মো.শাহজাহান মিয়া::
বৈশাখ পেরিয়ে জ্যৈষ্ঠ মাস চলছে। কিন্তু সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের কৃষকের ঘরে এখনো স্বস্তি ফেরেনি। বৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় মাঠের সোনালী ধান অনেক আগেই কালো পচনে হারিয়েছে রঙ। তবুও বেঁচে থাকার লড়াই থেমে নেই। কোমরপানি আর কাদামাটির ভেতর নেমে কৃষক-কৃষাণীরা এখনো সংগ্রহ করছেন পচা ধান। খোরাকির আশায় নৌকা বোঝাই করে সেই ধান এনে শুকাতে দিচ্ছেন গ্রামের পাকা সড়কে। রোদ-বৃষ্টির সঙ্গে যুদ্ধ করে যতটুকু ধান পাওয়া যায়, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে তাদের।
শনিবার (১৬ মে) সরেজমিনে জগন্নাথপুর উপজেলা উপজেলার রাণীগঞ্জ ইউনিয়নের গন্ধর্বপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামের পাকা সড়কের দুই পাশে সারি সারি করে শুকাতে দেওয়া হয়েছে পচা ধান। কোথাও ধানের চেয়ে খড় বেশি, কোথাও আবার ধানের সঙ্গে গজিয়ে ওঠা চারা। আকাশে রোদ নেই পুরোপুরি, মাঝেমধ্যে বৃষ্টিও ঝরছে। তবুও কৃষকদের ব্যস্ততা থেমে নেই। কেউ ধান নাড়ছেন, কেউ পচা খড় আলাদা করছেন, কেউ আবার নৌকা থেকে নতুন করে ধান নামাচ্ছেন। স্থানীয় কৃষকেরা জানান, বৈশাখের মাঝামাঝি সময়ে টানা অতিভারি বৃষ্টিতে উপজেলার নলুয়ার হাওরসহ বিভিন্ন হাওরের পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান তলিয়ে যায়। টানা বৃষ্টির কারণে হারভেস্টার মেশিন মাঠে নামেনি। অন্য বছরের মতো এবারও কৃষকেরা যন্ত্রনির্ভর ছিলেন। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যাপ্ত ধান কাটার শ্রমিকও আনা হয়নি। এতে একদিকে শ্রমিক সংকট, অন্যদিকে বৃষ্টির পানি - দুই সংকটে পড়ে যান কৃষকেরা। স্থানীয় শ্রমিক মিললেও দৈনিক এক হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি গুনতে হয়েছে। অনেক কৃষক নিজেরাই কোমর ও পেটসমান পানিতে নেমে ধান কেটেছেন। কৃষাণীরাও নৌকা নিয়ে হাওরে গিয়ে ধান কেটে বাড়িতে এনেছেন। কিন্তু সেই ধানও রক্ষা করা যায়নি। রোদ না থাকায় মাড়াই করা ধান, মুটি বাঁধা ধান কিংবা কাটা ধান শুকানো সম্ভব হয়নি। ফলে অধিকাংশ ধানেই চারা গজিয়ে যায়, অনেক ধান পচে নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে। কৃষকেরা জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন তারা। পরে বৈশাখের শেষদিকে কিছুটা রোদ উঠলেও তখন দেখা যায় সংগ্রহ করা ধানের বড় অংশই নষ্ট হয়ে গেছে। এরপরও জমিতে পড়ে থাকা ডুবে যাওয়া ধান তুলে আনার চেষ্টা শুরু হয়। কিন্তু ততক্ষণে ধানের গোড়ায় পচন ধরে যায়। এখন সেই পচা ধানই “আকি” দিয়ে তুলে নৌকায় করে বাড়িতে আনছেন তারা। গন্ধর্বপুর গ্রামের কৃষক ছইফুল উদ্দিন জানান, এ বছর তিনি ১০ কেদার জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে ৮ কেদারের ধান কেটে তুলতে পারলেও বাকি ২ কেদারের ধান পানিতে ডুবে যায়। তিনি বলেন, “এখন সেই ধান নৌকা দিয়ে তুলে এনে শুকাচ্ছি। যতটুকু পাওয়া যায়, এতেই আমরা খুশি।” একই গ্রামের আছলম আলী, এনামুল হকসহ আরও অনেক কৃষক জানান, এখনো তারা পচা ধান সংগ্রহে যুদ্ধ করছেন। অনেকের ঘরে এখনো খোরাকির ধান ওঠেনি। তাই নষ্ট ধান থেকেই কিছু চাল পাওয়ার আশায় শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। এদিকে কৃষকের এই দুর্দশার মধ্যেও বাজারে ধানের দাম নিয়ে দেখা দিয়েছে নতুন হতাশা। বর্তমানে শুকনো ভালো ধানও প্রতিমণ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৮শ থেকে ৯শ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না কৃষকদের। ফলে সরকারি খাদ্যগুদামে ১ হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রির জন্য কৃষকেরা ভিড় করছেন। কিন্তু লটারির মাধ্যমে ধান ক্রয় করায় অধিকাংশ কৃষক সরকারি এই সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। হাওর বাঁচাও আন্দোলন জগন্নাথপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি ও চিলাউড়া-হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, এবার বাঁধ ভেঙে ফসলহানি হয়নি। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে হাওরের অনেক ধান তলিয়ে গেছে। এতে কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ জানান, এ বছর জগন্নাথপুরে ২০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল। জলাবদ্ধতায় কিছু অংশের ধান নষ্ট হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তিনি বলেন, “ধান ডুবে যাওয়া ও চারা গজানোর কারণে প্রায় ১ হাজার ২১১ একর জমির ধান নষ্ট হয়েছে। এতে প্রায় ১৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।” তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। তাদের ভাষায়, “হাওরে শুধু ধান নয়, ডুবে গেছে মানুষের বছরের স্বপ্ন, সংসারের ভরসা আর বেঁচে থাকার সাহস।”
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
খোরাকির আশায় পচা ধান কুড়াচ্ছেন হাওরের কৃষক
- আপলোড সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ০৮:২২:৪৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ০৮:২৩:৪৯ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ