শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২০, ১০:৪৫ অপরাহ্ন

Notice :

হাওরের মাটি কাটা হচ্ছে কলমে!


শহীদননুর আহমেদ ::

২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরের হাওর এলাকায় আগাম বন্যা প্রতিরোধ ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত-সংস্কারের জন্যে ১৯ কোটি ৪৬ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দিরাই উপজেলায় ১০১টি পিআইসির মাধ্যমে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ চলছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাঁধের কাজ সম্পন্ন করার কথা থাকলেও নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ হওয়ার কোনো আলামত দেখা যাচ্ছে না। নির্দিষ্ট সময়ের আর মাত্র ৪ দিনের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন হাওরপাড়ের কৃষকরা।
বাঁধ নির্মাণকাজে পাউবো’র দেয়া অগ্রগতি প্রতিবেদনের সাথে বাস্তবের মিল নেই। অগ্রগতি প্রতিবেদনে ৭০ ভাগ বাঁধ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা বললেও সরেজমিনে ঘুরে ও স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখনো অর্ধেক কাজ বাকি রয়েছে। অনেক পিআইসি সবেমাত্র কাজ শুরু করেছেন। বৃষ্টিবাদল শুরু হলে ঐসকল পিআইসি কাজ শেষ করতে পারবেন না বলে জানান হাওরপাড়ের কৃষকরা। তাছাড়া নির্মাণাধীন কাজে নানা অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
নীতিমালা অনুযায়ী বাঁধের প্রস্থ ১২ ফুট, উচ্চতা অনুযায়ী দ্বিগুণ স্লোপ, কম্পেকশন করা, বাঁধে দুরমুজ দেয়া, ঘাস লাগানো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভাঙ্গায় বাঁধ, চাটাই, বস্তা দিয়ে আঁড় দেয়ার কথা থাকলেও অনেক পিআইসি এইসকল নিয়মের তোয়াক্কা করেননি। বাঁধের গা ঘেঁষেই এস্কেভেটর দিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে মাটি। অনেক বাঁধেই স্লোপ খাড়া করে রাখা হয়েছে। একটু ভারি বৃষ্টি হলেই বাঁধের কিনার ধসে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক বাঁধেই কম্পেকশন সঠিকভাবে করা হয়নি। হাঁটলেই পা দেবে যায় কোনো কোনো বাঁধে। এছাড়া কাজের পরিমাণের চেয়ে বেশি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে কিছু বাঁধে।
শুক্রবার ও শনিবার দিরাই উপজেলার রফিনগর, ভাটিপাড়া, করিমপুর, জগদল, তাড়ল ইউনিয়নের অধিকাংশ বাঁধ পরিদর্শন করে দেখা যায় নির্মাণকাজের নানা অনিয়ম ও উদাসীনতার চিত্র। ১৯ লক্ষ ৪৮ হাজার টাকা ব্যয়ে রফিনগর ইউনিয়নের কালিকোটা হাওর উপপ্রকল্পের ৭৬৫ মিটার কাজ বাস্তবায়নে ৪৫(ক)নং পিআইসির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন এই ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান রেজুয়ান হোসেন। ৭৬৫ মিটার দীর্ঘ কাজের এখনও ২০ ভাগই হয়নি। এক-দুশো মিটার করে বন্ধ রয়েছে নির্মাণ কাজ। বাঁধের বিশাল অংশে মাটি ফেলানো বাকি থাকায় ভয়ে আছেন কালিকোটা হাওরের কৃষকরা। বাঁধে গিয়ে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক কাউকে দেখা যায়নি। সভাপতি রেজুয়ান হোসেনের মোবাইল ফোনে বাকি কাজ সম্পূর্ণ করা ও শেষ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আর ৪ দিনে সকল কাজ সম্পন্ন করে দিবেন বলে জানান তিনি।
একই অবস্থায় আছে কালিকোটা উপ-প্রকল্পের ৪৫নং পিআইসির সভাপতি রঞ্জন সরকারে কাজ। বাঁধের দীর্ঘ অংশ ফাঁকা পড়ে রয়েছে। যেটুকু কাজ হয়েছে তাতেও স্লোপ, কম্পেকশন ঠিক নেই। কাজ বাকি থাকলেও ইতোমধ্যে ২০ লক্ষ ১৪ হাজার টাকার প্রকল্পের অর্ধেক টাকা উঠিয়ে নিয়েছেন রঞ্জন সরকার। কবে নাগাদ কাজ শেষ করবেন এমন প্রশ্নে রঞ্জন সরকারও একই উত্তর দেন। ৪ দিনের মধ্যে বাকি অর্ধেক কাজ করে ফেলবেন তিনি।
২৬(ক) নং পিআইসির কাজের অবস্থাও খারাপ। ২০ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা প্রকল্পের বরাদ্দের অর্ধেক টাকা উঠিয়ে নিলেও প্রায় ১ কিলোমিটার কাজের প্রায় অর্ধেকই বাকি। পিআইসির সভাপতি সাধারণ সম্পাদক কাউকেই বাঁধে পাওয়া যায়নি।
এক তৃতীয়াংশ কাজ বাকি ৪৬নং পিআইসিতে। নীতিমালা অনুযায়ী স্লোপ করা হয়নি।
এই হাওরের উপ-প্রকল্পের ২৫নং পিআইসির ৫০১ মিটার প্রকল্পের ডুবন্ত বাঁধের ভাঙ্গা মেরামতে মূল ভাঙ্গা এখনও বাকি। বাঁধে কিছু শ্রমিক দিয়ে মাটি ফেলতে দেখা গেলেও দুয়েক সপ্তাহ সময়ে কাজ শেষ হবে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। যেটুকু কাজ হয়েছে তাতেও স্লোপের দৈর্ঘ্য খেয়াল-খুশি মতো করা হয়েছে। বাঁধে দেয়া হয়েছে কাদামাটি।
এই হাওরে ২৫(ক) নং এর ৮৪৮মিটারের কাজে যাচ্ছেতাই মাটি ফেলানো হয়েছে। উচ্চতা, প্রস্থ, স্লোপ, দুরমুজের বালাই নেই। তাই বাঁধে মাটি ফেলানোর জন্যই কেবল মাটি ফেলে যাওয়া হচ্ছে। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। বাঁধের মানের ব্যাপারে পিআইসির সভাপতি ইয়াজ উদ্দিন বলেন, আমি বাঁধের কাজ ঠিকঠাক মতোই করছি। সঠিক সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা হবে।
২৬ ও ২৭নং পিআইসির বাঁধে মাটি ফেলা হলেও বাকি রয়েছে দুরমুজ, কম্পেশন ও ঘাস লাগানোর কাজ। দুয়েকদিনের মধ্যে দুরমুজ ও ঘাস লাগানো কাজ শুরু করা হবে বলে জানান পিআইসি দু’টির দায়িত্বশীলরা।
এদিকে ভাটিপাড়া ইউনিয়নের ৯২নং পিআইসির মধুরাপুরের ভাঙ্গায় এখনও কাজ শুরু হয়নি। ভাঙ্গার দু’পাশে পানি থাকায় কাজ শুরু করা যাচ্ছে না। তবে দুয়েক দিনের মধ্যে ভাঙ্গায় কাজ শুরু করা হবে বলে জানান পিআইসি’র সভাপতি রাসিন মিয়া।
উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের চাপটির হাওর উপ-প্রকল্পের ৫৯ নং ও ৫৯(ক) নং পিআইসির কাজ এখনো অর্ধেক বাকি। একটি এস্কেভেটর দিয়ে দুই পিআইসির বাঁধ নির্মাণ কাজ করা হচ্ছে। যার ফলে ধীরগতিতে কাজ করা হচ্ছে বলে জানান পিআইসি’র দায়িত্বশীলরা। কাজ বাকি থাকলেও দুই পিআইসি’ই নির্দিষ্ট বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক টাকা তুলে নিয়েছেন। চাপটির হাওর উপপ্রকল্পের ৮৬নং পিআইসি’র শ্যামের ভাঙ্গা এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভাঙ্গার স্লোপে মাটি পড়েনি। আঁড় দেয়া হলেও ব্যবহার হয়নি বস্তা।
৮৬নং পিআইসি’র কাজ এখনো বাকি রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারির আগে কাজ শেষ করা হবে বলে জানান বাঁধ নির্মাণে দায়িত্বরতরা।
এদিকে তাড়ল ইউনিয়নের ৪নং পিআইসির বৈশাখী ভাঙ্গায় কাজ অনুপাতে বরাদ্দ বেশি দেয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কৃষকরা। মাত্র ৫১ মিটার ভাঙ্গা মেরামতের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে প্রায় ২৫ লক্ষ টাকা।
দিরাই উপজেলার বাঁধ নির্মাণকাজের ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারি প্রকৌশলী রিপন আলী বলেন, ইতোমধ্যে উপজেলার প্রায় ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করার জন্যে সংশ্লিষ্ট পিআইসিদের তাগাদা দেয়া হচ্ছে। বাঁধের কাজ তদারকিতে আমরা সার্বক্ষণিক মাঠে রয়েছি।
বাঁধ নির্মাণে নির্ধারিত সময়ের আর মাত্র ৪ দিন বাকি। এই সময়ের মধ্যে বাঁধের কাজ শেষ হওয়া সম্ভব নয় জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন- হাওরপাড়ের কৃষকসহ হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ।
হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, ফসলরক্ষা বাঁধের কাজের করুণ অবস্থা। পাউবো’র অগ্রগতি প্রতিবেদনের সাথে বাস্তবের মিল নেই। এবারো হাওরের মাটি কাটা হচ্ছে কলমে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী