুষ তৎক্ষণাৎ মরে না বটে, তবে দীর্ঘ দিনের ব্যবধানে মরে ঠিকই, এ ক্ষেত্রে মৃত্যুর কোনও অন্যথা হয় না। যেমন ইয়াবা তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর কারণ হয়ে দেখা দেয় না। কিন্তু ইয়াবাসেবক শেষ পর্যন্ত ইয়াবা সেবনের কারণে অনিবার্যভাবেই মৃত্যুবরণ করে। মানুষের শরীরে ভেজাল খাদ্যের প্রতিক্রিয়াও তেমনি, দীর্ঘ দিনের ব্যবধানে মানুষকে অসুস্থ করে তোলে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু নিশ্চিত করে। সর্বনাগরিকের অর্থাৎ রাষ্ট্রসমাজের সর্বশ্রেণিস্তরের মানুষজনের, এমনকি রাষ্ট্রনিয়োজিত ভেজালনিরোধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের লোকেরাসহ সকলের, পরিজ্ঞাত একটি সমাজবাস্তবতা এই যে, এখানে খাদ্যে ভেজাল মেশানোর বাণিজ্যিক সংস্কৃতি প্রবলাকারে জায়মান। বিষয়টিকে এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা বলে চিহ্নিত করে এড়িয়ে যাবার কোনও অবকাশ নেই, বরং সম্প্রতি প্রকাশ্যে আত্মপ্রকাশ করছে ঢাকঢোল পিটিয়ে, সরকারের টনক নাড়িয়ে। গত ২৯ জুনের দৈনিক সুনামকণ্ঠের একটি উদ্ধৃত সংবাদশিরোনাম ছিল, ‘ভেজাল ব্যবসায়ীরা নীরব ঘাতক, ফাঁসিই তাদের শাস্তি ‘র‌্যাব ডিজি’। বিশেষ করে বলে দেবার বোধ করি প্রয়োজন নেই যে, বরাতটা আলতু ফালতু কীছু নয়। সংবাদ বিবরণীতে লেখা হয়েছে, ‘র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজির আহমদ বলেছেন, কোথায় ভেজাল নেই? খাবারে ভেজাল। রেস্টুরেন্ট, রাস্তার দোকানের খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল। অনেক ব্যবসায়ী গরুর খাদ্য ঘোষণায় মেয়াদোত্তীর্ণ শিশুখাদ্য আমদানি করছেন। অথচ নতুন মেয়াদের তারিখ বসিয়ে বিক্রি করছেন। এরা আসলে নীরব ঘাতক। এরা নীরবে আমাদের দেশের মানুষকে হত্যা করছে। ফাঁসিই তাদের শাস্তি হওয়া উচিত।’ ভেজাল সংক্রান্ত সংবাদপ্রতিবেদনের আরও সাক্ষ্য আছে। গত রমজানে আমাদের সুনামগঞ্জের আলফাত স্কয়ারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পচা খেজুর জব্দ করেছিলেন। কিন্তু ফল ব্যবসায়ীরা এখানে এতোটাই ধৃষ্টতা প্রদর্শন করেছে যে, ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক পচা খেজুর আটকের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা, বলতে গেলে একরকম, ম্যাজিস্ট্রেটকেই আটক করার মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। সুনামগঞ্জে ম্যাজিস্ট্রেটকে আটক করার মতো ঘটনা আরও ঘটেছে। কিন্তু সেখানে (সম্ভবত দশকাধিক বছর আগে তাহিরপুর উপজেলার জলমহাল এলাকায়, ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার নিয়ে আন্দোলক মৎস্যজীবী সম্প্রদায় ও জলমহালের ইজারদারের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ নিষ্পত্তিকরণে প্রশাসনিক কার্যব্যপদেশে বা কর্তব্যপালনে) ম্যাজিস্ট্রেটের ভূমিকা ছিল ঘটনাচক্রে জলমহালের ইজারাদারের পক্ষে, সুতরাং ম্যাজিস্ট্রেট সেখানে জনসমর্থন থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন এবং একপর্যায়ে প্রশাসনিক সমর্থনও প্রকারান্তরে ম্যাজিস্ট্রেটের পক্ষে থাকেনি। কিন্তু পচা খেজুর কিংবা জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ফল আটকের ঘটনা জলমহালের ইজারাদারের পক্ষাবলম্বনের মতো কোনও জনস্বার্থবিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, এটি যে-কোনও বিবেচনায় জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ই কেবল নয়, বরং আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে অবশ্য বৈচারিক কর্তব্য এবং যথার্থ, যৌক্তিক ও সঙ্গত বিবেচনায় প্রতিষ্ঠিত খুনিদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক প্রতিবিধান। আজকের আঘাতের জন্য আগামীকাল আহত ব্যক্তি মারা গেলে আজকের অঘাতকারীকেই খুনি সাব্যস্ত করা হয়। এটাই নিয়ম। আজকের ভেজাল মেশানো খাদ্য খেয়ে ভবিষ্যতের যে-কোনও দিন মানুষ মারা গেলে ভেজাল মেশানো খাদ্য বিক্রেতাই সে-মৃত্যুর জন্য দায়ী। র‌্যাব মহাপরিচালকের বক্তব্যে এই যুক্তিটাই প্রতিপন্ন হয়েছে। তিনি নির্দ্বিধায় বলেছেন, ‘এরা নীরবে আমাদের দেশের মানুষকে হত্যা করছে।’ তাঁর এই কথা সম্পূর্ণ নিখাদ ও খাঁটি। অথচ এদেরকে খুনি বলছে না কেউ, রাষ্ট্র এদের অপরাধকে অপরাধ বলে গণ্য করছে না, প্রকারান্তরে আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে খুনি। যে-সমাজে খুনি প্রকাশ্যে সসম্মানে ঘুরে বেড়ায় সে-সমাজকে আর যা-ই বলা হোক, বোধ করি সভ্যতার মাপকাঠির মাপে সভ্য সমাজ বলে পরিমাপ করা সঙ্গত হবে না। এই হত্যাকারীদের প্রতিরোধ করা একটি মানবিক কর্তব্যই কেবল নয়, একটি অবশ্য পালনীয় রাষ্ট্রীয় কর্তব্যও বটে। রাষ্ট্রের প্রথম কর্তব্য তার নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। রাষ্ট্রের পক্ষে এই কর্তব্যচ্যুতির অবকাশ নেই। এই বৈচারিক কর্তব্যচ্যুতি রাষ্ট্রকে প্রকারান্তরে রাষ্ট্রনৈতিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে। রাষ্ট্র তখন আর রাষ্ট্র থাকে না, আক্ষরিক অর্থেই কতিপয় দুর্বৃত্তের দুর্বৃত্তপনার হাতিয়ারে পর্যবশিত হয়। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে, রাষ্ট্র দুর্বৃত্তদের সম্পত্তি নয়, জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রকাশরূপ সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। সেটাকে কুক্ষিগত করার কারও (ব্যক্তি বা কোনও ব্যক্তি সমষ্টির) কোনও অধিকার নেই। ব্যবসায়ীর মুনাফা অর্জনের একটি সীমা থাকা দরকার। পুঁজিবাদ সে-সীমা নির্ধারিত করে না দিলেও এবং আমাদের দেশে রাষ্ট্র পুঁজিবাদকে সমর্থন করার পরও এবং পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অধীনে আমাদের রাষ্ট্র পরিচালিত হলেও, আমাদের রাষ্ট্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মুনাফা অর্জনের অধিকারকে এ পর্যন্ত বিস্তৃত করে দেয়নি যে, পচা খেজুর বা বিষাক্ত ফল বিক্রি করে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি করে ব্যবসায়ীরা তাঁদের ব্যবসা চালানোর বৈধ অধিকার পেয়ে গেছেন। আর আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট যে-খেজুর খেলে জনস্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে সে-পচা খেজুর আটকালে তাঁকে (ম্যাজিস্ট্রেটকে) উল্টো আটক করার ঘটনা ঘটে এবং আটককারীরা পার পেয়ে যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, এ দেশের মানুষের জানা নেই যে, সভ্য দেশে একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে অপদস্ত করার প্রশ্নই উঠে না। সেটা সেখানে হবে পশ্চিমে সূর্যোদয় ঘটার মতো ঘটনা। আমাদের দেশে হয় এবং এমন ঘটনা ঘটে, যে-ঘটনা আক্ষরিক অর্থেই আদালত অবমাননার বিষয়। অথচ সে-বোধটুকুও এ দেশের সাধারণ মানুষের নেই। এই অজ্ঞতার জন্য সাধারণ মানুষকে দোষ দেওয়া যায় না। প্রকৃতপ্রস্তাবে আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটিকেই এমন করে বিন্যস্ত করা হয়েছে যে, এখানে এবংবিধ জ্ঞান সাধারণ মানুষের মগজে বিস্তার লাভ করে না, অর্থাৎ জনগণকে সুকৌশলে শিক্ষাবঞ্চিত রাখা হয় আর শিক্ষিতকে করে তোলা হয় বশংবদ। যাঁরা দেশ-রাষ্ট্র-সমাজের অধিপতি তাঁরা সেটা নিয়ন্ত্রণ করেন। এখানে একজন ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে ‘দিদি’ ডাকলে কোনও একজন সহজ সরল মৎস্যজীবীর উপর অকারণে যেমন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে উঠেন তেমনি অন্য একজন ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করত পারেন না। তিনি হয়তো কোনও এক অনুষ্ঠানে গিয়ে তাঁর অপরিমেয় কাকস্য পরিবেদনার বয়ান ব্যক্ত করেন। দেশের মানুষের জন্য তাঁর অন্তর কাঁদে। কিন্তু আমরা জানি, এমন ঘটনাও এই দেশে ঘটেছে, যেখানে জেলা প্রশাসনের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সঙ্গে মুদি দোকানির বিতণ্ডাকে ‘সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অপরাধ’ গণ্য করে ম্যাজিস্ট্রেট দোকানিকে মাস কয়েকের কারাদ- দিয়েছেন। এমন সংবাদ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। সরকারি কাজটা কী ছিল? দোকানের সামনে বাইসাইকেল রাখা আর বাধা প্রদান মানে, সরিয়ে রাখার জন্য বলা। এই নিয়ে বিতণ্ডা, শেষে বৈচারিক ব্যবস্থার প্রয়োগ ও পরিণতিতে কারাদ-। ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার সময়ে বাধাগ্রস্ত হলে, এমনকি কাজে প্রতিবন্ধকতা তৈরি নয়, যথারীতি তাঁকে আটক করা হলেও সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অপরাধ সংঘটিত হয় না। কিন্তু জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেটের আর্দালির সাইকেল দোকানের সামনে রাখতে না দিলে সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অপরাধ সংঘটিত হয়। একেই বলে, ‘কী বিচিত্র দেশ ! সেলুকাস।’ সত্যি অদ্ভুত এক দেশ এই বাংলাদেশ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী