স্টাফ রিপোর্টার::
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় প্রতিবছরের আগাম বন্যা ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার দীর্ঘদিনের সংকট মোকাবিলায় বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। হাওরাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সক্ষমতা বাড়িয়ে কৃষকের ধান রক্ষায় সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার ১৩টি নদী ড্রেজিংয়ের মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
‘হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানিস¤পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (১ম পর্যায়)’ শীর্ষক এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। এর মাধ্যমে প্রায় এক লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমিকে আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে সুরক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় সুরমা, বৌলাই, ধনু, ঘোড়াউত্রা, আপার মেঘনা, পুরাতন সুরমা, দাড়াইন, চামতি, সোমেশ্বরী, কাউনাই, বৌলাই-পাটলাই, গাং ও আবুয়া নদী খনন করা হবে। এর মধ্যে ৮টি নদী সুনামগঞ্জে এবং ৫টি কিশোরগঞ্জ জেলায় অবস্থিত। বর্তমান পর্যায়ে অগ্রাধিকারভিত্তিতে তিনটি রিভার সিস্টেমে ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এগুলো হলো- সুরমা-বৌলাই-আপার মেঘনা রিভার সিস্টেম, পুরাতন সুরমা রিভার সিস্টেম এবং আবুয়া-পাটলাই-কাউনাই রিভার সিস্টেম।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-২) মো. ইমদাদুল হক জানান, হাওরাঞ্চলের নদীগুলো দীর্ঘদিন ধরে পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে ভারতের মেঘালয় ও আসাম থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নামতে পারে না। এতে আকস্মিক বন্যার সময় হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি আরও বলেন, ১৩টি নদী ড্রেজিং করা হলে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ তৈরি হবে। এতে আগাম বন্যা থেকে কৃষকের ধান রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং হাওরে বীজতলা প্রস্তুত ও রোপণের সময়ও বাড়বে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানাযায়, সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে সভা করে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রকল্পটি নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। প্রস্তাবিত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন মেয়াদে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের আওতায় সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলার ১৬ উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালিত হবে। পিইসি সভায় প্রকল্পের বেশকিছু বিষয়ে সাময়িকভাবে প্রশ্ন তোলা হয়। তবে সেসব খাতে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যয়ের কারণ উল্লেখ করে বাপাউবো।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, প্রকল্পের আওতায় ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং বাবদ খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ২৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পিইসি সভায় প্রকল্পে ১২টি মোটরসাইকেল বাবদ ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকার সংস্থান রাখার যৌক্তিক কারণ জানতে চাওয়া হয়। এসময় বাপাউবোর প্রতিনিধি বলেন, তিন জেলায় প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ১২টি মোটরসাইকেলের সংস্থান রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সভায় সবাই ঐকমত্য হন। প্রস্তাবিত প্রকল্পে একটি অনাবাসিক ভবন (পরিদর্শন বাংলো নির্মাণ) বাবদ ২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ৫টি অনাবাসিক ভবন মেরামত বাবদ ৮০ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।
এর প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাপাউবোর প্রতিনিধি বলেন, ৫টি অনাবাসিক ভবন মেরামতের সংস্থান বাদ দিয়ে একটি অনাবাসিক ভবন (পরিদর্শন বাংলো) নির্মাণের সংস্থান রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সবাই একমত হন। প্রকল্পের আওতায় এক হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৫ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিক করতে এর আগে গঠিত কমিটি সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা পরিদর্শন করেছে। জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ আউটলেট ও খাল চিহ্নিত করে সেগুলো ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মেঘালয় অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে প্রতিবছর পাহাড়ি ঢল দ্রুত হাওরে নেমে আসে। নদীগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নামতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাওরের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত হবে এবং প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে। যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
জানা গেছে, সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িতব্য এ প্রকল্পের কাজ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণার ১৬ উপজেলায় এ প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
হাওরের ফসলরক্ষায় খনন হবে ১৩ নদী
- আপলোড সময় : ১৮-০৫-২০২৬ ০৮:২৬:৫০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৮-০৫-২০২৬ ০৮:২৯:২৫ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ