অমিত দাস::
টাঙ্গুয়ার হাওর, নামটি উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল জল, দূরের মেঘালয় পাহাড়, নৌকার মৃদু দোল, শাপলা-শালুকের নীরব সৌন্দর্য আর আকাশ ছুঁয়ে উড়ে যাওয়া পাখির সারি। সুনামগঞ্জের বুকের ভেতরে রাখা এই জলরাশি শুধু একটি হাওর নয়; এটি প্রকৃতি, মানুষ, জীববৈচিত্র্য, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত পাঠশালা। বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রে টাঙ্গুয়ার হাওর আজ এক আকর্ষণীয় নাম। তবে এই আকর্ষণকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে পর্যটনকে হতে হবে আনন্দময়, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণমুখী। পরিসংখ্যান বলছে, টাঙ্গুয়ার হাওর প্রায় ১২৬ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এবং এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি। সুন্দরবনের পরে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই হাওরে মেঘালয় পাহাড় থেকে ৩০টিরও বেশি ঝরা (ঝরণা) এসে মিশেছে। দুই উপজেলার ১৮টি মৌজায় ৫১টি হাওরের সমন্বয়ে ১২,৬৬৫ হেক্টর এলাকা নিয়ে টাঙ্গুয়ার হাওর জেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি। এর পানিবহুল মূল হাওর প্রায় ২৮ বর্গকিলোমিটার এবং হাওরের ভেতরে ও তীরে রয়েছে প্রায় ৮৮টি গ্রাম। এই সংখ্যাগুলো শুধু তথ্য নয়; এগুলো প্রমাণ করে টাঙ্গুয়ার হাওর কত বড়, কত বৈচিত্র্যময় এবং কত মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে যুক্ত। টাঙ্গুয়ার হাওরের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার জীববৈচিত্র্য। শীতকালে এই হাওর হয়ে ওঠে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। ২০১৯ সালের পাখিশুমারি অনুযায়ী, হাওর ও আশপাশের এলাকায় ২০৮ প্রজাতির পাখি দেখা গেছে। আবার ২০১১ সালের এক পাখিশুমারিতে প্রায় ৪৭ প্রজাতির জলচর পাখির ২৮,৮৭৬টি পাখি গণনা করা হয়। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে এখানে প্রায় ২৫০ প্রজাতির পাখি, ১৪০ প্রজাতির মাছ, ১২টির বেশি প্রজাতির ব্যাঙ, ১৫০টির বেশি প্রজাতির সরীসৃপ এবং ১,০০০টিরও বেশি প্রজাতির অমেরুদ-ী প্রাণীর উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এখানে প্রায় ২০০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় বলে উল্লেখ আছে। এই জীববৈচিত্র্য টাঙ্গুয়ার হাওরকে শুধু পর্যটনের জায়গা নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদে পরিণত করেছে। এই হাওরকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা অসাধারণ। বর্ষায় যখন চারদিক জলমগ্ন থাকে, তখন নৌকায় ভেসে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা পর্যটকদের কাছে স্বপ্নের মতো মনে হয়। শীতে যখন জল কমে আসে, তখন পাখি দেখা, গ্রামীণ জীবন দেখা, স্থানীয় খাবার উপভোগ করা এবং প্রকৃতির শান্ত সৌন্দর্য অনুভব করার সুযোগ তৈরি হয়। পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় মাঝি, গাইড, খাবার সরবরাহকারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নারী উদ্যোক্তা ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট মানুষের আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সঠিক পরিকল্পনায় টাঙ্গুয়ার হাওর স্থানীয় অর্থনীতির জন্য একটি সুন্দর ও টেকসই সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। বিশ্ব পর্যটনের পরিসংখ্যানও আমাদের আশাবাদী করে। ২০১৯ সালের হিসাবে পর্যটন খাত বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ৮ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অবদান রাখে, যা বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ। এই শিল্পের সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন মানুষ কর্মরত ছিল এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫০ কোটি। বাংলাদেশেও অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে; ধারণা করা হয়, দেশে প্রায় ১ দশমিক ৫ কোটির বেশি অভ্যন্তরীণ পর্যটক বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেন এবং প্রায় ৪০ লাখের বেশি মানুষ পর্যটনসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত। এই বাস্তবতায় হাওর পর্যটনকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে তা কর্মসংস্থান, স্থানীয় আয় ও সাংস্কৃতিক পরিচিতি বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে টেকসই পর্যটনের মূল কথা হলো- প্রকৃতি থাকবে, মানুষও উপকৃত হবে। টাঙ্গুয়ার হাওরকে শুধু ভ্রমণের জায়গা হিসেবে দেখলে হবে না; তাকে দেখতে হবে একটি সংবেদনশীল জলাভূমি হিসেবে। অতিরিক্ত নৌকা চলাচল, উচ্চ শব্দ, প্লাস্টিক বর্জ্য, পাখির আবাসস্থলে অযথা প্রবেশ, অনিয়ন্ত্রিত রাতযাপন বা অসচেতন আচরণ হাওরের পরিবেশে চাপ তৈরি করতে পারে। তাই আনন্দের সঙ্গে দায়িত্বও প্রয়োজন। পর্যটক যদি সৌন্দর্য উপভোগ করেন, তবে সেই সৌন্দর্য রক্ষার দায়িত্বও তাঁর। টাঙ্গুয়ার হাওরের টেকসই পর্যটনের জন্য প্রথম প্রয়োজন সুপরিকল্পিত নৌপর্যটন। প্রতিটি পর্যটন নৌকায় লাইফ জ্যাকেট, প্রাথমিক চিকিৎসা বাক্স, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, বর্জ্য রাখার পাত্র এবং প্রশিক্ষিত মাঝি থাকা জরুরি। নির্দিষ্ট রুট অনুসরণ করলে পাখির আবাসস্থল, মাছের প্রজননক্ষেত্র ও সংরক্ষিত এলাকার ওপর চাপ কমবে। পর্যটকদের জন্য নির্দিষ্ট উঠানামার স্থান, নিরাপদ নোঙরস্থান এবং পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন। এতে পর্যটক যেমন নিরাপদ থাকবেন, তেমনি হাওরের পরিবেশও সুরক্ষিত থাকবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা হতে হবে কঠোর ও সহজ। হাওরে পলিথিন, প্লাস্টিক বোতল, খাবারের প্যাকেট বা অন্য কোনো আবর্জনা ফেলা যাবে না। প্রতিটি নৌকায় “নিজের বর্জ্য, নিজে ফেরত” নীতি চালু করা যেতে পারে। পর্যটকদের হাতে ছোট বর্জ্যব্যাগ দেওয়া যেতে পারে। ঘাটে বর্জ্য সংগ্রহকেন্দ্র থাকলে নৌকা থেকে আনা বর্জ্য সহজে জমা দেওয়া যাবে। এতে হাওরের জল, মাছ, পাখি ও উদ্ভিদ নিরাপদ থাকবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে হবে। টাঙ্গুয়ার হাওরের মানুষ হাওরকে সবচেয়ে ভালো চেনেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি, ভাষা, খাবার, নৌকা চালানোর দক্ষতা এবং প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান পর্যটনের বড় স¤পদ। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ইকো-গাইড তৈরি করা যায়। স্থানীয় নারীদের মাধ্যমে খাবার, হস্তশিল্প ও ছোট পর্যটনসেবা চালু করা যায়। গ্রামের ঘরোয়া পরিবেশে সীমিত ও পরিচ্ছন্ন হোমস্টে গড়ে উঠতে পারে। এতে পর্যটনের আয় স্থানীয় মানুষের হাতে থাকবে এবং তারা আরও আন্তরিকভাবে হাওর সংরক্ষণে যুক্ত হবে। পর্যটকদের আচরণবিধি সহজ ভাষায় প্রচার করা দরকার। যেমন, উচ্চ শব্দে গান নয়, পাখির খুব কাছে যাওয়া নয়, প্লাস্টিক ফেলা নয়, স্থানীয় মানুষের ছবি তুলতে হলে অনুমতি নিতে হবে, ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতির প্রতি সম্মান দেখাতে হবে, শিশু ও প্রবীণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, এবং গাইডের নির্দেশনা মানতে হবে। “নিরাপদ ও টেকসই পর্যটন আচরণবিধি, ২০২৫”-এও দায়িত্বশীল আচরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি সম্মান, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা এবং পরিবেশবান্ধব ভ্রমণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো সংবেদনশীল এলাকায় এই নীতিগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা দরকার। প্রতিদিন কতজন পর্যটক আসছেন, কতটি নৌকা চলছে, কোন মৌসুমে চাপ বেশি, কোথায় পাখির আবাস বেশি, কোন এলাকায় বর্জ্য জমছে এসব তথ্য নিয়মিতভাবে সংগ্রহ করা গেলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নৌকা নিবন্ধন, অনলাইন অনুমতি, পর্যটক সংখ্যা গণনা এবং আবহাওয়ার সতর্কবার্তা চালু করা যেতে পারে। এতে নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা দুটোই উন্নত হবে। হাওরের জলবায়ু বাস্তবতাও মাথায় রাখতে হবে। টাঙ্গুয়ার হাওর মেঘালয় পাহাড়ের কাছাকাছি হওয়ায় পাহাড়ি ঢল, অকাল বন্যা ও বৃষ্টির পরিবর্তিত ধরণ এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই পর্যটন পরিকল্পনায় মৌসুমভিত্তিক নিরাপত্তা নির্দেশনা থাকতে হবে। বর্ষায় কোথায় যাওয়া নিরাপদ, কোন সময়ে নৌকা চলাচল সীমিত রাখা দরকার, ঝড়-বৃষ্টির সময় পর্যটক কী করবেন - এসব বিষয় আগে থেকেই জানিয়ে দিতে হবে। এতে পর্যটকও নিরাপদ থাকবেন, সেবাদানকারীরাও প্রস্তুত থাকতে পারবেন। টাঙ্গুয়ার হাওরকে কেন্দ্র করে একটি সুন্দর “হাওর ইকো-ট্যুরিজম মডেল” গড়ে তোলা সম্ভব। এই মডেলের ভিত্তি হতে পারে চারটি বিষয়প্রকৃতি সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের আয়, নিরাপদ পর্যটন এবং সংস্কৃতির মর্যাদা। পর্যটক এখানে শুধু ঘুরতে আসবেন না; তিনি শিখবেন কীভাবে একটি জলাভূমি বেঁচে থাকে, কীভাবে পাখি হাজার মাইল পেরিয়ে আসে, কীভাবে মানুষ পানির সঙ্গে সহাবস্থান করে, কীভাবে একটি হাওর একই সঙ্গে জীবন, জীবিকা ও সৌন্দর্যের উৎস হয়। টাঙ্গুয়ার হাওরের উন্নয়ন মানে কংক্রিটের ভারে প্রকৃতিকে চাপা দেওয়া নয়। বরং উন্নয়ন মানে হবে হাওরের নিজস্ব সৌন্দর্যকে অক্ষুণœ রেখে পর্যটকের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন সুবিধা তৈরি করা। বড় স্থাপনার চেয়ে এখানে দরকার ছোট, পরিবেশবান্ধব, স্থানীয় উপযোগী উদ্যোগ। কাঠ বা বাঁশের নির্দিষ্ট বিশ্রামস্থান, সৌরবিদ্যুৎভিত্তিক আলো, পরিচ্ছন্ন ঘাট, প্রশিক্ষিত গাইড, নিরাপদ নৌকা, তথ্যফলক, স্থানীয় খাবারের পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা - এসবই হতে পারে টাঙ্গুয়ার হাওরের টেকসই পর্যটনের বাস্তব রূপ। সবশেষে বলা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওর আমাদের কাছে শুধু জলাভূমি নয়; এটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য অধ্যায়। এই হাওরের প্রতিটি ঢেউ, প্রতিটি পাখি, প্রতিটি গ্রাম, প্রতিটি নৌকা আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্ব করেই উন্নয়নকে দীর্ঘস্থায়ী করা যায়। টাঙ্গুয়ার হাওর যদি পরিকল্পিত, দায়িত্বশীল ও অংশগ্রহণমূলক পর্যটনের পথে এগোয়, তবে এটি বাংলাদেশের টেকসই পর্যটনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। পর্যটক আনন্দ পাবেন, স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবেন, জীববৈচিত্র্য সুরক্ষিত থাকবে এই তিনের সুন্দর মিলনেই গড়ে উঠবে টাঙ্গুয়ার হাওরের ভবিষ্যৎ।
[অমিত দাস : শিক্ষার্থী, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
টেকসই পর্যটন উন্নয়ন ও টাঙ্গুয়ার হাওর
- আপলোড সময় : ০৩-০৬-২০২৬ ১০:০৮:৫৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৩-০৬-২০২৬ ১০:১১:১১ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক