অপরিকল্পিত বাঁধে হাওরের সর্বনাশ : এখনই চাই সমন্বিত ও স্থায়ী সমাধান
- আপলোড সময় : ০৩-০৫-২০২৬ ০৯:০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৩-০৫-২০২৬ ০৯:০৭:৫৫ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জসহ দেশের হাওরাঞ্চল আবারও প্রমাণ করল - প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে নয়, বরং প্রকৃতিকে বুঝে চলাই টেকসই পথ। চলতি বোরো মৌসুমে জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার ঘটনা কেবল একটি মৌসুমি দুর্যোগ নয়; এটি দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, নীতিগত দুর্বলতা এবং বাস্তবতা-বিবর্জিত উন্নয়ন ধারণার করুণ ফল।
হাওর নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা গবেষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে স্পষ্ট- প্রতিবছর কেবল মাটির বাঁধ নির্মাণের ওপর নির্ভরশীলতা হাওরের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। হাওর কোনো পুকুর নয়; এটি একটি জীবন্ত, চলমান জলাভূমি ব্যবস্থা, যেখানে পানি প্রবেশ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ রয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, খাল-নদী ভরাট এবং পানি নিষ্কাশনের পকেট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজ হাওর নিজেই নিজের ফাঁদে আটকা পড়েছে।
এবারের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সরকারি হিসাবে ক্ষতির পরিমাণ সীমিত দেখানো হলেও মাঠপর্যায়ের কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের অভিজ্ঞতা বলছে- বাস্তব ক্ষতি বহু গুণ বেশি।
কৃষকের চোখের জল, ঋণের বোঝা এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ কোনো পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। যে কৃষক বছরজুড়ে শ্রম দিয়ে ফসল ফলান, তিনি যখন এক রাতের পানিতে সব হারান, তখন তা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয় - এটি সামাজিক ও মানবিক বিপর্যয়। সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ফসলের ধরন ও সময় নির্বাচন। হাওরের প্রকৃতি অনুযায়ী দেশি ধান দ্রুত পাকে এবং আগাম বন্যা এড়াতে সক্ষম। অথচ অধিক ফলনের আশায় হাইব্রিড ও উচ্চফলনশীল জাতের দিকে ঝুঁকে পড়ায় ফসলের সময়কাল দীর্ঘ হচ্ছে, যা হাওরের ঝুঁকির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে সামান্য প্রাকৃতিক বৈরিতাতেই বিপর্যয় নেমে আসছে।
এখন প্রশ্ন- সমাধান কোথায়? প্রথমত, হাওর ব্যবস্থাপনায় কেবল বাঁধনির্ভর চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রয়োজন সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, যেখানে নদী-খাল পুনঃখনন, প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ এবং পানি নিষ্কাশনের পথ উন্মুক্ত রাখা হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকৌশলীদের অস্থায়ী প্রকল্প নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যাতে হাওরের স্বাভাবিক চরিত্র বজায় থাকে। তৃতীয়ত, কৃষি ব্যবস্থায় অঞ্চলভিত্তিক উপযোগী ফসল নির্বাচন ও দেশি জাতের পুনরুজ্জীবনে গুরুত্ব দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, নীতি নির্ধারণে স্থানীয় কৃষক, গবেষক ও অভিজ্ঞদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্প নয়, বাস্তবতার আলোকে গ্রহণযোগ্য সমাধানই হতে পারে হাওর রক্ষার একমাত্র পথ।
হাওর কেবল একটি কৃষিভিত্তিক অঞ্চল নয়; এটি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অঞ্চলকে রক্ষা করা মানে দেশের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা। তাই সময় এসেছে দায়সারা উদ্যোগ পরিহার করে কার্যকর, টেকসই এবং বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়