বিশ্বজিত রায়::
অতিবৃষ্টির পর কয়েকদিন টানা রোদের মাঝে বুধবার বিকাল পর্যন্ত আবার বৃষ্টি হয়েছে। গেল ক’দিন রোদ দেওয়ায় ডুবে যাওয়া ধান কাটতে হাওরের জলমগ্ন অংশে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে মানুষ। বুকসমান পানিতে কাটা অর্ধপচা ধানে কৃষক কিছুটা স্বস্তি পেলেও গতকালের বৃষ্টি কৃষকদের আবার অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছে।
দীর্ঘসময় পানির নিচের পাকা ধান পচে এমনিতেই দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে। তারপরও ফসলের মায়া ও খোরাকের টানে সে ধান কেটে তীরে তুলতে ব্যতিব্যস্ত কৃষক। কেউ নিজেরাই নিজেদের ধান কাটছেন। আবার অনেক জায়গায় জমির মালিককে না বলে ধান কেটে নেওয়ার অভিযোগও আছে। সারাদিন পানিতে থেকে হাড়খাটুনি পরিশ্রমে কেটে আনা ধান নষ্ট হওয়ায় কৃষক তেমন লাভবান হবে না বলছেন সচেতন মানুষেরা।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বুধবার সকাল পর্যন্ত জেলায় ১০৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হলেও নদীর পানি হ্রাস পেয়েছে ১০ সেন্টিমিটার। পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ৭২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কয়েক দিন অতি ভারি বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে পাউবো। সরেজমিনে দৃশ্যমান পচা ধানের স্তূপ : জামালগঞ্জের কালীপুর গ্রাম থেকে হালি হাওরমুখী প্রায় দুই কিলোমিটার জাঙ্গালের পুরোটাই পচা ধানের স্তূপে সয়লাব। শতাধিক নৌকা ভিড়িয়ে কালীপুর, লম্বাবাঁক, সদরকান্দি, কামিনীপুর, মমিনপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের মানুষ পানিতে কাটা ধান টেনে তুলছেন দুধারকান্দা জাঙ্গালে। ওই ধানের পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে হাওর এলাকায়। মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, জামালগঞ্জের হালি হাওরের দুধারকান্দা, গুলডুবি, পাট্টিয়াজুরা অংশে অন্তত হাজার হেক্টরের বেশি জমি পানিতে তলিয়েছে। নৌকায় করে গিয়ে ধান কাটছেন অনেকে। কর্তনকৃত ধান কেউ নৌকায়, কেউ পলিথিনের বিশেষ ভেলায় টেনে পারে ভেড়াচ্ছেন।
ছেলেকে সাথে নিয়ে কেটে আনা ধান দুধারকান্দা জাঙ্গালে ঢেকে রাখার কাজ করছিলেন কালীপুর গ্রামের কৃষক আলী আমজদ। কতটুকু জমি করেছেন, নষ্ট হয়েছে কি-না, এমন উত্তরে তিনি বলেন, বত্রিশ কিয়ার করছালাম। লাগাইতে খরচ হইছে প্রায় দুই লাখ টাকা। কাটাইতে পারছি এক হালের (১২ কিয়ার) মতো। বাকি ধান পানির তলে নষ্ট হইছে। নষ্ট ধানই কাটতাছি। কোন লাভ হইতো না।
একই গ্রামের কৃষক সাইফুর রহমানের পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৭ জন। একফসলী বোরো ধানই তাঁর জীবিকা নির্বাহের প্রধান হাতিয়ার। নিজের জমি নেই, অন্যের জমি বর্গা করেছেন তিনি। জমির মালিককে কিয়ার প্রতি ছয় হাজার টাকা নগদ দিয়ে আবাদ করা দশ কিয়ার জমির সবটুকুই তলিয়েছে। তিন-চার কিয়ার নিজেরা কেটে কোনরকম জাঙ্গালে তুলতে পেরেছেন উল্লেখ করে সাইফুর রহমান বলেন, এই জমি করতে প্রায় লাখখানেক টাকা খর্চ হইছে। কিন্তু কাটতে পারছি না। যতটুক কাটছি এইখানেই। খানি-খোরাকের বোঝ এখনও বাড়ি নিতে পারছি না।
নয়নভাগায় নষ্ট ধান কর্তন: সুনামগঞ্জের সোনামড়ল, হালি, শনি, করচা, বরাম, উদগল, পাগনা, মহালিয়া, দেখা ও ছায়ার হাওরসহ ছোট-বড় বেশ কয়েকটি হাওরে পানিতে নেমে নষ্ট ও আধানষ্ট ধান কাটছেন কৃষক ও অকৃষিজীবী মানুষেরা। অনেকে শ্রমিক না পেয়ে ছেলেপুলে নিয়ে নিজের জমি নিজেরাই কাটতে নেমেছেন। আবার চোখের সামনে অন্যরা কেটে নিতে দেখছেন তলিয়ে যাওয়া জমির মালিকেরা।
নৌকা থেকে নেমে হালি হাওরের থৈ থৈ পানিতে ধান কাটছিলেন মো. মজনু মিয়া। জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের লম্বাবাঁক গ্রামের ওই কৃষক বলেন, আমি দশ কিয়ারের মতো লাগাইছি। গুলডুবির পারে ছয় কিয়ার তলাইন্যা আছে। এক কিয়ার ক্ষেত লাগাইতে পাঁচ হাজার ট্যাকা খর্চ। চাইর হাজার ট্যাকা কিয়ার কাডানি লাগছে। যারা কাটছে হ্যারা মরছে। যারা না কাটছে হ্যারা বরং ভালা আছে। যতটুকু কেটেছেন সে জমি আপনার কি-না, এমন প্রশ্নে মজনু বলেন, এইডার মধ্যে নয় কিয়ার ক্ষেত আছে, তলে গেছেগা। কাটছি দুই-তিন কিয়ার হইব। চুক (মালিককে নির্ধারিত পরিমাণ বুঝিয়ে দেওয়া) রাখছালাম। সব বাদ দিয়া যা পাইমু তাই বাঁচার সম্বল।
কিশোর বয়সী ছেলেকে নিয়ে কাটা ধান ভারি পলিথিনে জাগ করে টেনে আনছিলেন একই এলাকার সদরকান্দি গ্রামের রব মিয়া। তিনি বলেন, পোন্ড (১৫) কিয়ার করছালাম, তল গেছেগা (তলিয়ে গেছে)। সব জমি নিচা হওয়ায় কিচ্ছু পাইছি না। অখন আরেকজনের তলাইন্যা জমি কাইট্যা নিতাছি। এইখানে এক কিয়ার জমিনের ধান। দেখি জানডা বাঁচান যায় কিনা।
৭০ হাজার হেক্টর বোরো জমির ক্ষতি: সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতায় তলিয়েছে অন্তত ৭০ হাজার হেক্টর বোরো জমি। জেলার দেড় লক্ষাধিক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাওর সচেতনমহল এমন দাবি করলেও কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী প্রাথমিক আক্রান্ত জমির পরিমাণ মাত্র ২০ হাজার ৫৫০ হেক্টর। চূড়ান্ত ক্ষতি কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা এখনও করতে পারেনি বলে জানিয়েছে কৃষি অধিদপ্তর।
কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার বোরো মৌসুমে ছোট-বড় ১৯৩টি হাওরে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমি আবাদ হয়েছে। মঙ্গলবার পর্যন্ত হাওরে ৮৫ দশমিক ৩৭৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে কর্তনের হার ৮৯ দশমিক ২২ শতাংশ এবং নন হাওরে ৭৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত ১ লাখ ৯০ হাজার ৮১৯ হেক্টর জমির ধান কেটেছেন কৃষক।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, আমাদের হিসাবে অতিবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের হাওরে প্রায় ৭০ হাজার হেক্টর জমির ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে দেড় থেকে দুই লাখ কৃষক। ডুবে যাওয়া জমি থেকে যে ধান কাটা হচ্ছে তাতে কৃষক তেমন লাভবান হবে না। পানিতে থেকে ধানের গুণগত মান এমনিতেই নষ্ট হয়ে গেছে। কৃষক হয়তো ধানের মায়ায় পানিতে নামছে। এ ধান কৃষক বিক্রিও করতে পারবে না, খেতেও পারবে না।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, জলাবদ্ধতায় ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনও জানা যায়নি। কতজন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার তালিকাও প্রস্তুত হয়নি। এ কার্যক্রম চলমান আছে। ধান পাকলে তা দ্রুত কেটে ফেলার নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, কে কোথায় কার তলিয়ে যাওয়া ধান কাটছে সে সম্পর্কে তেমন কিছু জানি না। তবে দিরাই উপজেলার বরাম হাওরে ধান কাটার বিষয়টা শুনেছি। এ ব্যাপারে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিতে পারবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
পরিবারের ব্যয় ও খোরাক বাঁচানোর যুদ্ধ
দুর্গন্ধময় হাওর : পানিতে পচা ধানই কাটছেন কৃষক
- আপলোড সময় : ১৪-০৫-২০২৬ ০৮:৪৪:৪৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৪-০৫-২০২৬ ০৮:৪৯:৩৪ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ