শহীদনূর আহমেদ::
অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হলেও প্রকৃত চিত্র নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র বিতর্ক। কৃষকদের অভিযোগ- মাঠের বাস্তবতা উপেক্ষা করে কাগজে-কলমে ধান কাটার হিসাব দেখাচ্ছে কৃষি বিভাগ, যাতে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র আড়াল হচ্ছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেলায় আবাদকৃত ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমির মধ্যে গড়ে ৭২.৫৩ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ৮২.২৯ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় ৪৪.৮৫ শতাংশ জমির ফসল কর্তনের দাবি করা হয়েছে। একই প্রতিবেদনে জলাবদ্ধতায় ১৬ হাজার ৩৯৫.৭২ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। তবে এই তথ্য সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন হাওরপাড়ের কৃষক, সুধীজন ও হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতারা। তাদের দাবি, বাস্তবে হাওরের অন্তত অর্ধেক জমির ধান কাটাই সম্ভব হয়নি। জলাবদ্ধতায় অধিকাংশ ফসল তলিয়ে গেছে। যেসব ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোও রোদ না থাকায় শুকাতে না পেরে নষ্ট হওয়ার পথে। শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাখিমারা হাওরের কৃষক জাবেদ আলী বলেন, আমাদের হাওরের প্রায় ৯০ শতাংশ জমি পানির নিচে। আমার নিজের ১০ কেয়ার জমির সব ধান ডুবে গেছে। সরকার সরেজমিনে এসে বাস্তবতা দেখুক। সদর উপজেলার শিয়ালমারা হাওরের কৃষক আব্দুল বসির জানান, ৮ কেয়ার জমির মধ্যে মাত্র ২ কেয়ারের ধান কষ্ট করে কাটতে পেরেছি। তাও শুকাতে পারছি না, ফলে ক্ষতির আশঙ্কা বাড়ছে। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ স¤পাদক একে কুদরত পাশা বলেন, ৮০ শতাংশ ধান কাটার দাবি স¤পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটি কৃষকদের সঙ্গে প্রতারণা। কলমের মাধ্যমে ধান কাটা দেখিয়ে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি গোপন করা হচ্ছে। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় অভিযোগ করেন, রহস্যজনক কারণে প্রকৃত ক্ষতির তথ্য আড়াল করা হচ্ছে। জেলার অর্ধেক ধানও কাটা হয়নি। কৃষকরা ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন। সঠিক তথ্য তুলে ধরে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা না দিলে মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে। অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক দাবি করেছেন, এপ্রিলের ৩ তারিখ থেকে ধান কাটা শুরু হয়েছে। মাঝে বৃষ্টির কারণে ৩ দিন কৃষকরা ধান কাটতে পারেননি। নতুবা প্রতিদিনই ধান কাটা হয়েছে। ধান কাটার এই তথ্য মাঠ পর্যায়ের। এখানে কম বেশি করে আমাদের কোনো লাভ নেই। জেলায় এবার ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ লাখ মেট্রিক টন। তবে জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। এদিকে গত মঙ্গলবার দুপুরে সুনামগঞ্জের হাওর পরিস্থিতি নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুকের দেয়া ধান কর্তন এবং প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির মনগড়া তথ্যের তীব্র প্রতিবাদ জানান। কৃষি অধিদপ্তর থেকে দাবি করা হয়, হাওরে ৮০ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে, তবে জনপ্রতিনিধিদের দাবি - প্রায় ৫০ শতাংশ ধান বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। তারা হাওরের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের জন্য ঢাকা থেকে বিশেষজ্ঞ দল পাঠানোর আহ্বান জানান। জেলা বিএনপি নেতা আকবর আলী বলেন, আমার খুব আশ্চর্য লাগছে কৃষি বিভাগের উপ-পরিচালক মহোদয়ের কথা শুনে। উনি যে তথ্য দিয়েছেন ৮০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। আমি সবিনয়ে এর বিরোধিতা করছি। কারণ এতো পার্সেন্ট ধান সুনামগঞ্জে কাটা হয়নি। এরপর উনি বলেছেন, টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ এলাকা থেকে লোক এনে ধান কর্তনের ব্যবস্থা করেছেন। তাও ঠিক নয়। এরপর তিনি বলেছেন বিভিন্ন হাওরের কথা। কিন্তু উনি দেখার হাওরের কথা বলেন নাই। যে দেখার হাওরে আমাদের এমপি মহোদয়, জেলা প্রশাসক, এসপি মহোদয়কে সাথে নিয়ে একটা বাঁধ কেটে দেওয়ার পরে ওই হাওরের ধানগুলো কাটার উপযুক্ত ছিল। কিন্তু কর্তনের অভাবে এই ধানগুলো হাওরে রয়ে গেছে। আমি অনুরোধ করবো উনারা যেন প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করেন। জেলা বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট শেরেনূর আলী বলেন, ধান কর্তন যখন শুরু হয়, দুর্যোগ যখন শুরু হয়, আমাদের ডিডি মহোদয় তখন যে তথ্যগুলো আমাদের সামনে উপস্থাপন করেন, আমরা এর বিরোধিতা করেছি। শুধু আমরা না, এখানে সাংবাদিকবৃন্দ আছেন, তারা মাঠে-ময়দানে কাজ করেছেন, তারাও এর বিরোধিতা করেছেন। উনি যে তথ্যটি দিয়েছেন ৮০% ধান কর্তন হয়ে গেছে, আমি এর বিরোধিতা করছি। তিনি তথ্য দেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা উপরমহলকে খুশি করার জন্য। কিন্তু এটা সুনামগঞ্জবাসীর জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয়। আমি অনুরোধ করবো মন্ত্রী মহোদয় যারা এসেছেন, আপনারা ঢাকা থেকে একটি সার্ভে টিম পাঠিয়ে মাঠ লেভেলের খবরটা নিয়ে হাওরের এই ক্ষতির হিসাবটা করেন। তাহলে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরকারি সহায়তার আওতাভুক্ত হবেন, তারা উপকৃত হবেন। সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, আমি দেখেছি, যা ক্ষতি হয়, এর চেয়ে কম দেখানোর চেষ্টা উনারা করেন। কেন করেন সেটা আমার বোধগম্য নয়। একটু সঠিক চিত্রটা তুলে ধরেন। কিন্তু আপনাদের এমন কাজের জন্য আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
ফসলহানির প্রকৃত তথ্য আড়ালের চেষ্টা হাওরের ধান কলমে কাটে!
- আপলোড সময় : ০৭-০৫-২০২৬ ০২:২৬:৪৫ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৭-০৫-২০২৬ ০৩:০২:৪২ অপরাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ