সুনামগঞ্জ , শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬ , ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না : মির্জা ফখরুল শিশুর হাতে স্মার্টফোন : আশীর্বাদ না অভিশাপ? হাওরের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের দাবি টাঙ্গুয়ার হাওরে উজাড় হচ্ছে হিজল-করচ বাগ সাম্রাজ্যবাদী ও দেশবিরোধী সব চুক্তি বাতিলের দাবি “সমন্বয়কদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন হান্নান মাসউদ” গুপ্ত ছিলাম, বাইরে যাইনি, ভবিষ্যতেও পালাবো না : জামায়াত আমির প্রাথমিক শিক্ষা পদক ২০২৬ জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ হলেন যাঁরা বিদ্যুতের দাম বাড়লো দুই বছরে নিঃস্ব হয়ে ফিরেছেন ২১৫ জন তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১৪৮৭ কোটি টাকা মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ গণমাধ্যম, পুলিশ ও প্রবাসীদের উদ্যোগে অসহায় সাজু মিয়ার মুখে হাসি হাওরপাড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস যাত্রী ওঠানো নিয়ে সংঘর্ষে আহত ১২, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাঙচুর ১০টি পৌরসভার পানি সরবরাহ লাইনে ত্রুটি, দুর্ভোগে ৬ শতাধিক গ্রাহক স্থানীয় সরকার নির্বাচন : আগস্টের শেষে তফসিল, অক্টোবরে ভোটের চিন্তা হাওরে কৃষকের নিরানন্দ ঈদ তোফায়েল আহমেদ আর নেই আমার রাজনীতির মূল লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করা : এমপি কামরুল

তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য : সংকট ও সম্ভাবনা

  • আপলোড সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ০৮:৩৭:০০ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ০৮:৩৭:৩১ পূর্বাহ্ন
তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য : সংকট ও সম্ভাবনা
ড. প্রণব কুমার পান্ডে::>
একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য একটি অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রতি আটজন মানুষের মধ্যে একজন কোনও না কোনও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এই সংকটের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম - যারা আগামীর পৃথিবী গড়বে বলে আমরা স্বপ্ন দেখি। উন্নত দেশগুলো এই সত্য অনেক আগেই উপলব্ধি করে মানসিক স্বাস্থ্যকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছে। স্কুলে কাউন্সেলর নিয়োগ হচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ছুটি দেওয়া হচ্ছে, সরকারি বাজেটে আলাদা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশ? আমরা এখনও এই সংকটকে সমস্যা হিসেবেই স্বীকার করতে শিখিনি। বাংলাদেশে তরুণ জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি। এই বিশাল তরুণ শক্তিকে ঘিরেই দেশের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন বোনা হয়। অথচ এই তরুণদের মানসিক অবস্থার দিকে আমরা কতটুকু মনোযোগ দিচ্ছি? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ বলছে- বাংলাদেশে প্রায় ১৬ শতাংশ মানুষ কোনও না কোনও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত, আর তরুণদের মধ্যে এই হার আরও বেশি। কিন্তু চিকিৎসা নিচ্ছেন মাত্র এক শতাংশেরও কম। বাকিরা নীরবে কষ্ট বহন করে যাচ্ছে- কারণ সাহায্য চাওয়ার সুযোগ নেই, সাহস নেই, আর সমাজের ভয়ে পথ বন্ধ। আজকের বাংলাদেশের তরুণরা এমন একটি বাস্তবতায় বেড়ে উঠছে, যেখানে চাপ এসেছে একসঙ্গে নানা দিক থেকে। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু হয় এই যাত্রা- জিপিএ-৫ না পেলে মনে হয় জীবন শেষ, পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার। পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করার এই সংস্কৃতি তরুণদের মনে এক গভীর হীনম্মন্যতার বীজ বপন করে দেয়। শৈশব থেকেই শেখানো হয় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে, কিন্তু হেরে গেলে কীভাবে সামলাতে হয় - সেটা কেউ শেখায় না। পড়াশোনা শেষ হলেই শুরু হয় চাকরির লড়াই। লক্ষাধিক ¯œাতক প্রতিবছর চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন, অথচ সুযোগ সীমিত। এই হতাশা, এই অনিশ্চয়তা দিনের পর দিন একজন তরুণকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। পরিবারের প্রত্যাশার ভার যখন এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে মিলে যায়, তখন অনেকে নিজেকে সম্পূর্ণ একা মনে করে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ডিজিটাল যুগের নতুন সংকট। সামাজিক মাধ্যমে সবার জীবন ঝলমলে, সবাই সুখী, সবাই সফল - এই কৃত্রিম চিত্রের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করতে গিয়ে তরুণরা নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করে। একাকিত্ব বাড়ছে, আত্মসম্মান কমছে, ঘুম নষ্ট হচ্ছে - কিন্তু কারোর সঙ্গে বলার উপায় নেই। গ্রাম থেকে শহরে আসা তরুণদের অবস্থা আরও কঠিন। শিকড় থেকে উপড়ে এসে অপরিচিত পরিবেশে একা লড়াই করতে গিয়ে এই বিচ্ছিন্নতা তাদের ভেতরটাকে ফাঁকা করে দেয়। সমস্যার চেয়েও বড় বাধা হলো- মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত কলঙ্কবোধ। কেউ যদি বলে ‘আমি মানসিক চিকিৎসকের কাছে যাই’, তাহলে আশপাশের মানুষ তাকে ‘পাগল’ ভাবতে শুরু করে। বিয়ের বাজারে মূল্য কমে যাবে, চাকরি পাওয়া কঠিন হবে, পরিবার লজ্জায় পড়বে - এই ভয়ে মানুষ মুখ খুলতে পারে না। আমাদের পরিচিত বাক্যগুলো শুনুন: ‘মন শক্ত করো’, ‘এত ভাবলে কি হয়’, ‘আমরা কি কম কষ্ট করেছি?’ - এই কথাগুলো বলা হয় ভালোবেসে, কিন্তু এগুলো আসলে কষ্টপ্রাপ্ত মানুষটিকে আরও একা করে দেয়। ‘তুমি আসলে কেমন আছো’ - এই সহজ প্রশ্নটি কেউ করে না। ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিও অনেক সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আধ্যাত্মিকতা নিঃসন্দেহে মানসিক শান্তির একটি উৎস, কিন্তু ক্লিনিকাল ডিপ্রেশন বা অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার কেবল ইবাদতে সারে না - এর জন্য পেশাদার চিকিৎসাও প্রয়োজন। দুটো একসঙ্গে চলতে পারে, একটি অপরটির বিকল্প নয়। শুধু সামাজিক কলঙ্ক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিকাঠামোর অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। সারা দেশে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র কয়েকশত - প্রতি একলাখ মানুষের জন্য একজনেরও কম। সরকারি হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রায় অনুপস্থিত, বেসরকারি থেরাপিস্টের ফি সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, আর গ্রামাঞ্চলে এই সেবা কার্যত নেই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা আরও হতাশাজনক। হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে কাউন্সেলর আছেন মাত্র হাতেগোনা কয়েকজন - অনেক প্রতিষ্ঠানে একজনও নেই। একজন শিক্ষার্থী যখন সত্যিকারের সংকটে পড়ে, তখন সে কার দরজায় যাবে? এই প্রশ্নের কোনও সন্তোষজনক উত্তর আজও আমাদের কাছে নেই - এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার প্রমাণ। এই সংকট মোকাবিলায় কেবল সচেতনতামূলক পোস্ট বা সেমিনার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক - দুই ধরনের পরিবর্তন। পরিবারের ভূমিকা সবার আগে। সন্তান কত নম্বর পেলো তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত - সে মানসিকভাবে ভালো আছে কিনা। মা-বাবাকে শিখতে হবে কীভাবে বিচার না করে, রায় না দিয়ে সন্তানের কথা শুনতে হয়। পরিবারের উষ্ণতাই একজন তরুণের সবচেয়ে বড় মানসিক ঢাল। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নিতে হবে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্কুল পর্যায় থেকেই মানসিক স্বাস্থ্য সাক্ষরতা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই নিজের অনুভূতি চিনতে ও প্রকাশ করতে শেখে। সরকারকে বিনিয়োগ করতে হবে। জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যন্ত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে এবং সাশ্রয়ী মূল্যে বা বিনামূল্যে থেরাপি নিশ্চিত করতে হবে। গণমাধ্যম ও সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। ‘কান পেতে রই’ বা ‘মনের বন্ধু’র মতো উদ্যোগগুলোকে সমর্থন ও বিস্তার ঘটাতে হবে। টেলিভিশন নাটক, চলচ্চিত্র কিংবা সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবশালী কণ্ঠস্বরগুলো যদি মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরে, তাহলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে অনেক সহায়তা হবে। মানসিক অসুস্থতা শরীরের অসুস্থতার মতোই বাস্তব এবং চিকিৎসাযোগ্য। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের জন্য যেমন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া স্বাভাবিক, বিষণœতা বা উদ্বেগের জন্য থেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়াও ঠিক তেমনই স্বাভাবিক হওয়া উচিত। এই বোধটুকু যতদিন আমাদের সমাজে না আসবে, ততদিন হাজারো তরুণ নীরবে ভাঙতে থাকবে। একটি দেশের সত্যিকারের অগ্রগতি পরিমাপ হয় তার মানুষের শারীরিক সুস্বাস্থ্য দিয়ে যেমন, তেমনই মানসিক সুস্বাস্থ্য দিয়েও। বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম অনেক স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে আগে বাঁচাতে হবে তাদের ভেতরের মানুষটিকে। সাহায্য চাওয়া দুর্বলতা নয় - এটি সাহসিকতা। আর সেই সাহসকে স্বাগত জানানোর দায়িত্ব আমাদের সবার। [লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক-প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স