১৬ মাসে ৫২২ শিশু হত্যা, নিরাপত্তাহীনতায় শৈশব
- আপলোড সময় : ২২-০৫-২০২৬ ১১:০৪:২৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০৫-২০২৬ ১১:০৪:২৫ পূর্বাহ্ন
সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তার। পৃথিবীর কোনো স্বার্থ কিংবা দ্বন্দ্বে তার ভূমিকা নেই। অথচ তার সঙ্গেই ঘটেছে পাশবিক নৃশংসতা। ঢাকার পল্লবীতে এই শিশুকে টয়লেটে নিয়ে প্রথমে ধর্ষণ করা হয়। পরে তাকে গলা কেটে হত্যা করেন পাশের ফ্ল্যাটে থাকা দম্পতি সোহেল রানা (৩০) এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (২৬)। গত ১৯ মে সকালে পল্লবী সেকশন-১১ এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
গলাকাটা অবস্থায় চট্টগ্রামের সীতাকু-ের জঙ্গল থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা করতে চেয়েছিলেন তারই প্রতিবেশী বাবু শেখ। মৃত ভেবে শিশুটিকে তিনি ফেলে যান পাহাড়ের খাদে। গত ১ মার্চ গলাকাটা অবস্থায় দুর্গম পাহাড় থেকে উদ্ধার হওয়া ওই শিশু পরদিন ২ মার্চ দিবাগত রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল (চমেক) কলেজ হাসপাতালে মারা যায়।
তিন বছরের ফুটফুটে নিষ্পাপ শিশু হাবিব। রাজধানীর বাড্ডার এই শিশু জন্মদাতার চরম নিষ্ঠুরতায় পৃথিবী ছেড়েছে। যে হাত তাকে পরম নির্ভরতায় আগলে রাখার কথা, সেই হাত তাকে গলা টিপে হত্যা করেছে। গত ২৭ এপ্রিল স্ত্রী শিল্পী খাতুনের কাছে মাদক কেনার টাকা চেয়ে না পেয়ে তার সামনে সন্তানকে গলাটিপে হত্যা করেন শাহিন মিয়া। একইদিন গাজীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে গলা কেটে ও পানিতে ফেলে হত্যা করা হয়েছে পাঁচ শিশুকে।
শিশু রামিসা, ইরা কিংবা তিন বছরের হাবিবই শুধু নয়, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান বলছে, গত ১৬ মাসে (২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের এপ্রিল) হত্যা করা হয়েছে অন্তত ৫২২ শিশুকে। গড়ে মাসে ৩২ জনের বেশি শিশু নিহত হয়েছে। এ সময়ে ধর্ষণসহ চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছে ১ হাজার ২২৩ শিশু। গড়ে মাসে ৭৬ জনের বেশি শিশু ধর্ষণসহ নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, মাদকের অবাধ ব্যবহার, সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অভাব, সাইবার দুনিয়ার প্রতি নিয়ন্ত্রণহীন আসক্তি ও পারিবারিক বন্ধন ঢিলে হয়ে পড়ার শিকার হচ্ছে শিশুরা। সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা পরিবারে শিশুদের ওপর প্রভাব ফেলছে। বড়দের ব্যক্তিস্বার্থ ও লোভ-দ্বন্দ্বের কাছে নৃশংস হয়ে উঠছে কোমলমতি শিশুর স্বস্তির পৃথিবী। প্রতিপক্ষকে ফাঁসানো, প্রতিশোধ কিংবা অপরাধ আড়াল করতে কখনো মা-বাবাসহ আপনজন হয়ে উঠছেন শিশুদের ঘাতক।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সামাজিক অনুশাসন ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, মাদকাসক্তি, অনৈতিক স¤পর্ক, সহনশীলতার অভাব, দ্রুত বিত্তশালী হওয়ার প্রবণতা, নিঃসঙ্গ জীবনযাপন, আত্মকেন্দ্রিকতা, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতার মনোভাব, অসচ্ছলতার কারণে ঘটছে এসব ঘটনা। এ ধরনের অপরাধ কমাতে হলে পরিবারের পাশাপাশি সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস বাড়ানোর কথাও বলছেন তারা। প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে মানবিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে সবাইকে আরও মনোযোগী হতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, অপরাধীরা সবসময় দুর্বলকে টার্গেট করে। শিশুরা দুর্বল হওয়ায় লোভ ও স্বার্থের জন্য তাদের হত্যা করা হয়। আগে মুক্তিপণের জন্য অপহরণ ও প্রতিশোধ নিতে শিশুদের খুন করা হতো। ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও ছিল। এটি ঘটতো বেশিরভাগ পরিচিতজন ও স্বজনদের দ্বারা। কয়েক বছর ধরে পারিবারিক কলহের জেরে স্বামী-স্ত্রীর হাতে সন্তানদের খুনের ঘটনা বাড়ছে। পারিবারিক অস্থিরতা ও অসততার কারণে শিশু খুনের ঘটনা বাড়ছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলে পড়ছে মুনতাহিনা মুনের কন্যাসন্তান। মুন গণমাধ্যমকে বলেন, আমার সাত বছরের মেয়ে নিয়ে ভীষণ টেনশন হয়। ইদানীং ফেসবুকে যা দেখছি তা কল্পনাও করা যায় না। মানুষ কতটা পাষাণ হলে বাচ্চাদের সঙ্গে এমন অপরাধ করতে পারে।
রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে পড়ে লাবনী আক্তারের মেয়ে। তিনি বলেন, বর্তমানে যার ঘরে একটা মেয়ে সন্তান আছে সেই জানে কতটা চিন্তা। মেয়েকে একা কোথাও যেতে দেই না। সবসময় সঙ্গে সঙ্গে রাখি। পরিবেশ-পরিস্থিতি ভালো না। এজন্য নজরে রাখি। এখন কাউকেই বিশ্বাস করা যায় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া একজন মেয়ে শিশুর বাবা বলেন, সমাজ নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষ আর মানুষ নেই, পশুতে রূপান্তর হয়েছে। ভরসা করার মতো দুনিয়ায় মা-বাবা ছাড়া সন্তানের আর কেউ নেই। এসব দেখতে দেখতে আমরা নিজেরাও ট্রমাটাইজড (মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত)।
শিশু বুঝতেই পারে না কোন আচরণ বিপজ্জনক :
শিশুর অভিজ্ঞতা ও বিচারবোধ কম থাকায় সে সহজে বুঝতে পারে না কোন আচরণ নিরাপদ আর কোনটি বিপজ্জনক। অপরিচিত মানুষের প্রলোভন, খারাপ স্পর্শ সম্পর্কে তারা সচেতন নয়। এ ক্ষেত্রে পরিবার বিশেষ করে বাবা-মায়ের দায়িত্ব হলো শিশুদের সতর্ক করা, নিরাপত্তা শেখানো এবং সবসময় নজরে রাখা।
এ বিষয়ে সাইকোথেরাপিস্ট নুসরাত সাবরিন চৌধুরী বলেন, শিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা শুধু একটি সামাজিক অপরাধ নয়, এটি একটি গভীর মানসিক ও মানবিক সংকট, যা শিশুর নিরাপত্তা বোধ, বিশ্বাসের ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ মানসিক বিকাশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশে সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনার বৃদ্ধি কোনো একক কারণে নয় বরং সামাজিক, পারিবারিক, ডিজিটাল ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন ঝুঁকির সম্মিলিত ফল। বর্তমানে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন একদিকে অগ্রগতি আনলেও অন্যদিকে শিশু-কিশোরদের মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, অভিভাবকের দীর্ঘসময় অনুপস্থিতি, একক ও বিভক্ত পরিবার, নিরাপদ পরিবেশ এবং পর্যাপ্ত তত্ত্বাবধানের অভাব অনেক ক্ষেত্রে শিশুর নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। একই সঙ্গে লজ্জা, ভয়, অবিশ্বাসের আশঙ্কা, দোষারোপের ভয়, পরিচিত ব্যক্তির জড়িত থাকা, পরিবারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক চাপের কারণে শিশুরা অনেক সময় নিজের ভেতরের কষ্ট প্রকাশ না করে নীরবে তা বহন করে চলে। ডিজিটাল ডিভাইস ও ইন্টারনেটের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে পর্নোগ্রাফিক কনটেন্টের সহজলভ্যতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার কিছু নেতিবাচক প্রভাব এবং এ ধরনের সহিংসতায় বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
নুসরাত সাবরিন চৌধুরীর আরও বলেন, একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি শুধু ঘটনার মুহূর্ত নয় বরং পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া ভয়, উদ্বেগ এবং মানুষের প্রতি আস্থাহীনতা। অনেক শিশু নীরবে ভেঙে পড়ে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাদের স¤পর্ক, শিক্ষা এবং মানসিক স্বাস্থ্যে প্রতিফলিত হয়। এটি শুধু একটি সামাজিক বা নৈতিক সংকট নয়, বরং একটি গুরুতর আইনি বিষয়ও। দেশে শিশু সহিংসতায় দ্রুত বিচার, কঠোর শাস্তি এবং ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষা- এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে বাস্তব অগ্রগতি সম্ভব। সেই সঙ্গে পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সব স্তরে সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বড়দের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব হলে শিশুরা প্রতিশোধের বিষয়বস্তু হয়ে উঠছে। মা-বাবাও সন্তানকে হত্যা করছে। পরিবারের পুরুষের মধ্যে কেউ মাদকাসক্ত থাকলে শিশুরা হচ্ছে তার প্রধান শিকার। স্বজনদের হাতে শিশু নির্যাতন এ দেশে খুবই স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। হত্যার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়ায় শিশুহত্যা দিন দিন বাড়ছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। তিনি বলেন, পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দক্ষতা বাড়ানো এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে। এছাড়াও শিশু নির্যাতনকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, পারিবারিক সহিংসতা কমাতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আইন হয়েছে। শুধু আইন হলেই হবে না, আইনের প্রয়োগ দরকার। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পরকীয়া অনেক বেশি বেড়েছে। মানুষের মধ্যে যে ধৈর্য থাকা দরকার তা নেই। নৈতিকতা, মূল্যবোধ কমে গেছে। এসব মানসিক অস্থিরতা পারিবারিক সহিংসতার মূল কারণ। তিনি বলেন, বিয়ের পর ছোটখাটো বিষয় নিয়ে যে ঝামেলা তৈরি হয় সেটা মেটানোর জন্য মাঝে যে লোকগুলো থাকে তারা সমাধানে এগিয়ে আসে না। বরং দুজনের মধ্যে আরও ইন্ধন জোগায়। এ কারণে পারিবারিক সহিংসতা বেড়ে যায়।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ.এইচ.এম. শাহাদাত হোসেন বলেন, শিশুদের ওপর নির্যাতনের সবগুলো ঘটনা পুলিশ যথেষ্ট আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছে। সব ঘটনাই গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হয়। তিনি বলেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জনস¤পৃক্ততা বাড়াতে পুলিশ বিভিন্ন এলাকায় বিট পুলিশিং, উঠান বৈঠক ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সমাজে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা তখনই সম্ভব যখন পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত সহযোগিতা থাকে। সামান্য বিরোধ বা সামাজিক ছোটোখাটো বিষয় যেন সহিংসতা কিংবা হত্যাকা-ে রূপ না নেয়, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক