বিশেষ প্রতিনিধি::
সুনামগঞ্জের সরকারি সার বিএডিসি’র কতিপয় (বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন) ডিলারের সঙ্গে আঁতাত করে কালোবাজারে বিক্রি করে দিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। এমন খবর পেয়ে রবিবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিসার (এসিল্যান্ড) আদিত্য পাল গুদামে অভিযান চালিয়ে ১২৬ বস্তা সার বেশি পেয়েছেন। এছাড়াও নিয়ম বহির্ভূতভাবে সরকারকে না জানিয়ে ডিলারের সার মজুদ রাখার প্রমাণও পেয়েছে অভিযানকারীরা। এসময় গুদাম রক্ষক ও লেবার সরদার বিভিন্ন দুর্নীতিবাজ ডিলারের কথা বলে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন। তবে গুদামে বিধি বহির্ভূত সংরক্ষণ করা ২০০ বস্তা সার গতকাল ডিলারের কথা বলে নিয়ে গেলেও এবার সংরক্ষিত ১২৬ বস্তা সারও নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকার বস্তাপ্রতি ৫ হাজার টাকা ভর্তুকি দিয়ে কৃষকের জন্য সার আমদানি করে। সরকার মাত্র ১ হাজার টাকা বস্তায় কৃষকদের সার সরবরাহ করে। এই সুযোগে সুনামগঞ্জের একটি ডিলার সিন্ডিকেট আশুগঞ্জ সার কারখানার সুবিধাভোগী বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ডিলারের নামের এই সার উত্তোলন করে কৃষি বিভাগকে ম্যানেজ করে আবারও ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থান থেকে আশুগঞ্জে পাঠিয়ে দেয়। একই সার আবারও কারখানায় ঢুকার পর আশুগঞ্জ সার কারখানার সংশ্লিষ্টরা আবারও সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকিমূল্য নিয়ে থাকে। সুনামগঞ্জে এই কাজে সহযোগিতা করেন গুদাম রক্ষক, লেবার সরদার ও কৃষি বিভাগের অসাধু লোকজন। জানা গেছে কৃষি কর্মকর্তাদের সরেজমিন গিয়ে সার বুঝে পাওয়ার কথা থাকলেও তারা ডিলারের সঙ্গে আতাত করে ঘটনাস্থলে সার গ্রহণ না করেই প্রতিবেদন জমা দেন। খোঁজ নিয়ে আরো জানা গেছে, এই পাচারের কাজে ডিলারের হয়ে নেতৃত্ব দেন জামালগঞ্জের ডিলার আবুল কালামসহ একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। গত রবিবার গুদামে বিধি বহির্ভূত সংরক্ষণের যে পরিসংখ্যান পেয়েছে তখন বাঁচার জন্য গুদাম রক্ষক ও লেবার সরদার মজুদকৃত সার ডিলার আবুল কালামের বলে জানান। বিধি অনুযায়ী বরাদ্দের দিন বা বরাদ্দের পরদিনই গুদাম থেকে সার নিয়ে যাওয়ার কঠোর নিয়ম রয়েছে। অভিযোগ আছে ডিলারের সঙ্গে আতাত করে গুদাম রক্ষক ও লেবার সরদার অনেক ডিলারের বরাদ্দকৃত সার নিজেরাই কিনে নেন। পরে এগুলো পাচার করেন আশুগঞ্জে। সুনামগঞ্জ আব্দুজ জহুর সেতু পার করে দিলেই প্রতি ট্রাক প্রতি ওই সিন্ডিকেট ১ লক্ষ টাকা পায়। এই ট্রাক পাচারে মল্লিকপুরের একজন ট্রাক শ্রমিক নেতাও জড়িত বলে জানা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মওসুমে এভাবে সরকারে ভর্তুকির টাকা লুটেপুটে নেওয়ার সামান্য নিদর্শন পাওয়া যায় গত রবিবার বিধিবহির্ভূত সংরক্ষণের ঘটনায়। নিজেদের বাঁচাতে গুদাম রক্ষক, লেবার সরদার দুর্নীতিবাজ ডিলারের আশ্রয় নেন বলে জানান তারা। এসময় তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদিত্য পালকে জানান, এই সারের মালিক জামালগঞ্জে ডিলার আবুল কালাম আর দোয়ারাবাজারের ডিলার আব্দুল করিম। তবে বিধি বহির্ভূতভাবে গুদামে সার পড়ে থাকায় তাদের তিরস্কার করে বিএডিসির এডিডিকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে এসব বিষয় লিখিতভাবে জানানোর জন্য নির্দেশনা দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা ভূমি কর্মকর্তা।
এদিকে গুদামে অবৈধ মজুদের প্রমাণ পাওয়ার পর তা জায়েজ করতে জামালগঞ্জের ডিলার আবুল কালাম এই সারের মালিক এবং বৃষ্টির জন্য নিতে পারেনি বলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে অবগত করা হয় এবং ডিলারের সঙ্গে কথা বলিয়ে দেয়। একইসঙ্গে কালাম বিভিন্ন ডিলারকে হুমকি দেয় গুদামের সার তাদের এবং তারা কালামকে দায়িত্ব দিয়েছে বলে অফিসকে জানানোর জন্য। তবে এর আগেই উপজেলা কৃষি অফিসের এরাইভাল রিপোর্টে দেখা গেছে কৃষি বিভাগ সার উত্তোলন ও বিতরণ করে ফেলেছে।
এদিকে সোমবার সকালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এই বিষয়টি অবগত করতে উপসহকারী পরিচালক আনোয়ার হোসেন মজুদকৃত সারের বিষয়ে খোঁজ নিতে জামালগঞ্জের একাধিক ডিলারকে ডাকলে তারা জানান, এই সার তাদের নয়। তাছাড়া তিনি নিজেও উপজেলা কৃষি অফিস থেকে এরাইভাল রিপোর্ট নিয়েছেন। এবং সেখানে ডিলাররা সার উত্তোলন করে নিয়েছেন ও বিতরণ হয়েছে মর্মে প্রতিবেদনও দিয়েছে কৃষি অফিস।
অভিযুক্ত ডিলার আবুল কালাম বলেন, এই সার আমার। অন্য মজুদকৃত সারও আমি অন্য ডিলারদের কাছ থেকে নিয়েছি। বৃষ্টির জন্য আনতে পারিনি। মাত্র ৮ বস্তার সার আপনার বাকিগুলো কিভাবে আপনার হয় এবং কিভাবে গত মাসের বরাদ্দ গুদামে আইন বহির্ভূত মজুদ রাখেন সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি। আশগুঞ্জে তার নামে সার পাচারের মামলা রুজু হয়েছে কি-না সে বিষয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি নিরুত্তর থাকেন।
এদিকে দোয়ারাবাজারের অভিযুক্ত ডিলার আব্দুল করিম বলেন, বৃষ্টিতে আমাদের রাস্তা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তাই গুদাম রক্ষককে বলে রেখে এসেছিলাম। এ বিষয়ে দোয়ারাবাজার কৃষি কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম শান বলেন, এই সার করিমের। তিনি আমাদেরকে জানিয়েছিলেন। তবে তিনি এরাইভাল রিপোর্ট দিয়েছেন কি না সে বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর দেননি।
অভিযুক্ত গুদাম রক্ষক নিয়ামুল হাসান উজ্জ্বল বলেন, দোয়ারাবাজার ও জামালগঞ্জের ডিলাররা গত মাসের বরাদ্দ উত্তোলন করেননি। আমি বারবার তাদেরকে বলার পরও তারা গাড়ি পাঠায়নি। রয়ে যায় তাই গত রবিবার বের করার সময় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চলে আসেন। আমি কোনও অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নই। সুনামগঞ্জ সার গোডাউনের এডিডি আনোয়ার হোসেন বলেন, ২শ বস্তা সার বলা হয়েছে দোয়ারাবাজারের ডিলার করিমের। কিন্তু একদিনের বেশি গুদামে রাখার আইন নেই। তাছাড়া জামালগঞ্জের ডিলারের সারও নেওয়া হয়নি বলা হলেও কৃষি বিভাগের এরাইভাল রিপোর্টেও সার উত্তোলন ও বিতরণ দেখানো হয়ে গেছে আগেই।
এসব অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রতিবেদন দেবার জন্য এসিল্যান্ড মহোদয় আমাকে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আমি তা ঊর্ধ্বতনন কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য প্রতিবেদন তৈরি করছি।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও এসিল্যান্ড আদিত্য পাল বলেন, গুদামে বিধি বহির্ভূত যে সারের মজুদ পাওয়া গেছে তা নানা কারণে ডিলাররা নিতে পারেননি বলে গুদাম রক্ষক আমাদের জানান। এটার কোনও নিয়ম নেই। তারপরও আমি এডিডিকে এ বিষয়ে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য বলেছি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
অভিযানে পাওয়া গেল নিয়ম বহির্ভূত মজুদ
পাচার হচ্ছে সরকারের ভর্তুকির সার
- আপলোড সময় : ১২-০৫-২০২৬ ০৯:১০:১৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১২-০৫-২০২৬ ০৯:১৬:৩২ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি