রবিবার, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৭:৪৮ অপরাহ্ন

Notice :

একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা : ওসি’র বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানার তাৎপর্য

‘…মডেল থানার ওসি (প্রত্যাহার হওয়া) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি …’ করা হয়েছে। সম্পাদকীয় বক্তব্য বিস্তারের জন্যে এইটুকু সংবাদই যথেষ্ট।
প্রতিদিন অনেক অনেক শিরোনাম পড়েন অনেক অনেক পাঠক। এইসব শিরোনাম ভিন্ন ভিন্ন জনের কাছে ভিন্ন ভিন্ন আবেদন, আকর্ষণ, আনন্দ-বেদনা-পরিবেদনা, অনুপ্রেরণার উপহার নিয়ে হাজির হয়। হাজির হয় নতুন কোনও তথ্যবার্তা নিয়ে। এমনকি মাঝেমাঝে ব্যতিক্রমী কোনও শিরোনাম আবির্ভূত হয় যুগবদলের সাংস্কৃতিক অভিঘাত নিয়েও। এমন হতে পারে, সে-অভিঘাতের স্পন্দনস্পর্শ কেউ হয়তোবা অনুভবই করেন না। গতকালের দৈনিক সুনামকণ্ঠের একটি উদ্ধৃত সংবাদপ্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘নুসরাত হত্যাকা- ॥ ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা।’ কেন জানি মনে হচ্ছে এই শিরোনামটি একটি ব্যতিক্রমী বার্তা বহন করছে দেশের মানুষের জন্যে এবং দেশের শাসনব্যবস্থার পরিসরে প্রচলিত বৃটিশামলের ঔপনিবেশিক ধাঁচের পুলিশপ্রশাসন কিংবা পুলিশি ব্যবস্থার অচলায়তন ভাঙার একটি অনুকম্পন অনুভূত হচ্ছে। সর্বজনবিদিত সত্য এই যে, পুলিশকে গ্রেফতার করা যায় না, পুলিশই গ্রেফতার করার একমাত্র অধিকর্তা, কিংবা পুলিশকে গ্রেফতার করার আইন থাকলেও এতোদিন এই আইনটিকে কার্যকর করার অবকাশ যথোপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে হয়ে ওঠেনি, যদিও অপরাধ দমনের কাজে ব্যাপৃত হয়ে পুলিশেরই একটি নীতিভ্রষ্ট অংশ অসংখ্য অপরাধ করা অব্যাহত রেখেছে এবং বরাবরের মতন রেহাই পেয়ে গিয়ে পুলিশমহলের মহিমাকে জনসমক্ষে ক্ষুণœ করে চলেছে, নিত্যদিন নির্বিঘেœ। জনশ্রুতি আছে, ব্রিটিশরা ভারত-উপনিবেশকে শাসন করার জন্যে দারোগা পদের সৃষ্টি করে, দারোগাকে ক্ষমতা দেওয়া হয় বেশি এবং বেতন দেওয়া হয় কম। তারা অনুমান করেছিল যে, এভাবে দারোগা পদ সৃষ্টি করলে নিয়োজিত কম বেতনের দারোগা তার পেটচালানোর (প্রকৃতার্থে জীবননির্বাহের) জন্যে মহারাণী ভিক্টোরিয়ার পক্ষ থেকে ভারতবাসীকে লাঠ্যৌষধি প্রয়োগ করেÑ অর্থাৎ এককথায় ডা-া মেরেÑ ঠা-া করে রাখবে এবং ভারতে ব্রিটিশদের তৈরি পুলিশপ্রশাসনে প্রকৃতপ্রস্তাবে কিংবা কার্যত তা-ই (ব্রিটিশদের কথিত অনুমান) বাস্তব হয়ে উঠেছে এবং স্বাধীনোত্তরকালেও অর্থাৎ এযাবৎ কাল পর্যন্ত সে-বাস্তবতাকে আমরা অতিক্রম করতে পারিনি। বর্তমানে বিরাজমান দেশের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত সার্বিক পরিস্থিতি সে-অশুভ বাস্তবতাকেই প্রতিপন্ন করে। অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই, বাস্তবে দেশে এখন পর্যন্ত এতৎসংক্রান্ত এতোসব অপকর্ম সংঘটিত হয়েছে যে, দৃষ্টান্ত উপস্থিত করে শেষ করা যাবে না। ভুক্তভোগী অসংখ্য মানুষ নির্যাতিত হয়ে চলেছেন সেই ব্রিটিশ আমল থেকে, এখনও পর্যন্ত। আমরা জানি, ব্রিটিশ আমলে পুলিশ হেফাজতে বন্দি কমিউনিস্ট নেতা ইলা মিত্রকে নির্যাতন করেছিল এক পুলিশ এবং অন্য আর এক পুলিশ সকলের অলক্ষে পিতৃ¯েœহে তাঁর শুশ্রƒষা করেছিল। পুলিশি ব্যবস্থায় ভালোমন্দের এই দুই অংশের বিরাজমানতার মিথষ্ক্রিয়ার বাস্তবতার মধ্যেই জননির্যাতনের ধারাটি ব্রিটিশ আমল থেকে এখনও পর্যন্ত প্রতিকারহীনভাবে বহমান আছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আমরা পুলিশপ্রশাসনে লোক নিয়োগের ক্ষেত্রে এমন কোনও ছাঁকনি এখনও পর্যন্ত তৈরি করতে পারিনি, যা ব্রিটিশ-কানাডা ইত্যাদি পাশ্চাত্য দেশ পেরেছে; যার ফলে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের মতো অমানবিকেরা পুলিশ প্রশাসনকে অমানবিক, দুর্নীতিপরায়ণ ও অপরাধমূলক করে তোলার সুযোগ লাভ করে এবং কার্যত পুলিশকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। পুলিশ প্রশাসনে অনুপ্রবেশকারী মন্দলোকেরা পুলিশি ক্ষমতার সুবিধা নিয়ে অন্যায় করে চলে নির্দ্বিধায়, নির্বিঘেœ এবং প্রকারান্তরে পুলিশের অপরাধ করে রেহাই-পেয়ে-যাওয়ার প্রবণতাটি জনসমাজে একটি ধ্রুবসত্যরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বর্তমানে কার্যত তা-ই হয়ে আছে। কিন্তু এবার ‘ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা’র সংবাদটি ‘পুলিশের অপরাধ করে রেহাই-পেয়ে-যাওয়ার প্রবণতাটি’র মধ্যে নিহিত ধ্রুব নিয়মের ব্যতিক্রমকে বাস্তব করে তোলছে। এটি একটি যুগান্তকারী সামাজিক পরিবর্তন বটে। আমরা এই এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী