স্টাফ রিপোর্টার::
চলতি বছর সুনামগঞ্জের হাওরে শতাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে অন্তত ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে সরকারি অর্থ অপচয় করা হয়েছে। যেখানে বাঁধের প্রয়োজন নেই, সেখানে দেওয়া হয়েছে বাঁধের বরাদ্দ। হাওরের কৃষকের ফসলরক্ষার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে গ্রামের সড়কেও। এদিকে সরকারি বরাদ্দ ভিন্নখাতে ব্যবহার ও লুটপাট করার ঘটনায় হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ক্ষোভ জানিয়েছেন। তারা এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, চলতি মওসুমে জেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি পিআইসি গঠন করা হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো কাজ চলমান রয়েছে। মন্ত্রণালয় আগামী ১৫ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দিয়েছে।
সরেজমিন ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দোয়ারাবাজার উপজেলার দোহালিয়া ইউনিয়নের বাদে গোরেশপুর গ্রামে কখনো হাওরের বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রয়োজন পড়েনি। তাই অতীতে কোনও প্রকল্প নেওয়া হয়নি। হাওরের ফসলরক্ষায়ও এই সড়ক কোনও ভূমিকা রাখেনা। কিন্তু এবার বাদে গোরেশপুরের মিজানুর রহমানকে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি করে ২২ লাখ ৫৬ হাজার টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। হাওরের বাঁধের টাকায় গ্রামের সড়ক নির্মাণের ঘটনায় অবাক হন এলাকাবাসী।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের টাকায় গ্রামের সড়ক সংস্কারে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রকল্প নেওয়া হলেও ৫-৬ ইঞ্চি করে সামান্য মাটি ফেলা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রামবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গ্রামের সাইফুল ইসলাম বলেন, এটা হাওরের কোনও বেড়িবাঁধ নয়। আমরা চেয়েছিলাম গ্রামের রাস্তাটি ভালো করে কাজ হোক। কিন্তু পিআইসি সভাপতি ৫-৬ ইঞ্চি করে মাটি ফেলেছেন। বড়জোর ১ লাখ টাকার মাটি ফেলা হয়েছে। আমরা গ্রামবাসী ইউএনওকে বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছি।
ইউপি সদস্য আলী হোসেন বলেন, আমাদের গ্রামে হাওরের বেড়িবাঁধের প্রয়োজন নেই। এবার শুনেছি বাঁধের টাকায় সড়ক সংস্কারের একটি কাজ এসেছে। গ্রামের স্বার্থে গ্রামবাসী এটি মেনে নিয়ে যথাযথভাবে কাজ শেষ করার দাবি জানালেও তাদের দাবি মানা হয়নি। শুধু এই প্রকল্পই নয় তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ সদর, দিরাই-শাল্লাসহ বিভিন্ন এলাকায় সুবিধাবাদীদের মাধ্যমে অন্তত অপ্রয়োজনীয় শতাধিক প্রকল্পে অন্তত ২০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এতে হাওরের বাঁধের টাকা ভিন্নভাবে ব্যবহার এবং লুটপাট হচ্ছে।
জামালগঞ্জের রৌয়াখাড়ায় প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকায় ৩৯নং পিআইসি দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দের আদৌ প্রয়োজন নেই। এই টাকা লুটপাট করতেই ভুয়া প্রকল্প নেওয়া হয়েছে।
গ্রামের বাসিন্দা আমিরুল হক বলেন, এখানে সামান্য একটি ভাঙ্গন আছে খালের মুখে। বড়জোর ৪০-৫০ হাজার টাকা হলেই হতো। কিন্তু এই অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে বিপুল বরাদ্দ দিয়ে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের বরাদ্দ লোপাট করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরা জানান, চলতি বছর প্রতিটি উপজেলায় অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের মধ্যে বাড়ির রাস্তা, গ্রামের রাস্তা, ব্যক্তিগত রাস্তা উন্নয়নের নামে কৃষকের ফসলরক্ষা বাঁধের টাকায় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এটা কাবিটা নীতিমালা বিরোধী এবং দুর্নীতি ও অনিয়মের মধ্যে পড়ে। আমরা আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো জেলার অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের ডাটা উন্মোচন করবো।
এদিকে হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, অতীতের মতো গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সুনামগঞ্জে হাওরের ফসলরক্ষা বরাদ্দ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প নিয়ে লুটপাটের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা হয়েছে। জেলা কাবিটা কমিটি উপজেলাকে বাধ্য করে এসব কমিটি অনুমোদন দিতে বলেছে। এতে সরকারি কোটি কোটি টাকা লোপাট হবে। কৃষকের বরাদ্দ অন্যখাতে নিয়ে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।
দোয়ারাবাজার উপজেলার সাবস্টেশন অফিসার সাদ্দাম হোসেন বলেন, আমার উপজেলায় কাজ কম। বাদে গোরেশপুর গ্রামে অতীতে হাওরের কোনও কাজ হয়নি স্বীকার করে তিনি বলেন, এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো বলতে পারবেন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
হাওরের বাঁধের টাকায় ব্যক্তিগত, গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ!
অপ্রয়োজনীয় শতাধিক প্রকল্পে অন্তত ২০ কোটি টাকার অপচয়
- আপলোড সময় : ১০-০৩-২০২৬ ০২:৪০:৩৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১০-০৩-২০২৬ ০২:৪২:৪১ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ