শনিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২০, ০৫:০০ অপরাহ্ন

Notice :

বাঁচার মতো বাঁচতে চাই : হাসান শাহরিয়ার

অত্যন্ত ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এই নিবন্ধটি লিখতে বসেছি। লিখতে গিয়ে জাতীয় সংসদের তদানীন্তন ¯িপকার (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) আবদুল হামিদের একটি কথা মনে পড়ে গেল। চার বছর আগে জাতীয় হাওর সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি ছিলেন প্রধান অতিথি। আমিও সেই অনুষ্ঠানে একজন বিশেষ অতিথি ছিলাম। অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ নিজে হাওর এলাকার বাসিন্দা। তার অভিজ্ঞতার অন্ত নেই। শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের অনেক ঘটনার রসালো বর্ণনা দিয়ে সেদিন তিনি বলেছিলেন, ‘ধান বিক্রি করে আমার মা-বাবা আমাকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।’ যে সাতটি জেলা ভাটি এলাকা বলে চিহ্নিত, তার মধ্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কিশোরগঞ্জও একটি। অন্যগুলো হলো: সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট, নেত্রকোণা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এগুলো প্রধানত এক ফসলি জেলা। একমাত্র ফসল বোরো ধান; আমন চাষের ভূমি অত্যন্ত সীমিত। ‘ভাসান পানি ধান না মারলে আমাদের দুঃখ নেই’-এই উক্তি করে তিনি বলেছিলেন, ‘গোলায় ধান তুলতে না পারলে আমাদের অনাহার-অর্ধাহারে দিন কাটাতে হয়।’ এক বছর ঠিকমতো আকাক্সিক্ষত বোরো ফসলটি তুলতে পারলেই ধার-দেনা না করে পরবর্তী দু’বছর কৃষকরা অনায়াসে কাটিয়ে দিতে পারে। কিন্তু ভাগ্য তাদের প্রতি সুপ্রসন্ন নয়। একবার ফসল তুলতে পারলেও পরের দু’বছর আগ্রাসী ভাসান পানি তা গ্রাস করে ফেলে। প্রকৃতি বোধ করি ভাটি এলাকার জন্য এই নিয়মই বেঁধে দিয়েছে যুগ যুগ ধরে। কিন্তু পরপর তিন বছর পাকা ধান তুলতে না পারলে ধনী-গরিব একাকার হয়ে যায়। ভাটি এলাকায় এবারের আগাম বা অকাল বন্যার ফলে ফসলহারা মানুষের আহাজারি ও হাহাকার রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কথারই প্রতিধ্বনি মাত্র।
ভাটি অঞ্চল মানেই নি¤œাঞ্চল বা হাওর এলাকা। যে অনতিগভীর ভূভাগ বর্ষায় জলমগ্ন হয় এবং হেমন্তে শুকিয়ে যায়, তাকেই বলে হাওর। হাওরের যে অংশে হেমন্তে পানি থাকে সেই গভীর অংশের নাম বিল। এরই অপর নাম হ্রদ। ১৭৮৭ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর ব্রহ্মপুত্র নদের গতি পরিবর্তন এবং ডাউকি স্তরচ্যুতির কারণে এ অঞ্চলের মাটির স্তর তিন থেকে ১০ মিটার দেবে যায়। ভাটি এলাকায় হাওর বা জলাভূমি আছে ৪২১টি- সুনামগঞ্জে ১৩৭টি (মতান্তরে ১৩৩টি), কিশোরগঞ্জে ১২১টি, নেত্রকোণায় ৭০টি, সিলেটে ৪৫টি, হবিগঞ্জে ৩৯টি, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ৬টি ও মৌলভীবাজারে ৩টি। প্রতি বছর বন্যায় হাওরগুলো প্লাবিত হয়, কয়েক মাস এলাকাবাসী পানিবন্দি থাকে। অবশ্য বর্ষায় এক অপরূপ রূপে সজ্জিত হয় ভাটি এলাকা। চারদিকে পানি আর পানি। কুন্ডলী পাকিয়ে বড়, মাঝারি ও ছোট আকারের মেঘ আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে বিচরণ করে। যখন ইচ্ছে ঝরে পড়ে, শুরু হয় মুষলধারে বৃষ্টি। চেরাপুঞ্জির কাছে থাকায় সুনামগঞ্জে বছরে ৭,০০০ মিলিলিটার বৃষ্টিপাত হয়। প্রতি বছরই বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে ভাটি এলাকায় ফসলহানি ঘটে এবং ঘরবাড়ি ভেসে যায়। প্রকৃতপক্ষে হাওর অঞ্চলের লোকেরা ফি বছর কয়েক দফা বন্যার সম্মুখীন হয়। প্রথমটি এপ্রিল মাসে। এর পর দ্বিতীয়, তৃতীয় দফা শুরু হয় মে থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত।
বাবা-চাচার কাছে শুনেছি, এককালে সুনামগঞ্জ অত্যন্ত সমৃদ্ধ এলাকা ছিল। আরাম-আয়েশে দিন কাটাতেন ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই। তারা এতই সুখী ছিলেন যে, বছরে মাত্র আট মাস কাজ করতেন। খেলাধুলা, যাত্রাগান, নৌকাদৌড়, ঘোড়দৌড়, কবিগান, জারিগান ও পুঁথিপাঠের মধ্য দিয়ে কাটত তাদের অবশিষ্ট চার মাস। জুন-জুলাই মাসে সব বয়সের লোকেরাই খেলতে যেতেন খোলা মাঠে। অবস্থাস¤পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে রাতে বসত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আসর। কৃষকদের কখনও মাছ কিনতে হতো না। নদী বা হাওর থেকে যখন ইচ্ছে সংগ্রহ করে নিত। ‘ভাগালুদের’ ধান কাটা শেষ হতে না হতেই তা বিক্রি হয়ে যেত। তাদের এই জীবনযাত্রায় আকৃষ্ট হয়ে অন্য জেলার লোকেরা ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে বসতি স্থাপন করে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায়। স্থানীয়রা তাদের ‘আবাদি’ বলে আখ্যায়িত করেন। ৫০ বছর আগে যে অবস্থা ছিল, এখন আর তা নেই; স¤পূর্ণ উল্টো হয়ে গেছে।
একমাত্র বোরো ফসল হারানোর পর রাষ্ট্রপতির কিশোরগঞ্জসহ হাওর এলাকার কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। বলতে গেলে, এখন আর তাদের কোনো কাজই নেই; অবসর আর অবসর। তাহিরপুরের সব কয়টি হাওরে এখন ১০ ভাগ দেশি জাতের ধান চাষ হয়। লাখাই, রঙ্গিলা টেপি, বেহুন বিচি ও গচি শাইল। অনেকেই ব্রি ২৮ ও ব্রি ২৯ ধান চাষ করে। ব্রি ২৮ ধান পাকে ১৪০ দিনে এবং ব্রি ২৯ ১৬০/১৬৫ দিনে। প্রতি কেদার জমিতে জমি রোপণ থেকে কাটা-মাড়াই পর্যন্ত খরচ পড়ে ৫ হাজার টাকা। ফলন হয় ২৮ জাতে ১৫ মণ এবং ২৯ জাতে ২০ মণ। অধিকাংশ কৃষক মহাজন, এনজিও ও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে জমি রোপণ করেছিল। কীভাবে এই ঋণ শোধ করবে সেই চিন্তায় তাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এবারের বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলা। প্রথমবারের মতো এবার শনির হাওরের ৮০ ভাগ ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে দুই থেকে তিন বছর লাগবে। ফলে কৃষকরা কখনও সাফল্যের মুখই দেখতে পাবে না। পানিতে তলিয়ে যাওয়া হাওর থেকে খড়খুটা সংগ্রহ সম্ভব নয়। ফলে গো-খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। অপেক্ষাকৃত কম দামে গরু-মহিষ বিক্রি করা ছাড়া তাদের আর কোনো গত্যন্তর নেই।
তাদের দাবি : আমাদের বাঁচার মতো বাঁচতে দিন।
যাদুকাটা, রক্তি, বৌলাই, কংস, সুরমা ও অন্যান্য নদী এবং হাওরগুলো অনেক আগেই পলিমাটিতে ভরে গেছে। প্রতি বছর দুই থেকে আড়াই ফুট পলি পড়ে। কিন্তু নদীগুলো খনন (ড্রেজিং) ও হাওরের ফসল রক্ষার জন্য তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। বর্ষা মৌসুমের আগে তড়িঘড়ি করে বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু হয়। গত বছরের তুলনায় এবারে পানির উচ্চতা বেশি ছিল। ফলে পানির ধাক্কা সামলাতে না পেরে অধিকাংশ বেড়িবাঁধই ভেঙে যায়। বেড়িবাঁধ নির্মাণের এই পরিকল্পনা পাকিস্তান আমলের। এখন সময় এসেছে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে আলাপ করে নতুন করে নকশা তৈরি করার। ফসল বাঁচানোর লক্ষ্যে বাঁধগুলোর উচ্চতা আরও পাঁচ ফুট বেশি হওয়া আবশ্যক। শনি, মাটিয়ান, হালি, সোনামোড়ল, চন্দ্রসোনারথাল প্রভৃতি হাওরের ফসল বাঁচাতে চাইলে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। শনি ও মাটিয়ান হাওরের ফসল রক্ষা করতে পারলে সুনামগঞ্জ জেলার এক বছরের খোরাকির সংস্থান করা সম্ভব। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়সারা গোছের এ কাজে কৃষকেরা উপকৃত হয় না। পকেট ভর্তি হয় প্রজেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান-মেম্বার, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের। বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে হাওরের ফসলহানির ঝুঁকি থেকেই যাবে। গত ৫ মার্চ ঢাকায় সিএসআরএল, নাগরিক সংহতি ও অক্সফাম আয়োজিত এক নাগরিক সমাবেশ থেকে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়েছিল, সঠিক সময়ে ও টেকসই পদ্ধতিতে বাঁধ নির্মিত না হলে হাওরের কৃষক বহুশ্রমে উৎপাদিত ফসল ঘরে তুলতে পারবে না। গত তিন বছর সরকার সঠিক সময়ে অর্থ বরাদ্দ দিলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণে বাঁধ নির্মাণ কাজ গতি পাচ্ছে না। ২৮ ফেব্রুয়ারি বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বন্যার আগ পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে অর্ধেকের সামান্য বেশি। তার মানও সন্তোষজনক নয়। বন্যার পর পর সিলেট ও ঢাকায় বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধনে সুনামগঞ্জকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার দাবি জানানো হয়েছে।
বন্যার পর ভাটি এলাকার জনগণের কর্মসংস্থানের সঙ্গে সঙ্গে হাওরের ফসল রক্ষায় যেসব কর্মসূচি বিবেচনা করা যায় তার মধ্যে রয়েছে (১) শনি, মাটিয়ান, মহালিয়া, লোভা, বলদা, শামসা ও গালই হাওরের ফসল রক্ষার্থে বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা গ্রহণ; (২) নকশা পরিবর্তন করে বেড়িবাঁধের উচ্চতা আরও পাঁচ ফুট বৃদ্ধি করা; (৩) বেড়িবাঁধে কয়েকটি স্লুইস গেট নির্মাণ; (৪) প্রতিটি বাঁধে করচ, হিজল ও ঢোলকলমি গাছ লাগানো; (৫) জয়পুর থেকে ইকড়দাইর পর্যন্ত এক কিলোমিটার খাল খননের মাধ্যমে খর¯্রােতা পাটলাই নদীর গতি পরিবর্তন; (৬) ছোট হাওরগুলোতেও বেড়িবাঁধ নির্মাণ; (৭) যাদুকাটা, বৌলাই, সুরমা ও অন্যান্য নদী খনন এবং (৮) মহারাম নদীতে স্থায়ী স্লুইস গেট নির্মাণ।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ভাটি এলাকার উন্নয়নে কিশোরগঞ্জের সব উপজেলার সঙ্গে জেলা সদরের ‘অলসিজন’ রাস্তা নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন। সম্প্রতি তিনি বলেছেন, ‘আমি কোনো দলের রাষ্ট্রপতি নই।’ তার কথার সূত্র ধরে আমরা বলব, মহামান্য রাষ্ট্রপতি, আপনি কোনো একটি জেলারও নাগরিক নন। আপনার নজর বিস্তৃত হলে সমগ্র ভাটি এলাকায় উন্নয়নের জোয়ার বইবে। আমরা সেদিনের অপেক্ষায় থাকব।
[হাসান শাহরিয়ার : প্রবীণ সাংবাদিক, কলাম লেখক ও বিশ্লেষক; কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের ইন্টারন্যাশনাল প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী