সুনামগঞ্জ , শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ , ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না : মির্জা ফখরুল শিশুর হাতে স্মার্টফোন : আশীর্বাদ না অভিশাপ? হাওরের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের দাবি টাঙ্গুয়ার হাওরে উজাড় হচ্ছে হিজল-করচ বাগ সাম্রাজ্যবাদী ও দেশবিরোধী সব চুক্তি বাতিলের দাবি “সমন্বয়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন হান্নান মাসউদ” গুপ্ত ছিলাম, বাইরে যাইনি, ভবিষ্যতেও পালাবো না : জামায়াত আমির প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হলেন যাঁরা বিদ্যুতের দাম বাড়লো দুই বছরে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন ২১৫ জন তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১৪৮৭ কোটি টাকা মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ গণমাধ্যম, পুলিশ ও প্রবাসীদের উদ্যোগে অসহায় সাজু মিয়ার মুখে হাসি হাওরপাড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস যাত্রী ওঠানো নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১২, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর ১০টি পৌরসভার পানি সরবরাহ লাইনে ত্রুটি, দুর্ভোগে ৬ শতাধিক গ্রাহক স্থানীয় সরকার নির্বাচন : আগস্টের শেষে তফসিল, অক্টোবরে ভোটের চিন্তা হাওরে কৃষকের নিরানন্দ ঈদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা : এমপি কামরুল
গানই তাঁর আনন্দ, গানই তাঁর জীবন

সুনামগঞ্জের সংগীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র রূপশ্রী রায়

  • আপলোড সময় : ২০-০৫-২০২৬ ০৯:২৭:২৩ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২০-০৫-২০২৬ ০৯:২৮:১৩ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জের সংগীতাঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্র রূপশ্রী রায়
সৌরভ অধিকারী অয়ন::>
রূপশ্রী রায় বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। শাস্ত্রীয় সংগীত, লোক সংগীত, কীর্তন, নজরুল সংগীত ও আধুনিক সংগীত জুড়ে রয়েছে তাঁর অবাধ বিচরণ। তিনি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোক্তারপাড়ার এক সংগীতানুরাগী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সুকুমার রায় এবং মাতার নাম মালতী রায়। পারিবারিকভাবেই তিনি সংগীত চর্চার সাথে সম্পৃক্ত হন। সংগীত জগতের সাথে যুক্ত হওয়ার পেছনে তাঁর পরিবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ভাইবোনদের মধ্যে তাঁর অবস্থান ষষ্ঠ। সাংস্কৃতিক পরিবারে থাকার সুবাদে ছোটবেলা থেকেই বড় ভাই-বোনদের সংগীত চর্চা সরাসরি দেখার সুযোগ হয়। তা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি নিজেও সংগীতের প্রতি আগ্রহ অনুভব করেন। বিশেষ করে তাঁর বড় ভাই প্রদীপ রায়ের সংগীত চর্চা তাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে এবং ভাইকে অনুকরণ করার মাধ্যমে একসময় তাঁরও সংগীতের প্রতি ভালোবাসা জন্মে। তাঁর বোনেরা যখন গোপাল দত্ত উস্তাদজী এবং রাসবিহারী চক্রবর্তী উস্তাদজীর নিকট গান শিখতেন তখন তিনি উনাদের সাথে বসে থাকতেন, উনাদের গান শুনতেন এবং শুনে শুনে নিজেও চর্চা করতেন। তাতে করে গানের প্রতি ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়। সংগীতের হাতেখড়ি : রূপশ্রী রায়ের সংগীতে হাতেখড়ি হয় সুনামগঞ্জ জেলার বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী ব্রজলাল দাশের কাছে। ব্রজলাল দাশের কাছেই তিনি সংগীতের প্রথম তালিম শুরু করেন এবং সারেগামাপা সহ সংগীতের প্রাথমিক ধারণা লাভ করেন তাঁর কাছ থেকেই। এরপর তিনি সুনামগঞ্জ শহরের ইমরান উস্তাদজী, সাব্বির আহমেদ সোহেল এবং মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন এই তিন জনের কাছেও গান শিখেন। উনাদের নিকট আধুনিক, নজরুল ও লোকসংগীতের তালিম গ্রহণ করেন। পরবতীতে তিনি প-িত রামকানাই উস্তাদজীর কাছে শাস্ত্রীয় সংগীতের তালিম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ভারতের কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে সেখানে তিনি গুরু অসিত মুখার্জীর নিকট হতে তালিম নেন। সেখানে তিনি পাতিয়ালা ঘরানার শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীর পাঠ নেন। এছাড়া ¯œাতক চলাকালীন তিনি কঙ্কনা মিত্রের নিকট কীর্তন আঙ্গিকের গানের তালিম নেন এবং নুপূর গাঙ্গুলীর নিকট গানের চর্চা করেন। সংগীত বিষয়ে ¯œাতক ডিগ্রি : শুরুর দিকে সংগীতের উপর পড়াশোনা না করলেও পরবর্তীতে সংগীতের উপর উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেই আকাক্সক্ষা থেকেই ২০০৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান এবং সেখানে তিনি সংগীতের উপর ¯œাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। সেখানে ভর্তির ব্যাপারে সর্বতোভাবে সহায়তা করেন পারিবারিক বন্ধু ও আত্মীয় প্রসেন রায়। তার সহযোগিতায় তিনি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। এজন্য তিনি প্রসেন রায়ের নিকট কৃতজ্ঞ। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও কৃতিত্ব লাভ : তিনি ১৯৭৭ সালে সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে আধুনিক গানের প্রতিযোগিতায় ২য় স্থান অধিকার করেন। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালের জাতীয় ”শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা”য় সিলেট বিভাগের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেন। সেই সাথে ঢাকায় আয়োজিত “বেঙ্গল বিকাশ প্রতিযোগিতা”য় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সাথে সফলতার স্বাক্ষর রেখে আসেন। ক্যাসেট যুগে অবদান : লোক সংগীতের উপর উনার একটি যৌথ অ্যালবাম বের হয়েছিল। যার নাম ‘বিয়ের গান’। তাতে লোক বিয়ের গানের উপর অ্যালবাম তৈরি করা হয়, যার শিল্পী ছিলেন তিনি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ : এছাড়া উনি ২০০০ ও ২০০৩ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং শহরে অনুষ্ঠিত মিউজিক ফেস্টিভালে আমন্ত্রিত শিল্পী হিসেবে অংশগ্রহণ করেন এবং সেখানে তিনি সংগীত পরিবেশন করেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতেন এবং জোড়াসাঁকোর বসন্ত উৎসবে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করতেন। পুরস্কার ও সম্মাননা : ২০২৩ সালে সুনামগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে সংগীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শিল্পকলা পদক প্রদান করে। পরবর্তীতে সুনামগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন লোকদল শিল্পীগোষ্ঠী তাঁকে সংগীতের উপর বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন। এছাড়া সারেগামা নামক আরও একটি সংগঠন তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করেন। সংগীত বিদ্যালয় পরিচালনা : বর্তমানে উনার একটি নিজস্ব গানের স্কুল আছে। যার নাম সোহিনী সংগীত বিদ্যালয়। সেখানে তিনি শিশুদেরকে গানের তালিম দিয়ে থাকেন। সুনামগঞ্জের ছোট ছোট বাচ্চারা তার নিকট গান শিখে থাকে। এর পাশাপাশি তিনি সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সাধারণ সংগীত বিভাগে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৯৮৭ সাল থেকে বাংলাদেশ বেতার সিলেট কেন্দ্রতে তালিকাভুক্ত শিল্পী হিসেবে সংগীত পরিবেশন করে আসছেন। নেপথ্যে অবদান যাদের : পারিবারিকভাবে তিনি সংগীত চর্চায় অনুপ্রেরণা পেয়ে আসছেন। ছোটবেলায় মা-বাবা, পরে ভাই বোনেরা এবং পরবর্তীতে ভাই-বোনের সন্তানেরাও তাঁকে অনুপ্রেরণা দিয়ে আসছেন। যাদের কারণে সংগীত নিয়ে চলার পথ তুলনামূলক সহজ হয়েছে। আরও রয়েছেন প্রসেন রায়, যার সাহায্য-সহযোগিতায় রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হয়। গান চর্চায় আদর্শ : সংগীত চর্চার ক্ষেত্রে উনার আদর্শ হলেন- আশা ভোঁসলে, ইন্দ্রানী সেন, শবনম মুস্তারী, ফিরোজা বেগম, খেয়া চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ বিখ্যাত সংগীতানুরাগীগণ। ব্যক্তিগত আগ্রহ : উনার বিশেষ দক্ষতা ও আগ্রহ হচ্ছে নজরুল সংগীতে। তিনি তা ভালোবেসে আনন্দের সাথে চর্চা করে থাকেন। গান করার পাশাপাশি তাঁর বই পড়ারও চর্চা আছে। বিশেষ করে সংগীত বিষয়ক বই তাঁকে সবসময় অধিক আকর্ষণ করে থাকে। এবং সংগীত বিষয়ক বইসমূহ অধিক পাঠ করে থাকেন। স্মরণীয় ঘটনা : যখন ক্লাস টু তে পড়ে তখন শিল্পকলা একাডেমির একটি প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করেন। এই প্রতিযোগিতায় তিনি বাসার কাউকে না জানিয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। যখন তিনি পুরস্কার পান তখন বাসার কেউই সেটা বিশ্বাস করতে চায়নি। পরে পুরস্কার দেখে বিশ্বাস করে। জীবনের প্রথম এই পুরস্কার প্রাপ্তির মজার স্মৃতি আজও তাঁর হৃদয়ে অমলিন। উত্তরসূরিদের প্রতি বার্তা এবং ইচ্ছা : নবীন তথা তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের প্রতি উনার বার্তা এই, “সবসময় সংগীত চর্চার মধ্যে থাকতে হবে। সংগীত চর্চার মাধ্যমে যে কণ্ঠ তৈরি হয় তা দীর্ঘমেয়াদী গানের সুযোগ তৈরি করে দেয়। তাই গানের ভিত্তি যদি রেওয়াজের মধ্যে তৈরি করা যায়, তাহলে গান শেখা এবং গান চর্চা করাটা তোমাদের জন্য সহজ হবে। তাই তোমরা যারা সংগীতকে লালন করো তোমাদের প্রতি আমার অনুরোধ- তোমরা নিয়ম করে দৈনিক অন্তত এক ঘণ্টা করে হলেও রেওয়াজ করবে।” সংগীত নিয়ে উনার অনুভূতি হলো- “সংগীত হলো আনন্দের বিষয়, এটি আমাদেরকে আনন্দ দিয়ে থাকে এবং আমাদেরকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে থাকে।“ তিনি সারাজীবন সংগীত নিয়ে কাজ করে গেছেন এবং বাকি জীবনও তিনি সংগীতকে সাথে নিয়েই অতিবাহিত করতে চান। তিনি চান যেন উনার গানের স্কুল যেন সবসময় টিকে থাকে এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যেন সংগীত চর্চার মাধ্যমেই কাটিয়ে দিতে পারেন। আর এভাবেই সুনামগঞ্জের সংগীত ক্ষেত্রকে আরও সমৃদ্ধ করতে চান।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স