শাল্লায় ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ
অনেক বাঁধে মাটিই পড়েনি, প্রশাসনের দাবি ৩০% কাজ শেষ
- আপলোড সময় : ২৮-০১-২০২৬ ০৮:১৯:১৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৮-০১-২০২৬ ০৮:১৯:১৯ পূর্বাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি ::
সুনামগঞ্জের সবচেয়ে দুর্গম ও অবহেলিত উপজেলা শাল্লায় হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধের কাজে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা প্রশাসন ও মনিটরিং কমিটি কাগজের কলমে কাজের অগ্রগতি ৩০ শতাংশ দাবি করলেও সরজমিনে এর কোনো সত্যতা মেলেনি। বরং প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপ, বারবার পিআইসি রদবদল এবং প্রশাসনিক খামখেয়ালিপনায় এখন হুমকিতে পড়েছে হাজার হাজার কৃষকের স্বপ্নের বোরো ফসল।
শাল্লার গুরুত্বপূর্ণ উদগলবিল, ভান্ডাবিল ও ছায়ার হাওর ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ বাঁধে এখন পর্যন্ত কাজের কোনো চিহ্ন নেই। অথচ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মনিটরিং কমিটির সভাপতি পিয়াস চন্দ্র দাস দাবি করছেন, ৩০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের এই তথ্য কেবল আইওয়াশ। অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র ঘাস পরিষ্কার বা যৎসামান্য মাটি ফেলে বিশাল অগ্রগতি দেখানো হচ্ছে, যা মূলত অর্থ আত্মসাতের একটি কৌশল।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৭১, ১১৬ ও ১১৮ নং পিআইসিতে চলছে নজিরবিহীন নাটকীয়তা। ৭১নং পিআইসিতে প্রসেনজিৎ ও অসীম দাস ওয়ার্ক অর্ডার পেয়ে কাজ শুরু করলেও রহস্যজনক কারণে উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটি কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। এর পেছনে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের চিঠির দোহাই দেওয়া হলেও সাধারণ কৃষকদের ধারণা, নেপথ্যে কাজ করছে বড় কোনো সিন্ডিকেট যারা পছন্দের লোক বসাতে মরিয়া।
একই চিত্র ১১৬নং পিআইসিতেও। সেখানে কাজ শুরু হওয়ার পর একটি প্রভাবশালী চক্র বলপূর্বক নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, নীতিমালার তোয়াক্কা না করে ওই চক্রের একজনকে সদস্য সচিব করার জন্য খোদ উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটিই তোড়জোড় চালাচ্ছে। এই রশি টানাটানির বলি হচ্ছে কৃষকের ফসল।
চলতি বছর শাল্লায় ১২৭টি প্রকল্পে ১৩ কোটি ৯১ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হলেও রহস্যজনকভাবে তা বেড়ে বর্তমানে ২৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। কাজের মান না বাড়িয়ে কেন বরাদ্দ দ্বিগুণেরও বেশি করা হলো, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সচেতনমহলের মতে, এই বিপুল পরিমাণ টাকা লুটপাটের উদ্দেশ্যেই প্রভাবশালীরা বারবার কমিটিতে রদবদল করছে এবং নতুন নতুন প্রকল্প যুক্ত করছে।
১১৮নং পিআইসিতে গিয়ে কোনো সাইনবোর্ড বা কাজের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। পিআইসির সভাপতি সুকুমার বৈষ্ণব ও সচিব বসন্ত কুমার বৈষ্ণব অভিযোগ করেন, জমির ম্যাপ ও পর্চা নিয়ে আমরা প্রস্তুত থাকলেও সেকশন অফিসার (এসও) সীমানা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন না। উল্টো স্বার্থান্বেষীমহল মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে আমাদের হয়রানি করছে। এছাড়া ৮৮, ১০৬, ১০৯ ও ১১২ নং পিআইসিসহ অসংখ্য প্রকল্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, বাঁধের ধারে সংশ্লিষ্ট সদস্যদের কোনো জমি নেই - যা সরাসরি পিআইসি নীতিমালার লঙ্ঘন।
শাল্লা উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী (এসও) ওবায়দুল হক বলেন, আমরা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে কাজ তদারকি করছি। পিআইসি গঠন বা রদবদল সংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক জটিলতা ও স্থানীয় দ্বন্দ্বের কারণে কয়েকটি স্থানে কাজ শুরু করতে সামান্য দেরি হয়েছে। তবে আমরা চেষ্টা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সীমানা নির্ধারণসহ যাবতীয় কারিগরি সমস্যা সমাধান করতে। বরাদ্দের বিষয়টি কাজের পরিধি ও প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস ১২৭টি পিআইসি অনুমোদনের কথা স্বীকার করে বলেন, কিছু বিয়োজন রয়েছে যা খুব শীঘ্রই ঠিক করা হবে। তবে ভরা মৌসুমে কেন কাজ বন্ধ রেখে কমিটি নিয়ে রাজনীতি চলছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
এদিকে, বাঁধের কাজে ঢিলেমির জন্য হাওরপাড়ের কৃষকদের চোখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ। কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে দ্রুত বাঁধ নির্মাণ স¤পন্ন করা হোক।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

বিশেষ প্রতিনিধি