জাতীয় সংসদ নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হোক
- আপলোড সময় : ০৫-০২-২০২৬ ০৯:০৩:৩২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৫-০২-২০২৬ ০৯:০৩:৩২ পূর্বাহ্ন
মব সহিংসতা আজ বাংলাদেশের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের নাম। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র - সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়ছে। এমন বাস্তবতায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের মন্তব্য- “মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে” - কেবল একটি আশঙ্কা নয়, বরং সময়োপযোগী সতর্কবার্তা।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সামনে রেখে যখন একটি শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশা করা হচ্ছে, তখন ক্রমবর্ধমান মব সন্ত্রাস সেই প্রত্যাশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মব সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়ের প্রতিফলন। ড. ইফতেখারুজ্জামানের বক্তব্য অনুযায়ী, এই সহিংসতার শিকড় রাষ্ট্রের ভেতরেই, এমনকি প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয় পর্যন্ত এর উদাহরণ রয়েছে। এই বাস্তবতা রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
রাষ্ট্র যদি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতিকে প্রশ্রয় দেয় কিংবা তা দমনে ব্যর্থ হয়, তবে তার প্রভাব অবশ্যম্ভাবীভাবে নির্বাচনী পরিবেশেও পড়বে। নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের একটি দিন নয়; এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে জড়িত নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক আস্থা। মব সহিংসতার আশঙ্কা শুধু নির্বাচনের দিন নয়, নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও অস্থিরতা তৈরি করতে পারে - এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, সহিংসতা উপেক্ষা করলে তার মাশুল দিতে হয় রাষ্ট্রকেই। অথচ সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার প্রবণতা এখনো স্পষ্ট নয়। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে সহিংসতার দায় এড়ানো যাবে না।
আরও উদ্বেগজনক হলো, জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী জবাবদিহির প্রক্রিয়া। প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের বদলে ঢালাও মামলায় সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীকে হয়রানির অভিযোগ গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। বিচার আর প্রতিশোধের সীমারেখা মুছে গেলে ন্যায়বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতা ভেঙে পড়ে। এতে করে কর্তৃত্ববাদের প্রকৃত দোসররা আড়ালেই থেকে যায়।
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে সম্প্রচার ও গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশের মতো উদ্যোগও নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। স্বাধীন ও নিরাপদ সাংবাদিকতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন কল্পনাই করা যায় না। অথচ মিডিয়াকে উপেক্ষা ও ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ- যেমন বিচারক নিয়োগ কমিটি বা স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়, আশার আলো দেখালেও এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও বাস্তব প্রয়োগের ওপর। বিচারব্যবস্থার ভেতরে দলীয়করণ রয়ে গেলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না।
গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল করতে হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার অপরিহার্য। মব সহিংসতা দমন, প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা - এই তিনটি বিষয়ই একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পূর্বশর্ত। রাষ্ট্র যদি এসব দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়, তবে প্রশ্ন উঠবেই- নির্বাচনের ফল যতই ঘোষণা করা হোক না কেন, তা কি জনগণের আস্থার প্রতিফলন হবে?
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়