বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২০, ০৮:২৩ পূর্বাহ্ন

Notice :

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফসলহানির প্রতারণামূলক পরিসংখ্যান

অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, ফসলরক্ষা বাঁধের ভাঙন ইত্যাদি প্রাকৃতিক ও মানবিক বিপর্যয় ঘটার কারণে সুনামগঞ্জ জেলায় এবার বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে সর্বমহল সম্যক অবগত আছেন। কিন্তু ‘ব্যাপক ক্ষতির পরিমাণ’ নির্ধারণে একটি মতদ্বৈধতা দেখা দিয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জেলায় বোরো ফসলের ক্ষতিকে সম্প্রসারণ করে দেখাতে নারাজ। এটি খুব ভাল প্রবণতা, যদি সত্যি সত্যি হয় সত্যকে প্রকাশ কিংবা অনুসরণের প্রচেষ্টা, সেটি আরও ভাল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দপ্তরটি ফসলহানির যে পরিসংখ্যান তৈরি করেছে, যেটাকে বিবেচনাপ্রসূত নির্ধারণ বলা যায় না কিছুতেই, সেখানে ক্ষতির পরিমাণ দেখানো হয়েছে, যাকে বলে, যৎসামান্য, মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ। অর্থাৎ সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কর্তৃক তৈরি পরিসংখ্যান অনুসারে এবার অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, বাঁধ ভেঙে সফসল হাওর তলিয়ে যাওয়া ইত্যাদির মতো ভয়ঙ্কর ফসল-ক্ষতিকারক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয়বিধ ঘটনা ফসলের তেমন কোন, বলতে গেলে মোটেই ক্ষতি করতে পারেনি। এই সব ভয়ঙ্কর বিপর্যয় বৃথাই সমগ্র জেলার উপর তান্ডবলীলা চালিয়েছে দিনের পর দিন। আর অসহায় কৃষক ক্ষেতের আলে দাঁড়িয়ে অপক্ক-অর্ধপক্ক ফসলডুবি দেখছে, আর উপলব্ধি করেছে তাঁকে রক্ষার কেউ নেই, কোথাও।
অপরদিকে কৃষক, জনপ্রতিনিধি, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা কিংবা জেলাবাসীর হিসেব মতে (বিস্তারিত আলোচনা এখানে পরিহার করা হলো) এবং পত্রিকার অনুসন্ধানী ভাষ্যমতে জেলার ফসলহানির পরিমাণ কিছুতেই শতকরা ৫০ ভাগের কম হতে পারে না বরং যথাযথ হিসেবে অধিক হবে অনুমিত হচ্ছে। দুই পক্ষের এই দুই হিসেবের এই গড়মিল, হিসেবের এই ব্যবধান-ব্যাপকতা সাধারণ মানুষের চিন্তায় বিভ্রান্তির উদ্রেক করেছে। গণিত বিষয়ে বা গাণিতিক হিসেব কষতে কারা বেশি দক্ষ কিংবা অদক্ষ সে বিষয়টি কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না। অভিজ্ঞমহলের ধারণা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ক্ষতির পরিমাণকে তাঁদের হিসেবে সম্প্রসারিত না করে অতিমাত্রায় সংকোচিত করে ফেলেছেন। হিসেবে বেশি দেখানো যেমন সত্যের অপলাপ তেমনি কম দেখানোটাও সত্যের বরখেলাফি। দু’টিই গর্হিত কর্ম। ন্যায্যতার বিচারে দু’টিই অন্যায় ও অবৈধ। এমনকি সম্যক বিচারে অপরাধও বটে। সাধারণ মানুষের ধরাণা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যে কৃষকের ফসলের ক্ষতির হিসাব নিয়ে শুভঙ্করের ফাঁকির খেলা খেলতে চাইছেন, তাতে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই। যেহেতু হাওরডুবি ও শিলাবৃষ্টি-ড্যুবরায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ আরোপ করা যে কোনও বিবেচনায় অসঙ্গত হবে। আর সে ক্ষতির ব্যাপকতার মাত্রা এতটাই বিশাল ও প্রকটভাবে দৃশ্যমান যে, পরিমাপ করতে বোধ করি কোন পরিসংখ্যানেরও দরকার নেই। যেখানে হাওরটা কৃষক কাঁচি নিয়ে ধানকাটতে নামার আগেই সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে, সেখানে সঙ্গত কারণেই ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে হিসেব নিকেশ করার ব্যাপারটি একটি অবান্তর প্রসঙ্গে পর্যবসিত হয়ে পড়েছে। বিনাপরিসংখ্যানেই বলে দেওয়া যায় শতভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাওরের ফসল বা কৃষকসমাজ।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা, জনপ্রতিনিধিরা ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিদের তাৎক্ষণিক অভিমত অনুসারে যেখানে ক্ষতির পরিমাণ ৭০ শতাংশকে ছাড়িয়ে যাওয়াই সাধারণ বিবেচনায় অধিক যুক্তি সঙ্গত, সেখানে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কী করে শতকরা ১৫ ভাগ ক্ষতির পরিসংখ্যান তৈরি করেছেন, বোঝে ওঠা সত্যি কষ্টকর ও স্বাভাবিক বোধবুদ্ধির অগম্য কিংবা অতীত। সত্যি নিরূপণের এইরূপ উদ্ভট ব্যবধান মানুষের বোধগম্যতাকে বিভ্রান্ত করে না কেবল, বরং বিকারগ্রস্ত করে তোলে।
কৃষকের ফসলক্ষতির পরিমাণ কম দেখিয়ে সুনামগঞ্জ জেলাকে সরকারপক্ষ থেকে ‘দুর্গত এলাকা’ ঘোষণার সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করা কিংবা কৃষকের সরকারি সহায়তার পরিমাণকে সংকোচিত করার সম্ভাবনাকে অনিবার্য করে তোলার পেছনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কোনও স্বার্থ আপাতত নেই, বলেই অনেকের ধারণা। কিন্তু ফসলহানির পরিমাণকে যৎসামান্য করে দেখানোর পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-এর অনিয়ম-দুর্নীতিকে আড়াল করার একটি দুরভিসন্ধি আছে বলে অভিজ্ঞমহল মনে করেন। এই মনে করাকে একেবারে অযৌক্তিক বলে পরিহার করতেও কেন জানি মন সায় দেয় না, বিবেকে বাঁধে। এমনটাই যদি হয়, তবে প্রকারান্তরে কৃষক সমাজের কী করা উচিত। তাঁদের করণীয় ব্যাপারে আপাতত মুখ বুজে রেখে, আমরা বলতে চাই, আমাদের জেলা প্রশাসন, আমাদের সরকারের ঊর্ধ্বতনমহল এই রকম তথ্য ফাঁকি যে প্রতিষ্ঠান, কৃষকের ক্ষতি করে যে সংস্থা তেমনসব প্রতিষ্ঠান-সংস্থার এইরূপ অপকর্মের প্রতিকার-প্রতিবিধান করা অবিলম্বে অবশ্য কর্তব্য। যদি তা না করা হয়, অচিরেই সরকার, সরকারি দল, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। আর তার পরিণাম হবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাওরডুবির চেয়েও অধিক ভয়াবহ।
যাঁরা এই মিথ্যাচারের প্রতিবিধান করার ক্ষমতা রাখেন, তাঁরা যদি প্রতিবিধান করতে ব্যর্থ হন, বা দেখেও না দেখার ভান করে থাকেন, তবে কৃষক কী করবে তার একটি নমুনা এখানে তোলে দিচ্ছি। তাহিরপুরের একজন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক “মোট চাষের অর্ধেক ক্ষতি, কৃষি বিভাগের প্রতারণা থামেনি” ও “ফসলের ক্ষতির হিসাব নিয়ে লুকোচুরি, ক্ষতির হিসাব দেখানো হচ্ছে মাত্র ১৫%” পত্রিকায় এইরূপ সংবাদ পড়ে মুঠোফোনে সম্পাদকীয় দপ্তরে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তাঁর বক্তব্যের মর্মার্থ হলোÑ শনির হাওর নিরান্নব্বই শতাংশ ফসলহানি ঘটেছে। অথচ ১৫ শতাংশ কীভাবে দেখানো হয়? তাঁর বোধগম্য নয়। তারপর তিনি ছাপার অযোগ্য গালিগালাজ করেছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্টজনকে। আমাদের মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ভিডিও গ্যালারী

ভিডিও গ্যালারী