লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের হাতে জিম্মি ১২ যুবককে উদ্ধারে ব্যবস্থা নিন
- আপলোড সময় : ১১-০৩-২০২৬ ০৮:৪১:৫১ অপরাহ্ন
- আপডেট সময় : ১২-০৩-২০২৬ ১২:৫০:৫৫ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন নতুন কিছু নয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং উন্নত জীবনের আশায় অসংখ্য তরুণ প্রতিনিয়ত জীবন বাজি রেখে বিদেশ পাড়ি জমাতে চায়। কিন্তু সেই স্বপ্নই আজ অনেক পরিবারের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ১২ তরুণের লিবিয়ায় মাফিয়া চক্রের হাতে জিম্মি হওয়ার ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে- মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার ভয়াবহ মূল্য দিচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষ। এই তরুণেরা ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিল। পরিবারগুলো জায়গা-জমি বিক্রি করে, সুদের টাকা ধার করে দালালদের হাতে তুলে দিয়েছিল লাখ লাখ টাকা। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই তারা লিবিয়ার নিষ্ঠুর মাফিয়া চক্রের হাতে বন্দি। ভিডিও কলে নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে - এই দৃশ্য শুধু হৃদয়বিদারক নয়, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতারও নগ্ন প্রতিচ্ছবি। একজন মা যখন কাঁদতে কাঁদতে বলেন- “আমি ভিক্ষা করে টাকা দেব, আমার ছেলেকে আর মারো না” তখন সেটি কেবল একটি পরিবারের আর্তনাদ নয়; এটি পুরো সমাজের বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো একটি প্রশ্ন। কেন বারবার এমন ঘটনা ঘটছে? কেন গ্রামের সাধারণ মানুষ দালালদের ফাঁদে পড়ছে? আর কেনই বা এসব দালালদের বিরুদ্ধে শক্ত হাতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় কিছু দালাল এই যুবকদের ইউরোপে পাঠানোর নামে প্রতারণা করেছে। কিন্তু ঘটনার পর তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এটি নতুন কিছু নয়। প্রায়ই দেখা যায়, মানবপাচারের ঘটনায় দালালরা গ্রেপ্তার তো দূরের কথা, অনেক সময় প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। ফলে একই চক্র বারবার নতুন শিকার খুঁজে নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য- “অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে” এখন আর মানুষের কাছে যথেষ্ট মনে হয় না। কারণ, মানবপাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধে শুধু অভিযোগের অপেক্ষা করলে চলবে না। প্রশাসনের উচিত নিজ উদ্যোগে তদন্ত শুরু করা, দালালদের গ্রেপ্তার করা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যোগাযোগ করে জিম্মি তরুণদের উদ্ধারের চেষ্টা করা। বাংলাদেশে মানবপাচার একটি পুরনো এবং সুসংগঠিত অপরাধচক্র। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা হয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে অসংখ্য বাংলাদেশি তরুণ প্রাণ হারিয়েছে, কেউ কেউ নিখোঁজ হয়েছে, আবার কেউ দাসের মতো নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তবুও এই অবৈধ যাত্রা থামছে না। কারণ একদিকে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব, অন্যদিকে দালালদের প্রতারণা - এই দুইয়ের মাঝে আটকে পড়ছে সাধারণ মানুষ। এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না। প্রয়োজন কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, জনসচেতনতা এবং নিরাপদ অভিবাসনের কার্যকর ব্যবস্থা। পাশাপাশি বিদেশে বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের উদ্ধারে সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগও জোরদার করতে হবে। জামালগঞ্জের এই ১৩ তরুণের কান্না আজ শুধু তাদের পরিবারের কান্না নয়; এটি আমাদের সমাজের মানবিকতা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের একটি কঠিন পরীক্ষা। এখন সময় এসেছে ¯পষ্টভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার - মানবপাচারকারীদের রুখে দাঁড়ানো হবে, নাকি আরও অনেক মায়ের বুক খালি হওয়ার অপেক্ষা করা হবে। রাষ্ট্র যদি এখনই কঠোর অবস্থান না নেয়, তবে এই কান্না থামবে না, বরং আরও বহু পরিবারের ঘরে একই আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হবে: “মা, আমাকে বাঁচাও....”।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়