স্টাফ রিপোর্টার::
হাওরের জনপদে প্রতিদিনের সকালগুলো সাধারণত একই রকম। নদীপথে মানুষের যাতায়াত, স্পিডবোট ঘাটে অপেক্ষা, বাজারমুখী মানুষের ব্যস্ততা আর জীবিকার টানাপোড়েন। কিন্তু শুক্রবার সকালে ধর্মপাশার মহদীপুর স্পিডবোট ঘাটে ঘটে গেল একটু ভিন্ন দৃশ্য। সেখানে এক কিশোরীকে ঘিরে তৈরি হয় স্বপ্ন দেখার গল্প, শিক্ষার গুরুত্ব আর ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার অনুপ্রেরণার এক আবহ। ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী দেবমিতা সরকার হৈমন্তী - হাওরাঞ্চলের মেয়ে। ক্যাডেট কলেজের ইউনিফর্ম পরে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটিকেই হঠাৎ নজরে পড়ে ধর্মপাশা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সহিদ উল্যার। বিট পুলিশিং সভায় যোগ দিতে গোলকপুর বাজারে যাওয়ার পথে তিনি থেমে কথা বলেন দেবমিতার সঙ্গে। কুশল বিনিময়ের একপর্যায়ে ওসি বুঝতে পারেন, হাওরপাড়ের এই মেয়েটি কঠিন প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নিয়েছে। এরপর তিনি ঘাটে উপস্থিত যাত্রী, অভিভাবক ও স্থানীয় লোকজনকে কাছে ডাকেন। মুহূর্তেই স্পিডবোট ঘাট যেন পরিণত হয় এক অনানুষ্ঠানিক প্রেরণার মঞ্চে। ওসি সহিদ উল্যা বলেন, হাওরপাড়ের একজন মেয়ে প্রতিযোগিতা করে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ছে। সে আমাদের গর্ব, অহংকার। আপনারাও স্বপ্ন দেখুন - আপনাদের সন্তানরাও একদিন বড় হবে, দেশ-বিদেশে দায়িত্বশীল জায়গায় কাজ করবে, হাওরবাসীর জন্য কিছু করবে। তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন উপস্থিত মানুষজন। অনেকের চোখেমুখে ছিল বিস্ময়, আবার কারও চোখে ছিল নতুন স্বপ্নের ঝিলিক। কারণ, হাওরাঞ্চলের বহু পরিবার এখনও দারিদ্র্য, যোগাযোগ সংকট ও শিক্ষাবঞ্চনার সঙ্গে লড়াই করে টিকে আছে। সেখানে দেবমিতার মতো একজন কিশোরীর সাফল্য যেন সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেয়। ওসি শুধু শিক্ষার কথাই বলেননি, তরুণ সমাজকে বিপথ থেকে রক্ষার বিষয়েও সতর্ক করেন। তিনি বলেন, মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সন্তানদের দিকে খেয়াল রাখুন। তাদের ভালো কাজে উৎসাহ দিন। দেবমিতার মতো শিক্ষার্থীদের উদাহরণ সামনে আনলে অন্যরাও অনুপ্রাণিত হবে। স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিরাও দেবমিতার প্রশংসা করেন। উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল হক বলেন, দেবমিতা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো হাওরাঞ্চলের গর্ব। তার মতো শিক্ষার্থীদের গল্প ছড়িয়ে দিতে হবে। দেবমিতার পরিবারও মেয়ের এই অর্জনে গর্বিত। তার বাবা অমর সরকার বর্তমানে তাহিরপুর উপজেলা কৃষি ব্যাংক শাখার কর্মকর্তা। মা লিপিকা তালুকদার একজন শিক্ষিকা। পরিবার জানায়, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি দেবমিতার আগ্রহ ছিল প্রবল। বিভিন্ন সময়ে সে জেলা পর্যায়ে বৃত্তিও অর্জন করেছে। মধ্যনগর উপজেলার ফারুকনগরের মেয়ে দেবমিতা বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে সুনামগঞ্জ শহরের উকিলপাড়ায় বসবাস করছে। ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে লাজুক হাসিতে সে বলে, “আমি বড় হয়ে হাওরবাসীর জন্য কাজ করতে চাই।” হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশির মতোই হয়তো তার স্বপ্নও অনেক বড়। আর সেই স্বপ্নের গল্পই এখন অনুপ্রেরণা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ঘাট থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে পুরো হাওরাঞ্চলে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
হাওরপাড়ের মেয়ের স্বপ্নযাত্রা
ক্যাডেট কলেজের ছাত্রী দেবমিতাকে ঘিরে অনুপ্রেরণার এক সকাল
- আপলোড সময় : ২৩-০৫-২০২৬ ১০:০১:০২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৩-০৫-২০২৬ ১০:০৩:১৮ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

ধর্মপাশা প্রতিনিধি