স্টাফ রিপোর্টার ::
★ ৯ বছরে ব্যয় হাজার কোটি টাকা; নদী ভরাটে বাড়ছে জলাবদ্ধতা, ঝুঁকিতে বোরো ফসল।
নদী খননকে পাশ কাটিয়ে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে মাটির বাঁধ নির্মাণ করেও সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে স্থায়ী সমাধান মিলছে না। বরং এসব বাঁধের মাটি ও পাহাড়ি ঢলের পলিতে ভরাট হয়ে পড়ছে নদ-নদী, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানি নিষ্কাশন - ফলে আগাম বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জেলার ছোট-বড় ১৩৭টি হাওরের ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর বোরো জমির ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় প্রতিবছরই শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ফসলরক্ষা বাঁধ। কিন্তু বোরো মৌসুম শেষে বর্ষা এলেই এসব বাঁধ পানিতে বিলীন হয়ে যায়। ফলে অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুফল মিলছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে শুরু করে চলতি বছর পর্যন্ত টানা ৯ বছরে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে হাজার কিলোমিটারের বেশি ডুবন্ত বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরেই ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। এসব কাজ বাস্তবায়ন করছে ৭১৮টি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি)। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে ফসলরক্ষা বাঁধ রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭১৮ কিলোমিটার এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য ১১০টি ক্লোজার রয়েছে। এর মধ্যে ৪৮টি হাওরে নিয়মিত ডুবন্ত মাটির বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়। তবে স্থায়ী করা হয়েছে মাত্র ১২ কিলোমিটার বাঁধ। স্থানীয় কৃষক ও বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি বছর শুকনো মৌসুমে বাঁধ নির্মাণ হলেও বর্ষায় তা পানিতে মিশে যায়। এতে একদিকে কোটি কোটি টাকা অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে নদী ভরাট হয়ে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে পড়ছে। স্থানীয়রা জানান, বাঁধের মাটি নদীতে পড়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে চৈত্র মাসেও ২০-৩০ হাত পানি থাকত, এখন সেখানে নৌকা আটকে যায়। নদী খনন না করে শুধু বাঁধ দিয়ে কোনো লাভ হচ্ছে না। হাওর ও কৃষি নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, এই পদ্ধতি কেবল সাময়িক সমাধান দিচ্ছে। হাওর এরিয়া আপলিস্টমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক সালেহিন চৌধুরী শুভ বলেন, মাটির বাঁধ কখনো স্থায়ী সমাধান নয়। দ্রুত নদ-নদী খনন করতে না পারলে হাওরের পানি নিষ্কাশন হবে না, আগাম বন্যার ঝুঁকিও কমবে না। হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ স¤পাদক বিজন সেন রায় বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণে প্রতিবছর শত কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, অথচ নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নদী খননের উদ্যোগ না থাকায় কৃষকরা প্রতি বছরই ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা বলেন, ২০১৭ সাল থেকে বাঁধ নির্মাণে প্রায় হাজার কোটি টাকা খরচ হয়েছে। কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ছাড়া এসব কাজ করা হচ্ছে, যা হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মামুন হাওলাদার জানান, সুনামগঞ্জের ১৩টি নদীর ৩০৩ কিলোমিটার খননের জন্য প্রায় ১৩শ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। এছাড়া আরও ৪০০ কিলোমিটার নদী ও খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরাঞ্চলের টেকসই সমাধানের জন্য নদী ও খাল খনন, পানি প্রবাহের স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় প্রতিবছরের এই ব্যয়বহুল বাঁধ নির্মাণ কেবল অস্থায়ী সমাধান হিসেবেই থেকে যাবে, আর ঝুঁকিতে থাকবে হাওরের কৃষি ও জীববৈচিত্র্য।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
বছরে শত কোটি টাকার বাঁধে সমাধান নেই হাওরের
নদী খনন উপেক্ষিত
- আপলোড সময় : ০৮-০৪-২০২৬ ০৮:১৫:০২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৮-০৪-২০২৬ ০৮:১৬:৩৯ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ