সুনামগঞ্জ , মঙ্গলবার, ০৭ এপ্রিল ২০২৬ , ২৩ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে দুরবস্থা লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ ঘাটতি বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা, ছাতক পৌরবাসীর দুর্ভোগ চরমে নিহতদের পরিবারের পাশে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি দল, আর্থিক অনুদান প্রদান দায়সারা বাঁধে ফসলহানির শঙ্কা সরকারি চাকরিতে প্রবেশে বয়সসীমা ৩২ করে সংসদে বিল পাস উগ্র মতাদর্শের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত জ্বালানি সংকটে ভোগান্তি বাড়ছেই জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর : প্রধানমন্ত্রী ইভটিজিং প্রতিরোধে শহরে পুলিশের বিশেষ অভিযান বাঁধ দুর্বল, আকাশে মেঘ, দুশ্চিন্তায় হাওরপাড়ের কৃষক নষ্ট হওয়ার পথে হাজারো হেক্টর জমির ধান ‎জামালগঞ্জে অবৈধভাবে মজুত ২ হাজার লিটার ডিজেল জব্দ ইরানকে ১০ দিনের আলটিমেটাম ট্রাম্পের কার্ডের মাধ্যমে আড়াই হাজার টাকার সার-বীজ দেওয়া হবে কৃষকদের সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করতে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার পরিকল্পনা তাহিরপুরে সেতুর অভাবে যুগ যুগ ধরে দুর্ভোগে চার গ্রামের মানুষ ভূমধ্যসাগরে নিহত ১২ যুবকের পরিবারে কান্না থামছেনা, ৯ দালালের বিরুদ্ধে মামলা হামের লক্ষণ নিয়ে দুই শিশু হাসপাতালে ভর্তি, আরও একজনকে সিলেটে রেফার

‘মঙ্গল’ ‘আনন্দ’ হারানো বৈশাখী শোভাযাত্রা!

  • আপলোড সময় : ০৬-০৪-২০২৬ ১১:২৭:৫৯ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৬-০৪-২০২৬ ১১:২৭:৫৯ অপরাহ্ন
‘মঙ্গল’ ‘আনন্দ’ হারানো বৈশাখী শোভাযাত্রা!
চিররঞ্জন সরকার :: একটা সময় ছিল, যখন পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল ঢাকায় রোদের তাপে পুড়ে যাওয়া, রমনায় গান, আর চারুকলার সেই বিখ্যাত শোভাযাত্রা- যেখানে হাতি, ঘোড়া, পাখি, মাছ - সবাই মিলেমিশে এক অদ্ভুত রঙিন গণতন্ত্র চালাতো। সেখানে কেউ কারও ধর্ম জিজ্ঞেস করতো না, কেউ কারও বিশ্বাস যাচাই করতো না। সবাই শুধু জানতো- আজ নববর্ষ, আজ মানুষের দিন, আজ ‘মঙ্গল’ হোক। কিন্তু হায়! সেই ‘মঙ্গল’ই এখন জাতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের অর্থনীতি, বেকারত্ব, শিক্ষা— এসব তো ছোটখাটো ব্যাপার। আসল বিপদ লুকিয়ে ছিল ‘মঙ্গল’ শব্দের মধ্যে! এতদিন আমরা বুঝতেই পারিনি- এই শব্দটা কত ভয়ংকর, কত বিপজ্জনক, কত ষড়যন্ত্রে ভরা! একদল ‘জ্ঞানী’ মানুষ হঠাৎ করে আবিষ্কার করলেন- ‘মঙ্গল’ শব্দটা নাকি সাম্প্রদায়িক। শুনে মনে হয়, শব্দটা বোধহয় রাতে গোপনে বৈঠক করে, ষড়যন্ত্র করে, তারপর ভোরে উঠে মানুষের ঈমান নষ্ট করে দেয়। কী সাংঘাতিক ক্ষমতা! শুরুটা হয়েছিল ডক্টর মুহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। তারা অত্যন্ত সুশীল কায়দায় ‘মঙ্গল’ শব্দটাকে ডিলিট চেপে ‘আনন্দ’ বসিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর ক্ষমতার পালাবদল হলো, বিএনপি সরকার এলো। তারা প্রথমে বললো, ‘মঙ্গল’ শব্দটি ফিরিয়ে আনা হবে। এটা শুনে রাজপথে একদল হুঙ্কার দিলেন, ‘মঙ্গল’ সরিয়ে ‘আনন্দ’ করা হয়েছে, অনেক সাধনায়। এখন যদি আবার ‘মঙ্গল’ ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে কিন্তু সব কিছু ‘ইনকিলাব’ করে দেওয়া হবে। এসব দেখেশুনে বিএনপিওয়ালারা ‘মধ্যপন্থি’ অবস্থান নিলেন। তারা বললেন, আনন্দও নয়, মঙ্গলও নয়, নাম হবে ‘বৈশাখী শোভাযাত্রা’। সমস্যাটা কিন্তু গভীরে। বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। রিটকারী আইনজীবীর কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখে মনে হচ্ছে, এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার’ কারণেই বোধহয় দেশের জিডিপি কমছে, ইরানে ইসরায়েল-আমেরিকার আগ্রাসন চলছে কিংবা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ড্রেন দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। তার দাবি, এই শোভাযাত্রা নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠের ‘ঈমান’ এবং ‘ধর্মীয় স্বাধীনতার’ জন্য মারাত্মক হুমকি। অবাক করা বিষয় হলো, গত ৩৫ বছর ধরে এই শোভাযাত্রা চললো, কত মানুষ এলো-গেলো, কারোর ঈমান নড়চড় হলো না, অথচ হঠাৎ ২০২৬ সালে এসে সবার ঈমানি কম্পাস উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করলো! একেই বোধহয় বলে ‘ডিজিটাল ঈমানি ক্র্যাশ’। রিটে আরও বলা হয়েছে, মঙ্গল শোভাযাত্রা কোনও প্রাচীন ঐতিহ্য নয়, এটা ১৯৮৯ সালের ‘নব-সৃষ্ট’ কার্যক্রম। বাহ! চমৎকার যুক্তি। তাহলে তো স্মার্টফোনও ব্যবহার করা যাবে না, কারণ ওটাও নব-সৃষ্ট। ফেসবুক-ইউটিউব তো হারাম হওয়ার কথা, ওগুলো তো ঐতিহ্যে ছিল না। আসল কথা হলো, যখনই কোনও কিছুতে বাঙালির প্রাণের ছোঁয়া লাগে, তখনই একদল মানুষের পেটে বায়ু জমতে শুরু করে। তারা তখন ঐতিহ্যের সাল-তারিখ আর শব্দতত্ত্ব নিয়ে বসেন। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো শব্দের বাছবিচার। ‘মঙ্গল’ শব্দটা সাম্প্রদায়িক? বেশ, মেনে নিলাম। কিন্তু ভাই সাহেব, আপনারা কি জানেন সপ্তাহের সাতটা দিনের নাম কোথা থেকে এসেছে? রবি মানে সূর্য দেবতা, সোম মানে চন্দ্র বা শিব, আর ‘মঙ্গলবার’ তো স্বয়ং মঙ্গল গ্রহ বা হনুমান বা মঙ্গল চ-ীর দিন। তাহলে এখন কি আমরা মঙ্গলবারকে ‘দ্বিতীয় সোমবার’ বলবো নাকি ‘ছুটির আগের আগের আগের দিন’ বলে ডাকবো? বুধ, বৃহ¯পতি, শুক্র, শনি - সবই তো গ্রহ আর দেব-দেবীর নাম। মঙ্গল যদি বাদ যায়, তবে এই সাত দিনও তো বাদ যাওয়ার কথা। আপনারা কি তবে এখন থেকে পঞ্জিকা বদলে ‘১ নম্বর দিন’, ‘২ নম্বর দিন’ এই সিস্টেমে চলবেন? আবার দেখুন, মঙ্গল বাদ দিয়ে যে ‘বৈশাখী’ নামটা নেওয়া হলো, সেটা কি খুব নিরাপদ? বৈশাখ শব্দটা এসেছে ‘বিশাখা’ নক্ষত্র থেকে। হিন্দু পুরাণ মতে, বিশাখা হলেন দক্ষরাজের কন্যা এবং ব্রহ্মার নাতনি। অর্থাৎ, মঙ্গল তাও ছিল পুরুষ, বিশাখা তো পুরোপুরি ‘লেডিস’। সাম্প্রদায়িকতার পাল্লায় মাপলে তো বিশাখা আরও বেশি বিপজ্জনক হওয়ার কথা! এখন কি তবে বৈশাখ মাসকেও আমরা ‘গরমের মাস নম্বর ১’ বলব? এতদিন আমরা ভেবেছিলাম, ভাষা আমাদের পরিচয়। এখন বুঝলাম, ভাষা আসলে সন্দেহভাজন আসামি। এই নাম বদলের পেছনে যে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, সেটা আরও চমৎকার। বলা হচ্ছে, ‘মঙ্গল’ শব্দটা নাকি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে। কিন্তু ‘আনন্দ’ শব্দটা? সেটাও তো সংস্কৃত! সেটাও তো ধর্মীয় গ্রন্থে ব্যবহৃত! তাহলে সেটা ঠিক আছে কেন? মনে হয়, এখানে একটা বিশেষ ফর্মুলা কাজ করছে- যে শব্দটা আগে থেকে ব্যবহৃত, সেটা সমস্যা। যে শব্দটা নতুন করে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটা নিরপেক্ষ। অর্থাৎ, ইতিহাস যত পুরোনো, তত সন্দেহজনক। নতুন হলেই নিরাপদ! এই যুক্তি অনুসরণ করলে একসময় দেখা যাবে, আমরা ইতিহাসই বাতিল করে দিয়েছি। কারণ, ইতিহাসের বেশিরভাগ শব্দই তো কোনও না কোনও সংস্কৃতি থেকে এসেছে। আরেকটা মজার বিষয় হলো- এই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ কিন্তু কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না। এটা ছিল একটা সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ, একটা শিল্পচর্চা, একটা মানবিক বার্তা। এখানে হাতি, ঘোড়া, মাছ— এসব ছিল প্রতীক, কোনও ধর্মীয় প্রতীক না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এই হাতি-ঘোড়ার মধ্যেও ষড়যন্ত্র লুকিয়ে আছে! হয়তো কেউ বলবে- হাতি তো গণেশের প্রতীক! তাই হাতি বাদ! মাছ? সেটাও কোনও পুরাণে আছে! বাদ! শেষমেশ শোভাযাত্রায় থাকবে শুধু খালি রাস্তা আর কিছু নিরপেক্ষ বাতাস। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতের শোভাযাত্রা হবে এমন- যেখানে কিছু ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি হাঁটছেন, প্রতীক নেই, শব্দ নেই - শুধু নীরবে পথ চলা। ইউনেস্কো একসময় এই শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। তখন তারা ভেবেছিল, এটা একটা অসাধারণ সাংস্কৃতিক উদাহরণ। এখন যদি তারা দেখে, নাম পাল্টে গেছে, ভাব পাল্টে গেছে, তাহলে তারা হয়তো লিখবে- ‘চৎবারড়ঁংষু শহড়হি পঁষঃঁৎধষ যবৎরঃধমব, পঁৎৎবহঃষু ঁহফবৎ ষরহমঁরংঃরপ ৎবহড়াধঃরড়হ.’ আসলে ‘মঙ্গল’ শব্দটার মানে হলো শুভ, কল্যাণ। এই কল্যাণ কি শুধু হিন্দুদের? এই আকাশ, এই বাতাস, এই অগ্রহায়ণের ধান - এসব কি শুধু এক ধর্মের? মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল আকাক্সক্ষা: সবার ভালো হোক, দেশের ভালো হোক। কিন্তু আমরা এতটাই নিচে নেমে গেছি যে, ‘সবার ভালো হওয়ার’ কামনার মধ্যেও আমরা ধর্মের ভাগাভাগি খুঁজছি। যেকোনও জাতিকে ধ্বংস করার প্রথম ধাপ হলো তার শব্দ কেড়ে নেওয়া, তার প্রতীক কেড়ে নেওয়া। আমরা এখন সেই পথেই হাঁটছি। আজ মঙ্গল যাচ্ছে, কাল বৈশাখ যাবে, পরশু হয়তো বাংলা ভাষাটুকুই থাকবে না- পুরোটাই ‘পবিত্র’ আর ‘শুদ্ধ’ অনুবাদে ভরে যাবে। মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধের জন্য রিট করা আইনজীবীরা হয়তো ভাবছেন তারা অনেক বড় কাজ করছেন। কিন্তু তারা কি জানেন, সংস্কৃতি যখন মরে যায়, তখন ধর্মও আর নিরাপদ থাকে না? কারণ সংস্কৃতিই মানুষকে সহনশীল হতে শেখায়। যখন আপনি চারুকলার রঙ মাখা হাতগুলোকে শিকল পরিয়ে দেবেন, তখন সেই হাতগুলো আর সুন্দর কিছু আঁকবে না, তারা তখন কেবল ধ্বংসের ইশারা দেবে। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই পুরো প্রক্রিয়ায় কেউ আসলে উৎসবের আনন্দ নিয়ে ভাবছে না। সবাই ভাবছে- শব্দটা ঠিক আছে কিনা। অর্থাৎ, আমরা এমন এক জায়গায় পৌঁছেছি, যেখানে ‘আনন্দ’ করার আগে ‘আনন্দ’ শব্দটা বৈধ কিনা সেটা যাচাই করতে হয়। এটা একধরনের ‘শব্দ আমলাতন্ত্র’। এখানে প্রতিটা শব্দকে অনুমতি নিতে হয়- ‘আপনি কি নিরপেক্ষ?’ ‘আপনার কোনও ধর্মীয় অতীত আছে?’ ‘আপনি কি কারও অনুভূতিতে আঘাত করতে পারেন?’ যদি কোনও শব্দ একটু সন্দেহজনক হয়, তাহলে তাকে অবসর দেওয়া হয়। নতুন শব্দ আনা হয়- যার কোনও ইতিহাস নেই, কোনও শিকড় নেই, কোনও অর্থও প্রায় নেই। শেষমেশ আমরা এমন এক ভাষায় কথা বলবো, যেখানে শব্দ আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। আর তখন হয়তো কেউ দাঁড়িয়ে বলবে- ‘দেখুন, আমরা কত অসাম্প্রদায়িক হয়েছি! আমাদের ভাষায় এখন কোনও ইতিহাস নেই, কোনও সংস্কৃতি নেই- পুরোপুরি নিরাপদ!’ কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকে যায়- সংস্কৃতি কি শুধু শব্দে থাকে? নাকি মানুষের চেতনায়? যদি চেতনায় থাকে, তাহলে শব্দ বদলালেই কি সেটা বদলে যায়? আর যদি শব্দেই থাকে, তাহলে তো পুরো ভাষাটাই বদলাতে হবে! লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে দুরবস্থা

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে দুরবস্থা