শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২০, ০৭:৫৬ অপরাহ্ন

Notice :

অন্তহীন লড়াইয়ে অটোচালক যাত্রী রাণী দত্ত


শামস শামীম ::

পাথর ভাঙা, মানুষের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ, মেসে রান্না করাসহ শ্রমের কঠিনতম সব শাখায় কৈশোর থেকেই সংগ্রাম করছেন হতদরিদ্র এতিম কন্যা যাত্রী রাণী দত্ত (৩২)। মানুষের বাড়িতে কাজ করে তিন কিস্তিতে ৬৫ হাজার টাকায় এক যুগ আগে দুই শতক জায়গা কিনেছিলেন। সেই জায়গা থেকে তাকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে জমির মালিক। মালিক মারা যাবার পর কবরের সামনে গিয়ে লাশ আটকে দিয়েছিলেন যাত্রী। তখন তার সাহসের প্রশংসা করেছিলেন অনেকে। তখন স্থানীয় মাতব্বর ও স্বজনরা বিষয়টি দ্রুত শেষ করে দিবেন এই আশ্বাসে তিনি দাবি থেকে সরে এসেছিলেন। কিন্তু এখনো তার জায়গা বুঝে পাননি তিনি। এখন এই শ্রমজীবী নারী শ্রমিকের কাজ করে মামলার মাধ্যমে তার জমি উদ্ধারের সংগ্রামে নেমেছেন। জানেননা তিনি পারবেন কি-না। তবে রক্ত পানি করা শ্রমের টাকায় কেনা জমিটুকু উদ্ধার করতে চান এই প্রত্যয় লক্ষ্য করা গেছে তার অবয়বে।
গত ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসের দিন ইজিবাইক নিয়ে প্রথম রাস্তায় নেমেছেন যাত্রী। এখন তিনি সুনামগঞ্জের একমাত্র নারী ইজিবাইক চালক। চারপাশের টিকাটিপ্পনীকে থোরাই কেয়ার করে তিনি তার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে ‘কিছু খারাপ মানুষ উল্টা পাল্টা কয়, আমি গায়ে মাখিনা’-নিজের সংগ্রাম নিজেই করতে চান। নিজে মানুষের বাসায় কাজ করে তিনভাগ জীবনের দুই ভাগ অতিক্রম করে দিলেও তার একমাত্র চাওয়া হাঁড়ভাঙা শ্রমে তিন সন্তানকে লেখাপড়া করিয়ে উচ্চশিক্ষিত করতে। এই জন্যই এখন কিস্তিতে ইজিবাইক কিনে তিনি রাস্তায় নেমেছেন।
শিশুকালেই শুরু সংগ্রাম :
তাহিরপুর উপজেলার টেকাটুকিয়া গ্রামের মৃত দেবেন্দ্র বর্মণের মেয়ে যাত্রী রাণী দত্ত। তিন বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। বৃদ্ধাবস্থায় দেবেন্দ্রের কাছে তার অল্প বয়সী মাকে বিয়ে দিয়েছিলেন তার পরিবারের লোকজন। বিয়ের ১০ বছরের মাথায় দেবেন্দ্র মারা গেলে মা শুভা রাণী বর্মণ চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করেন। তখন যাত্রীর বয়স ৮ বছর। মেজো বোন সুচিত্রা এবং ছোট বোন বিচিত্রা। তিনজনকে নিয়ে অসহায় মা সুনামগঞ্জ শহরের ধোপাখালি মফিজের বস্তিতে ওঠেন। তিনি বাসায় কাজ নেন। একসময় ইটভাটায় কাজ করেন মা। কিছুদিন পরেই ৮ ও ৭ বছর বয়সী যাত্রী ও সুচিত্রাকে বাসায় বাসায় কাজে পাঠিয়ে দেন। কয়েক বছর পরে ছোট বোন বিচিত্রাকেও বাসার কাজে পাঠিয়ে দেন। ছোট বয়সে রাতদিন কাজ করেও ন্যায্য শ্রমমূল্য পেতেন না কোন বোন। মায়ের কাছে বেড়াতে আসতে দিতোনা। এতে প্রায়ই মন খারাপ থাকতো। অনেক সময় এক কাপড়ে ঘরে বসে থাকতেন। বয়স ১৭-১৮ হওয়ার পর বাসার কাজ ছেড়ে দেন যাত্রী। অন্য দুই বোনকেও বস্তি বাসায় নিয়ে আসেন। নিজে দর্জির কাজ শিখে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। এই সময়ে নবীনগরে একটি বস্তিতে একটি রুমে থেকে কয়েকটি বাসা-বাড়িতে পালাক্রমে কাজ নেন এবং সঙ্গে মেসেও রান্না করেন। এখন নবীনগরে স্বামী, মা ও তিন সন্তানকে নিয়ে থাকেন।
রক্তপানি করা টাকায় কেনা দুই শতক ভূমি বুঝে পাননি :
মানুষের বাসা বাড়ি, দিনমজুরি ও শ্রমিকের কাজ করে হাঁড়ভাঙা শ্রমেই ২০১২ সনে নবীনগরের নজরুল ইসলাম ওরফে লাল মিয়ার কাছ থেকে মাইজবাড়ি মৌজায় ১৪১নং দাগে দুই শতক জমি ৮০ হাজার টাকায় ক্রয় করে সাফ কবালা করেন। এর আগে টাকা দিলেও দলিল হয় ২০১২ সালের ২৬ জানুয়ারি। ২০১৩ সনের ১ জুলাই তিনি নামজারি করেন। ২০০৮ সাল থেকে স্টাম্পে বায়নাপত্র করে তিনি টাকা পরিশোধ করেন। স্থানীয় ফরিদা ও শিউলির বাবার সামনে বায়নাপত্রের টাকা দেন। বায়নাপত্র, দলিল নামজারি সব সংরক্ষণে রেখেছেন যাত্রী। খুব যতেœ আঁকড়ে রেখেছেন। জানা গেছে ওই জায়গায় কয়েক বছর টিনের খুপড়িঘর করে বসবাসও করেন যাত্রী। লাল মিয়া তাদেরকে উচ্ছেদ করতে এই ভূমি বিক্রি করে দেন রুবেল নামের এক যুবকের কাছে। রুবেল তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে লাল মিয়া ও তার স্বজনদের সহায়তায় টিনের খুপড়িঘর ভেঙে একরাতে উচ্ছেদ করে দেয়। এই ঘটনায় বিচার ডাকলেও সময় ক্ষেপণ করতে থাকেন জমির মালিক ও তার স্বজনরা। বারবার পরিশ্রম করে কেনা দুই শতক জমির দখল বুঝে পেতে অনেকের কাছেই ধর্ণা দিয়েছেন যাত্রী। ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ জায়গা বুঝে পেতে লাল মিয়ার ছেলে কবীরের কাছে গেলে কবীর তাকে রাস্তায় ফেলে বেদম মারপিট করেন। এ ঘটনায় মামলা হলেও প্রভাবশালীদের আত্মীয় হওয়ায় কবীর রেহাই পায়। এখন সবসময় তাকে হুমকি ধমকি দিয়ে যাচ্ছে তারা। জায়গা জমি চাইলে খুন করবে এমন হুমকি দিচ্ছে বলে জানান যাত্রী।
জানা গেছে, প্রায় দুই বছর আগে লাল মিয়া মারা গেলে কবরস্থানের সামনে গিয়ে জমির দাবি করেন যাত্রী রাণী দত্ত। এ ঘটনায় সাধারণ মানুষ অবাক হন। ক্ষুব্ধ হয় লাল মিয়ার স্বজনরা। তবে সাধারণ মানুষ একজন অসহায় নারীর সঙ্গে এমন প্রতারণার বিষয়টি অবগত হয়ে লাল মিয়ার স্বজনদের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করার পরামর্শ দিলে লাল মিয়ার আত্মীয় আফজাল নূর, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল বরকত, দীপক বাবু, কাউন্সিলর সুজাতা রাণীসহ গণ্যমান্যরা বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করে তাকে জমি বুঝিয়ে দিবেন বলে আশ্বস্ত করলে তিনি দাবি ছাড়েন। তবে আজ পর্যন্ত ওই লোকজন তার জমি বুঝিয়ে দেননি। যাত্রী রাণী বলেন, ‘আমি কুন্তা ছাইনা। আমার রক্ত পানি করা টাকায় কিনা জমি ফিরত চাই। টাকা পয়সা আমি চাইনা। আমার বাড়িঘর নাই। আমি চাইনা আমার বাচ্চাকাচ্চাও এমন থাকুক।’
এ বিষয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর হোসেন আহমদ রাসেল বলেন, যাত্রী রাণী জায়গা কিনেছিল এটা অনেকেই জানে। তার ন্যায্য জমি বা প্রাপ্য পাওনা পাওয়া উচিত। কিন্তু দুই পক্ষের অনমনীয়তার কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছেনা। তবে শীঘ্রই এই সংগ্রামী নারীর এই বিষয়টি আমরা দেখে শেষ করব।
কবীর মিয়াকে বাসায় খুঁজে গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
বিয়ে করেও সংসার হলোনা :
৯ বছর আগে হুট করে বিয়ে করেন জামালগঞ্জের চাঁনপুর গ্রামের হৃদয় দত্তকে। হৃদয় দত্ত বাড়ি থেকে অভিমান করে সুনামগঞ্জ শহরে এসে রিকসা চালাতেন। থাকতেন নবীনগরে। এই সময় হৃদয় যাত্রীকে প্রেমের প্রস্তাব দিলে তিনি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমার মতো মেয়ের প্রেমটেম শোভা পায়না। তুমি ইচ্ছে করলে আমাকে আজই বিয়ে করতে পারো। কিচ্ছু দিতে হবেনা। তাই হুট করেই বিয়ে হয়ে যায়। আনুষ্ঠানিকতাহীন সাদাসিদে বিয়ে। পরিবারকে না জানিয়ে হৃদয় যাত্রীকে বিয়ে করায় পরিবার এখনো তাকে বউ হিসেবে মেনে নেয়নি। তাছাড়া উচ্চ বংশের ছেলে হয়ে নি¤œবংশের একটি মেয়েকে বিয়ে করায় পরিবারে ঠাঁই হয়নি যাত্রী ও তার সন্তানদের। বড় ছেলে অভিজিৎ দত্ত ধারারগাঁও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। মেয়ে ঝুমা রাণী প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। তিন বছরের মেয়ে রুমাকে মায়ের কাছে রেখে ইজিবাইক নিয়ে রাস্তায় নামেন যাত্রী রাণী দত্ত। স্বামী, তিন সন্তান ও বৃদ্ধ মাকে নিয়েই তার সংগ্রামী জীবন নিয়ে ছুটে চলা…।
সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদের সভানেত্রী গৌরী ভট্টাচার্য্য বলেন, আজীবন সংগ্রামী নারী যাত্রী রাণী দত্ত। তাদের তিন বোন ও মা সংগ্রাম করেই এখনো টিকে আছেন। তিনটি বোনের বিয়ে হলেও একটি বোনও সুখে নেই। তারপরও তারা কারো করুণার পাত্র না হয়ে লড়াই করে বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, এই সংগ্রামী নারী মানুষের বাড়িতে কাজ করে দুই শতক জায়গা কিনলেও তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে। এখনো বিচার পাচ্ছেনা। আমরা অনেককে বলেছি। তার জমিটুকু ফিরে পাওয়া উচিত।
নতুন সংগ্রাম :
গত ৮ মার্চ ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস। নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা ও নারী সুরক্ষার দাবিতে বিশ্বমানুষ এই দিন কর্মসূচি পালন করেছেন। মহান এই দিনেই সাহসী যাত্রী রাণী দত্ত আনুষ্ঠানিকভাবে মফস্বল শহরে ইজিবাইক নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। এটা দেখে টিকাটিপ্পনি কাটতে শুরু করে কিছু মানুষ। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই সাহসী এই সংগ্রামী নারীকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন। ওই দিন সুনামগঞ্জ মহিলা পরিষদ নেত্রীরা তাকে অভিনন্দন জানিয়ে গাড়িসহ র‌্যালিতে নিয়ে এসেছিলেন তাকে। যাত্রী জানান, স্বামী হৃদয় দাস প্রায়ই তার প্রতি চোতপাত করেন। পরনির্ভরতা পছন্দ না করায় স্বামীকে অনুরোধ করে ইজিবাইক চালানো শিখে নেন। প্রথম দিন ৫৫০ টাকা রুজি করেছিলেন। এর আগে তিনিই কিস্তিতে এই অটো গাড়িটি স্বামীকে কিনে দিয়েছিলেন। এই অটোগাড়ির কিস্তি কবে পরিশোধ হবে জানেননা তিনি। তবে জীবনের রেলগাড়ি থেকে বিচ্যুত হতে চাননা এই নারী।
যাত্রী রাণী বলেন, পয়লা পয়লা আমারে দেইক্যা কিছু মানুষ উল্টা পাল্টা কথা কইছিল। আমি গায়ে মাখিনি। আমার সংগ্রাম আমারেই করতে অইব। যাত্রী আরো বলেন, জীবন কত কঠিন আমার চাইতে কেউ বুঝবেনা। আমি চাই আমার সন্তানরা যেন কারো বাসা বাড়িতে কাজ না করে। সংগ্রাম করে আমি তাদের পড়াব। যতই কষ্ট হোক তারার পড়ালেখা বন্ধ করবনা।
সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহ্বায়ক আরিফ-উল আলম বলেন, একটি মফস্বল শহরে একজন নারী ইজিবাইক চালাচ্ছে এটাও একটি সাহসী ব্যাপার। এই সংগ্রামী নারীকে আমরা অভিনন্দন জানাই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী