সাংস্কৃতিক স্বাধীনতায় বাধা সৃষ্টি কাম্য নয়
- আপলোড সময় : ১৭-০৪-২০২৬ ০৯:৫১:২১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৭-০৪-২০২৬ ০৯:৫১:২১ পূর্বাহ্ন
বাংলা নববর্ষ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এই উৎসব কেবল আনন্দ-উচ্ছ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং প্রতিবাদের ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। সেই বৈশাখ যখন দ্রোহের সুরে মুখরিত হয়, তখন তা নিছক একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকে না - বরং হয়ে ওঠে সময়ের প্রতিবিম্ব।
সুনামগঞ্জে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর এবারের বর্ষবরণ আয়োজন সেই বাস্তবতারই একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতা ও শর্তের বেড়াজাল পেরিয়ে যখন একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন রাজপথকে বেছে নিতে বাধ্য হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে- আমরা কি সত্যিই সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার পথে এগোচ্ছি, নাকি অদৃশ্য কোনো নিয়ন্ত্রণের বলয়ে আটকে পড়ছি?
এক দশকের বেশি সময় ধরে যে সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর প্রাঙ্গণে উদীচী তাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে এসেছে, সেখানে হঠাৎ করেই অনুমতি না পাওয়া এবং বিকল্প স্থানেও একই পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিশেষ করে যখন গানের তালিকা জমা দেওয়ার মতো শর্ত আরোপ করা হয়, তখন তা সাংস্কৃতিক চর্চার স্বাধীনতার প্রশ্নকে সরাসরি স্পর্শ করে। শিল্প-সংস্কৃতি কি পূর্বনির্ধারিত অনুমোদনের শর্তে বাঁধা থাকবে, নাকি তা স্বাধীন সৃজনশীলতার মুক্ত পরিসরে বিকশিত হবে - এই প্রশ্ন আজ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে হয়তো বলা যেতে পারে, এটি ছিল নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, নিয়মের প্রয়োগ যদি এমনভাবে হয়, যা একটি স্বাধীন সাংস্কৃতিক সংগঠনকে তার চিরাচরিত আয়োজন থেকে বিরত রাখে, তবে তা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য উদ্বেগজনক। সংস্কৃতি কখনোই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিকশিত হয় না; বরং তা বিকশিত হয় মুক্ত চিন্তা, মতপ্রকাশ এবং সৃজনশীলতার উন্মুক্ত পরিবেশে।
এই প্রেক্ষাপটে উদীচীর রাজপথে নেমে আসা নিছক একটি বিকল্প আয়োজন নয় - এটি এক ধরনের প্রতীকী প্রতিবাদ। হোসেন বখত চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই আয়োজন দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় রূপ নেওয়া প্রমাণ করে, সংস্কৃতিকে দমিয়ে রাখা যায় না। পথনাটক ‘বাঁধ’, গণসংগীত এবং বর্ণাঢ্য গানের মিছিল - সবকিছুই যেন একটাই বার্তা দিয়েছে: সংস্কৃতি তার নিজস্ব শক্তিতেই বেঁচে থাকে, বাধা পেরিয়েই এগিয়ে যায়।
তবে এই ঘটনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সংহতি প্রকাশ দেখায়, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার প্রশ্নটি কোনো একক সংগঠনের নয় - এটি সমগ্র সমাজের। কারণ, যেখানে সংস্কৃতির কণ্ঠরোধ করা হয়, সেখানে গণতন্ত্রের ভিতও দুর্বল হয়ে পড়ে।
পহেলা বৈশাখের মতো একটি সর্বজনীন উৎসবকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। প্রশাসনের উচিত ছিল একটি সমন্বিত ও সহনশীল দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা, যাতে সব পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। একদিকে সরকারি আয়োজন, অন্যদিকে স্বাধীন সাংস্কৃতিক উদ্যোগ - দুটিই সমানভাবে বিকশিত হতে পারে, যদি সদিচ্ছা থাকে।
অতএব, এই ঘটনার আলোকে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে - আমরা কেমন সাংস্কৃতিক পরিবেশ চাই? এমন এক সমাজ, যেখানে শিল্পীরা শর্তের বেড়াজালে আবদ্ধ থাকবে, নাকি এমন এক মুক্ত পরিসর, যেখানে ভিন্নমত, প্রতিবাদ এবং সৃজনশীলতা সমানভাবে বিকশিত হবে?
দ্রোহে-প্রতিবাদে উদীচীর এবারের বর্ষবরণ আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে। এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এখনই সময়- সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার। তাহলেই বৈশাখের সত্যিকারের তাৎপর্য অটুট থাকবে, আর বাঙালির সংস্কৃতি এগিয়ে যাবে তার স্বকীয় শক্তিতে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়