শামস শামীম::
চোখের সামনে শ্রমঘামে ফলানো সোনার ধান মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে পানির সঙ্গে সাপলুডু খেলছে। গত তিনদিনের টানা ভারী বর্ষণে ডুবে নষ্ট হচ্ছে ধান। ধান কাটানোর শ্রমিক মিলছেনা। সরকারের ভর্তুকির কম্বাইন হার্ভেস্টর যন্ত্রও নামানো যাচ্ছেনা ক্ষেতে। অধিক মজুরি দিয়ে খোরাকির জন্য কৃষকরা ধান কাটলেও সেই কাটা ধান ঢলের পানিতে ভেসে যাচ্ছে। এখন ‘নয়নভাগা’ (দুর্যোগের সময় অর্ধেক কৃষকের অর্ধেক শ্রমিকের) চুক্তিতে ধান কাটাচ্ছেন বিভিন্ন এলাকার কৃষক। সরকারি হিসেবে ৪৪.৫০৯ ভাগ ধান কাটা হয়েছে বলা হলেও হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন এখনো ৩০ ভাগ জমির ধান কাটা হয়নি। অবশিষ্ট জমির ধান কাটা সম্ভব হবে কি না তাও জানেননা কৃষক। তাই বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাওরের কৃষক। তাছাড়া জলাবদ্ধতার ক্ষয়-ক্ষতি ও ধান কাটার পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। নয়নভাগায় ধান কাটা:
শাল্লা উপজেলার ভা-াবিল হাওরের উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নের আছানপুর গ্রামের কৃষক ঝন্টু দাস বলেন, হাওরটি বর্তমানে জলাবদ্ধতার ডুবে আছে। এর মধ্যে ৩-৪ দিনের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কারণে শ্রমিকরা ধান কাটতে পারছেন না। ক্ষেতে মেশিনও নামছেনা। কয়েকদিন আগে ৮ কেয়ার জমির মধ্যে ৪ কেয়ার (প্রতি কেয়ার ৩০ শতাংশ) জমির ধান কাটালেও ধান পরিবহনের রাস্তা কাদাজলে ডুবে থাকায় মাঠেই ফেলা ছিল ধান। সোমবার রাতের ভারী বর্ষণের পানিতে মাঠ তলিয়ে ভেসে গেছে সেই ধান। অবশিষ্ট জমির ধান কাটতে এখন শ্রমিক পাচ্ছিনা। এবার ধান লাগানোর খরচেই টান পড়বে বলে জানান তিনি। একই দশা একই ইউনিয়নের জাতগাঁও গ্রামের কৃষক রায়হান উদ্দিনের। তিনি বলেন, অর্ধেকের বেশি ক্ষেতের ধান পানিতে ডুবে যাচ্ছে। কাটানোর শ্রমিক পাচ্ছিনা। যা কাটিয়েছিলাম তা পানিতে এসে নষ্ট করে দিচ্ছে। শুকাতে পারছিনা। এবার ভয়াবহ খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়েছি।
এই কৃষকদের ফসলের অবশিষ্ট ধানের সঙ্গে কাটা জমির ধান যখন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে তখন মধ্যনগর উপজেলার এরনবিল ইকরাছই হাওরের স্থানীয় বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করছে। হাওরটির ৬০ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে হাওরটিতে পানি প্রবেশ করছে।
শাল্লা উপজেলা কৃষকদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও কৃষক মো. একরামুল হোসেন বলেন, আমাদের এলাকার কাটা ও মাড়াই করা ধানও ভাসিয়ে নিয়েছে বৃষ্টির পানি। ক্ষেতের পাকা ধান আরো নিমজ্জিত হয়েছে। এখন ১২ শ টাকা মজুরিতেও শ্রমিক মিলছেনা। কিছু এলাকায় নয়নভাগা চুক্তিতে ধান কাটা হচ্ছে। কৃষক এবার কোনভাবেই চাষাবাদের খরচ তোলতে পারবেননা। বিরাট ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক।
শুধু শাল্লাই নয় ধর্মপাশারও বিভিন্ন হাওরে কাটা ও মাড়াই করা ধান ডুবে নষ্ট হওয়ার পথে।
এদিকে সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর আগে বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের আবহাওয়া পূর্বাভাসে ২৮ এপ্রিলের মধ্যে হাওরের পাকা ৮০ ভাগ জমির ধান কেটে তোলার আহ্বান জানিয়েছিল। আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা। সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, পানি বাড়লে হাওরের ১১০টি ক্লোজার (বড় ভাঙ্গা) চরম ঝুঁকিতে আছে।
নদ নদীর পানি বাড়ছে:
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে গত ২৪ ঘণ্ঠায় সুনামগঞ্জে ১৩৭ মিলিমিটার ভারী বর্ষণ রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার রাত ৯টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৯টা পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি ৩৫ সেন্টিমিটার বেড়েছে। তবে মঙ্গলবার বেলা ২টায় সুরমা নদীর পানি সুনামগঞ্জ পয়েন্টে আরো বেড়ে ৩.৮৬ সেন্টিমিটার থেকে ৪.০৩ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। এই নদীর ছাতক পয়েন্টেও চার ঘন্টায় ৪.২৪ থেকে দুপুর ২টায় ৪.৪২ সেন্টিমিটার উচ্চতায় প্রবাহিত হচ্ছে। পুরান সুরমা নদীর পানি দিরাই পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ১২ সেন্টিমিটার বেড়েছে। যাদুকাটা নদীর পানি শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৭২ সেন্টিমিটার বেড়েছে। সীমান্ত নদী ঝালুখালির পানি মুসলিমপুর পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ২৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। পাটলাই সীমান্ত নদীর পানি সোলেমানপুর পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ২০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। মহাসিং নদীর পানি আক্তাপাড়া পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৯ সেন্টিমিটার বেড়েছে। নলজুর নদীর পানি জগন্নাথপুর পয়েন্টে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত ৩৩ সেন্টিমিটার বেড়েছে। এভাবে নদ-নদীর পানি অস্বাভাবিক বাড়ছে। মেঘালয়ের ভারী বর্ষণের পানিও দ্রুত ভাটির জনপদে নামছে। যার ফলে পানি আরো বাড়বে এবং হাওরের অবশিষ্ট ফসল ঝুঁকিতে পড়বে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। এভাবে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় হাওরের কৃষকরাও চরম দুশ্চিন্তায় আছেন। পাউবো’র বাধ ভেঙ্গে এখনো কোনও হাওরে পানি প্রবেশ না করলেও বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধান।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধে পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের পানি চাপ বাড়ালেও ঝুঁকি রয়েছে ১১০টি ক্লোজার নিয়ে। মঙ্গল সকালে মধ্যনগরে যে বাধ ভেঙেছে সেটি পাউবো’র বাঁধ নয়। স্থানীয় বাঁধ। তবে নদ নদীর পানি বাড়ছে। আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত পাহাড়ি ঢল ও বর্ষণের পানিতে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এসময় হাওরের ফসলও ঝুঁকিতে থাকবে। এখনো বাঁধ ভেঙে ফসল না ডুবলেও ভারী বর্ষণের পানি হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করেছে বলে স্বীকার করেন তিনি।
জলাবদ্ধতা ও ধান কাটার পরিসংখ্যান নিয়ে লুকোচুরি : গত ২৫ এপ্রিল থেকে সুনামগঞ্জে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া চলছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। টানা বর্ষণ ও বজ্রপাতে থমকে আছে ধান কাটা। কিন্তু কৃষি বিভাগ ধানকাটার যে প্রতিবেদন দিয়েছে তাকে মাঠের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। ২৫ এপ্রিল ২৮.৪৮৫ ভাগ, ২৬ এপ্রিল ৩৫.২৪১ ভাগ, ২৭ এপ্রিল ৪১.২১৪ ভাগ এবং ২৮ এপ্রিল ৪৪.৫০৯ ভাগ ফসল কাটা হয়েছে বলে যে প্রতিবেদন দিয়েছে বাস্তবে এই চারদিনে অল্প ধান কাটা হয়েছে বলে মনে করেন কৃষকরা। গত ২৭ এপ্রিল বজ্রপাতে ৩ কৃষক মারা গেছে হাওরে। এর আগেও ৫ জন মারা গেছেন। তাছাড়া এরপরেই পাউবো দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিয়ে দ্রুত ধানকাটার আহ্বান জানানোয় শ্রমিকরা আরো উদ্বিগ্ন হয়ে যান। তাই ধান কাটার গতি কমে যায়। কিন্তু কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে কাগজে কলমে ধান কাটার পরিসংখ্যান বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন হাওর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ। তাছাড়া জলাবদ্ধতায় কৃষি বিভাগের মতে মাত্র ৬ হাজার ৬০৬ হেক্টর জমির ধান নষ্ট হয়েছে বলা হলেও বাস্তবে প্রায় ৩০ হাজার হেক্টর জমির ধান এখন পর্যন্ত নষ্ট হয়েছে বলে জানান কৃষকরা।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক ২৮ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টায় ধান কাটার যে পরিসংখ্যান দিয়েছেন তাতে ২৭ এপ্রিলের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলেছেন ৪৪.৫০৯ বা ৯৯ হাজার ৪৮৩ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে।
সুনামগঞ্জ হাওর, নদী ও পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, প্রায় মাস খানেক আগেই হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এরপর থেকেই জলাবদ্ধতা বাড়ছে। তবে গত ৩-৪ দিনের ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এখন হাওরের পানি উপচে কাটা ধান রাখা খলায়ও ডুবিয়ে নিচ্ছে। এতে ফসলের পাকা ফসলের সঙ্গে কাটা ধানও নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতায় অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যানে ক্ষতির পরিমাণ অল্পই দেখানো হচ্ছে। তিনি বলেন, সোমবার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় জানানো হয়েছে ৫০-৬০ ভাগ জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। এটা কোনওভাবেই সঠিক নয়।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহসভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, হাওরের কৃষক এবার চরম দুর্দশায় পড়েছে। ক্ষেতে পাকা ফসল জলাবদ্ধতায় পচে নষ্ট হচ্ছে। কাটা ধানও খলায় ভিজে, পানিতে তলিয়ে নষ্ট হচ্ছে। তাই বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষক। কিন্তু স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ক্ষয়-ক্ষতির যে পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে তাতে হাওরের কৃষকরা সরকারি সহায়তা বা ভর্তুকি থেকে বঞ্চিত হবেন। সরকারের কাগজে কলমের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাস্তবতার কোনও মিল নেই বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ওমর ফারুক বলেন, আমাদের মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা মাঠ থেকে তথ্য নিয়েই প্রতিবেদন দিচ্ছেন। গত ৩-৪ দিন ধরে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, শ্রমিক সংকট, যন্ত্রে ধান কাটা যাচ্ছেনা তিনি স্বীকার করলেও পরিসংখ্যানে কিভাবে ধান কাটা বাড়ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা মাঠ থেকে তথ্য নিয়েই রিপোর্ট তৈরি করছি। এদিকে মধ্যনগরে এরনবিল হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসলডুবির ঘটনার বিষয়ে তিনি বলেন, এই হাওরের ১১৪ হেক্টর জমির মধ্যে ৫০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়ে গেছে। অবশিষ্ট ধান এখনো রয়ে গেছে। তবে তা দ্রুত কেটে নিচ্ছেন কৃষকরা।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে,
চরম দুর্দশায় হাওরের কৃষক
- আপলোড সময় : ২৯-০৪-২০২৬ ১০:১৮:৫৬ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৯-০৪-২০২৬ ১০:২১:৫৪ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ