ক্ষেতে-খলায় নষ্ট হচ্ছে ধান
- আপলোড সময় : ০৩-০৫-২০২৬ ০৯:৫৩:৫৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৩-০৫-২০২৬ ০৯:৫৩:৫৩ পূর্বাহ্ন
বিশ্বজিত রায় ::
চার-পাঁচদিনের ভারি বৃষ্টির পর গত দুইদিনের রৌদ্রোজ্জ্বল ফুরফুরে পরিবেশ স্বস্তি ফিরিয়েছিল হাওরাঞ্চলে। শনিবার ভোর থেকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে দুপুরের দিকে থেমে গেলে কৃষক ধান কাটতে ছুটে যান হাওরে। কিন্তু একের পর এক বাঁধ ভেঙে শঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে কৃষকের। এর মাঝে শনিবার মধ্যনগর উপজেলার বোয়ালা হাওরের বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করেছে হাওরে। জলাবদ্ধতায় ফসলহানির দীর্ঘ ক্ষত কাটিয়ে উঠার লড়াই যেন থামছে না হাওরবাসীর।
প্রকৃতির বৈরিদশায় ‘নাকানি-চুবানি’ অবস্থা সুনামগঞ্জের লক্ষাধিক কৃষক পরিবারের। গেল দুইদিনে কিয়ারপ্রতি (৩০ শতকে এক কিয়ার) চার থেকে পাঁচ হাজার টাকার চুক্তিতে কোমরসমান পানিতে ধান কাটিয়েছেন বোরো চাষীদের অনেকে। খলায় গেঁরা (অঙ্কুর) গজানো ধান রোদে মেলে খোড়াকের যৎসামান্য ঘরে তুলতে পারলেও বৃষ্টি শুরু হওয়ায় বেকায়দায় পড়তে হয়েছে কৃষকদের।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর ও নন হাওরে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন কৃষক। গড়ে ৫৯ দশমিক ২৪৫ শতাংশ জমির ধান কাটা হয়েছে হাওরে।
জেলায় কর্তনকৃত জমির পরিমাণ ১ লাখ ৩২ হাজার ৪১৮ হেক্টর। কাটার বাকি আছে এখনও ৯১ হাজার ৯৩ হেক্টর জমির পাকা ধান। জলাবদ্ধতায় ১৫ হাজার ৩৫৩ হেক্টর জমি আক্রান্ত হলেও ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ এখনও নির্ধারণ করতে পারেনি কৃষি অধিদপ্তর। তবে হাওর সচেতন মহলের দাবি, সরকারি হিসাবের চেয়ে ধান ক্ষতি হয়েছে কয়েক গুণ বেশি।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল পর্যন্ত) দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উজানে এবং হাওর অববাহিকায় ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত পরিলক্ষিত হয়েছে। ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে ২৪ ঘণ্টায় ৩২ মিলিলিটার এবং সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় সর্বোচ্চ ১২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
হাওরাঞ্চলের নদ-নদীর পানি ধীরগতিতে (১ সেন্টিমিটার হারে) বৃদ্ধি পেলেও জগন্নাথপুরের নলজুর নদীর পানি ৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে স্থিতিশীল আছে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি। আগামী তিনদিন মাঝারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
হাওর নিয়ে কাজ করা সেন্ট্রার ফর ন্যাচারাল রিসোর্স স্টাডিজ (সিএনআরএস) সুনামগঞ্জের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সাজ্জাদ জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে হাওর এলাকায় প্রায় ৪০ শতাংশ জমি জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়েছে। এর মাঝে প্রায় ২৫ শতাংশ কাটা ধান বৃষ্টির কারণে শুকাতে না পারায় নষ্ট হয়ে গেছে। কিছু ধান ঘরে তুলতে পারলেও উৎপাদন ও কর্তন ব্যয়ে কৃষক ঋণগ্রস্ত হবে। একফসলী এলাকার মানুষেরা এখন বছরের পারিবারিক ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাবে।
ধর্মপাশা উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের সানবাড়ি গ্রামের কৃষক রাকেশ তালুকদার বলেন, সোনামড়ল হাওর ও হালি হাওরের বোয়ালিয়া অংশ মিলিয়ে প্রায় ৮০ কিয়ারের (৩০ শতকে এক কিয়ার) মতো জমি করেছি। এর মধ্যে কিছু অংশ ডুবে গেছে। কিছু কাটতে পারলেও খলায় থেকে গেঁরা (অঙ্কুর) গজাচ্ছে। খেতে-খলায় দুই জায়গাতেই নষ্ট হচ্ছে ধান। ধান কাটা না কাটা সমান।
ধান কাটা নিয়ে কথা হয় তাহিরপুরের দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের ভান্ডারচাপুর গ্রামের কৃষক গোলাম নূরের সাথে। গুরমা হাওর পারের ওই কৃষক বলেন, পানিতে নেমে ধান কাটতে পারলেও পারে তোলা যাচ্ছে না। ধান কেটে পানিতে ভাসিয়ে রাখা হচ্ছে। এরই মাঝে দোমাল থেকে মামুদপুর পর্যন্ত বাঁধের কালভার্ট দিয়ে হাওরে পানি ঢোকা শুরু হয়েছে। পানি বাড়লে ওই কাটা ধান আর তোলা যাবে না।
জামালগঞ্জের সাচনা বাজার ইউনিয়নের ভরতপুর গ্রামের কৃষক বাবলু রায় বলেন, রৌয়ার হাওরে পাঁচ কিয়ার (দেড় একর) জমিনের ধান কাটছি ২২ হাজার টাকায় ফুরাইয়া (চুক্তিতে)। কামলা (শ্রমিক) দিয়া ধান তুলতে গিয়া আরও ৪ হাজার টাকা খরচ হইছে। ধান ভাঙ্গাইতে (মাড়াই) আরও খরচ হইছে। পাঁচ কিয়ারে ধান হইব মাত্র ৬০ মণ। সব মিলাইয়া কিয়ার প্রতি খরচ প্রায় ১৮ হাজার টাকা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, সকালে বৃষ্টি থাকায় কৃষক ধান কাটতে পারেনি। বৃষ্টি কমার সাথে সাথে কৃষক ধান কাটতে শুরু করে। আবহাওয়া যদি এ রকম থাকে তাহলে অবশিষ্ট ধান কেটে ফেলতে পারবে কৃষক।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার জানিয়েছেন, গোটা হাওরের ১১০টি ক্লোজারের সবক’টিই প্রায় ঝুঁকিমুক্ত। নদীর পানি স্থিতিশীল থাকায় অন্যান্য বাঁধেও তেমন ঝুঁকি নেই। বোয়ালা হাওরে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকলেও এই হাওরের ধান কাটা প্রায় শেষ পর্যায়ে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
