মোসাইদ রাহাত::
প্রাণের নদী সুরমা ধীরে ধীরে হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক রূপ। গত ৪৩ বছরে নদীটির গড় প্রস্থ কমেছে প্রায় ৪০ মিটার। একই সময়ে নদীতে পলি জমার পরিমাণ ছিল ভাঙনের প্রায় দ্বিগুণ। এতে নদীর গতিপথ, বাঁক ও প্রবাহে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। গবেষকেরা বলছেন, অতিরিক্ত পলি জমা, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন, দখল ও দূষণের কারণে নদীটি ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের গবেষকদের করা এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী আমেরিকান জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্স, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে প্রকাশিত গবেষণাটির শিরোনাম ছিল “স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিলেট জেলার সুরমা নদীর গঠনগত পরিবর্তনের বিশ্লেষণ”। গবেষণায় ১৯৭৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে সুরমা নদীর গতিপথ, প্রস্থ, ভাঙন ও পলি জমাসহ গঠনগত পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৮ সালে সুরমা নদীর গড় প্রস্থ ছিল ১৬৩ দশমিক ২০ মিটার। ২০২১ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩৪ দশমিক ৪৫ মিটারে। অর্থাৎ ৪৩ বছরে নদীটির গড় প্রস্থ কমেছে প্রায় ২৯ মিটার। তবে ১৯৯৯ সালে নদীর গড় প্রস্থ নেমে গিয়েছিল মাত্র ৯৮ দশমিক ৬৫ মিটারে। গবেষকরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে নদীটির সংকোচন প্রবণতা স্পষ্ট।
গবেষণায় আরও বলা হয়, ১৯৭৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে সুরমা নদীতে মোট পলি জমেছে ৩ হাজার ১৫৭ দশমিক ৮৪ একর এলাকায়। বিপরীতে ভাঙনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭৭ একর ভূমি। অর্থাৎ ভাঙনের তুলনায় পলি জমার পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
গবেষকরা বলছেন, অতিরিক্ত পলি জমাই নদীটির প্রস্থ কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। বিশেষ করে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে ভয়াবহ বন্যার কারণে উজান থেকে বিপুল পরিমাণ পলি এসে নদীতে জমা হয়। ওই সময়েই সবচেয়ে বেশি পলি জমার ঘটনা ঘটে।
গবেষণায় নদীর ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক বা অংশ বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, কানাইঘাট, দক্ষিণ বানিগ্রাম ও লালারগাঁও এলাকায় নদীর গতিপথ সবচেয়ে বেশি বদলেছে। বিশেষ করে বলাউড়া বাজার এলাকায় নদীর বাম তীর ৬৬৩ দশমিক ৫১ মিটার এবং ডান তীর ৫৭২ দশমিক ৩৪ মিটার পর্যন্ত সরে গেছে।
গবেষকরা জানান, নদীর বাম তীরে ক্ষয় ও সরে যাওয়ার প্রবণতা বেশি। তবে ডান তীরেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে। দুই তীরের এই পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে নদীটি ক্রমেই সরু হয়ে পড়ছে। গবেষণায় নদীর বাঁক বা ‘সিনুয়াসিটি ইনডেক্স’ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সময়ের সঙ্গে নদীটি আরও আঁকাবাঁকা বা ‘মিয়ান্ডারিং’ চরিত্র ধারণ করছে। ১৯৭৮ সালে নদীর সামগ্রিক সিনুয়াসিটি ইনডেক্স ছিল ১ দশমিক ৬১, যা ২০২১ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ৮৫-এ।
গবেষকরা মনে করছেন, নদীতে স্বাভাবিক প্রবাহ কমে যাওয়া ও অতিরিক্ত পলি জমার কারণে পানির গতিপথ বারবার বদলে যাচ্ছে। এর ফলে কোথাও ভাঙন বাড়ছে, কোথাও নদী ভরাট হয়ে নতুন চর তৈরি হচ্ছে।
গবেষণার বলা হয়েছে, সুরমা নদী এখন উল্লেখযোগ্যভাবে তীর সরে যাওয়া, পলি জমা বৃদ্ধি, প্রস্থ কমে যাওয়া এবং অধিক আঁকাবাঁকা হয়ে পড়ার বৈশিষ্ট্য বহন করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানের পাহাড়ি নদীগুলো থেকে নেমে আসা বিপুল পলি, নদীদখল, অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন ও দূষণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
গবেষণায় আরও সতর্ক করা হয়, সুরমা নদীর ভারসাম্য নষ্ট হলে এর প্রভাব পড়বে সিলেট অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, নৌপথ, কৃষি ও সামগ্রিক পরিবেশব্যবস্থার ওপর। তাই নদী রক্ষায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে মত দিয়েছেন গবেষকরা।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. বাহাউদ্দিন শিকদার বলেন, নদীর পাশে যে এলাকাগুলো রয়েছে সেখানে কেউ চাষাবাদ কেউ অবৈধভাবে স্থাপনা গড়ে তোলার কারণে নদীর প্রস্থ দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরকারের পাশাপাশি সাধারণ জনগণকে জনসচেতনতা তৈরি করতে। নদীকে রক্ষায় সরকারকে অবৈধভাবে স্থাপনা উচ্ছেদ ও নদীতে জমা হওয়া পলিগুলো সরকার নিয়মিত খনন কাজের মাধ্যমে উত্তোলন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি নদী থেকে পলি উত্তোলন থেকে না করা হয় তাহলে সিলেট অঞ্চলে বিগত দিনের মতো ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হতে হবে এবং দীর্ঘস্থায়ী বন্যা দেখা দিতে পারে। নদীর গতিপথে যে প্রতিবন্ধতা সৃষ্টি হয়েছে তা দূর করতে হবে সেজন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
৪৩ বছরে ৪০ মিটার সংকুচিত সুরমা নদী, দ্বিগুণ জমেছে পলি
- আপলোড সময় : ২৪-০৫-২০২৬ ১০:২০:২১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৪-০৫-২০২৬ ১০:২২:৪৩ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ