জলাবদ্ধতায় তলিয়ে গেল ছায়ার হাওর কাটা ধানে গজাচ্ছে চারা
জয়ন্ত সেন ::
ছায়ার হাওরে আগেই লেগেছিল জলাবদ্ধতা। এ জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকের ছিল সীমাহীন দুর্ভোগ। কারো জমিতে আধপাকা, কারো পাকা ধান, কারোবা শ্রমিক সংকট, আবার অনেকেই কাটাধান আনতে পারছে না কর্দমাক্ত রাস্তার কারণে। না চলছে নৌকা, না চলছে ট্রলি। অন্যদিকে একাধিকবার টানাহেঁচড়া করে যেসব ধান আনা হয়েছে একটু উঁচুস্থানে, সেখানেও রোদের অভাবে পাকাধানে চারা গজাচ্ছে। মাড়াই করা স্তূপীকৃত ধানেও গজাচ্ছে চারা, বের হচ্ছে দুর্গন্ধ। এসব পচনধরা ধানের স্তপের পাশে বসে কৃষাণীদের কান্না করতেও দেখা গেছে।**
সারাবছরের পরিশ্রমের ফসল ঘরে তোলার জন্য পানি আর বৃষ্টির সাথে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। তবুও হাল ছাড়ছিল না কৃষকরা। কিন্তু ২৭ এপ্রিল সারারাত ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে তলিয়ে যায় উপজেলার ছায়ার হাওর, ভান্ডাবিল হাওর, বরাম ও উদগল হাওর।**
বুধবার (২৯ এপ্রিল) সরেজমিনে ছায়ার হাওরে গিয়ে দেখা যায় হাওরের হাজারো হেক্টর পাকা বোরোধান তলিয়ে গেছে। উপজেলার ৬টি হাওরই নি¤œাঞ্চলের জমি পানির নিচে। অন্যদিকে উঁচু অঞ্চলের জমিগুলোতেও দুই ফুট পানি। এরমধ্যে আকাশে কালোমেঘ। রয়েছে বজ্রপাতের আতঙ্ক। বহুমুখী সংকটে কৃষক।
বর্গাচাষি দরিদ্র শান্ত দাস জানান মাত্র তিন কেয়ার জমি করেছিলেন তিনি। সবটাই ৫ ফুট পানির নিচে। এই তিন কেয়ার জমির ধান আর আনা সম্ভব নয়। তিনি এনজিও সংস্থা ব্র্যাক থেখে ঋণ নিয়ে একটি গরু কিনেছিলেন। সেই গরু থেকে এখন তিনটি গরু হয়েছে। এগুলোর খাদ্যের জন্য কি ব্যবস্থা হবে সে চিন্তায় ঘুম নেই তার।
অধীর দাস বলেন, ৬ কেয়ার জমির মধ্যে পানির নিচ থেকে আড়াই কেয়ার জমির ধান কেটেছেন ১০ হাজার টাকা খরচ করে। এখন এসব ধানে গেরা (চারা) গজাচ্ছে। এসব ধান খাওয়াও যাবে না বিক্রিও করা যাবে।**
ছায়ার হাওরের আরেক কৃষক রথীন্দ্র চন্দ্র সরকার বলেন, ৫ কেয়ার জমির মধ্যে দেড় কেয়ার ধান কেটেছি অনেক কষ্ট করে। সাড়ে তিন কেয়ার পানির নিচে। এখন আমার গুলিধানে গেরা (চারা) গজাচ্ছে। এগুলো আর কোনও কাজে আসবে না।
তবুও ধানের মায়ায় চারা গজানো স্তূপের পাশে তার স্ত্রী বসে কান্না করছেন কীভাবে বছর যাবে। গরুকেই বা খাওয়াবে কি।
অন্যদিকে কৃষক কালাই মিয়া বলেন, আমার ২৬ কেয়ার জমি ছায়ার হাওরের ফুলফুইল্লা ও কচমা নামক স্থানে তলিয়ে গেছে। কৃষক কাচু রায় জানান, তার ২২ কেয়ার জমির মধ্যে ২০ কেয়ার পানির নিচে। তার বড় ভাই অনন্ত রায়েরও ১৪ কেয়ার জমি তলিয়ে গেছে। কিংকর রায়ের ১৩ কেয়ার পানির নিচে। **
বর্গাচাষি দরিদ্র কাচুনী রায় বলেন, ১০ হাজার টাকা দরে ৭ কেয়ার জমি ৭০ হাজার টাকা দিয়ে আবাদ করেছিলেন তিনি। সবটাই এখন পানির নিচে। নিভলু রায়েরও ৭ কেয়ার পানিতে তলিয়ে গেছে। পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া ধান আর কাটা সম্ভব নয় বলে জানান তারা। এভাবেই হাজারো কৃষকের সোনালী ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তারা বলছেন, হাওরে অর্ধেকেরও কম ধান কাটা হয়েছে আর যেগুলো কাটা হয়েছে সেগুলোও এখন পচনধরা অবস্থায় আছে। **
এ বিষয়ে শাল্লা উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতারা বলছেন, কৃষকেরা ঠিকই বলেছেন। হাওরে গড়ে প্রায় ৪০% কর্তন করা হয়েছে। এরমধ্যে কর্তনকৃত ধানও রোদের অভাবে কৃষকের গোলায় ওঠেনি। এগুলো নষ্ট হওয়ার পথে। সবকিছু মিলিয়ে কৃষকের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৮০ভাগে দাঁড়াতে পারে। **
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিত রায় বলেন, উপজেলার হাওর ও নন হাওর মিলিয়ে ২১ হাজার ৭শ হেক্টর জমিতে বোরোধান আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে আগে ক্ষতি হয়েছে ১৭৩ হেক্টর জমির। পরে হয়েছে ১ হাজার ১০ হেক্টর জমিতে। এখনও কর্তনের বাকি ৫ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমি। যা পানিতে রয়েছে। এগুলোও আমাদের কৃষকরা বুদ্ধি টুদ্ধি দিয়ে কেটে আনবেন। আর যেসব ধান রোদের অভাবে শুকানো যাচ্ছে না, সেগুলোর জন্য প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভর করছেন কৃষি কর্মকর্তাও।
তবে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তালিকা এখনও তৈরি হয়নি। তিনি আরও জানান, উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিকটন। যার বাজার মূল্য প্রায় পাঁচশো ১৬ কোটি টাকা।**
অন্যদিকে অভিযোগ উঠেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের দিকে। হাওর আন্দোলন সংগঠনের নেতারা বলছেন অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এদায় পানি উন্নয়ন বোর্ডেরও। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
