অক্ষত বাঁধে অগভীর ক্লোজার দেখিয়ে বরাদ্দ বন্ধ করুন
- আপলোড সময় : ২২-০১-২০২৬ ০৯:২৫:৪১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২২-০১-২০২৬ ০৯:২৫:৪১ পূর্বাহ্ন
হাওরাঞ্চলের কৃষকের একমাত্র অবলম্বন বোরো ফসল। সেই ফসল রক্ষার নামে প্রতি বছর যে ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা যদি দুর্নীতি ও বরাদ্দ তছরুপের উৎসে পরিণত হয় - তবে সেটি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বার্থের ওপরও সরাসরি আঘাত।
জামালগঞ্জ উপজেলার জোয়ালভাঙা হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। যেখানে গত বছর বাঁধের মাটি অক্ষত থাকায় কোনো প্রকল্পই ছিল না, সেখানে চলতি বছরে একটি অগভীর ক্লোজার দেখিয়ে প্রায় ১৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সরেজমিনে দেখা বাস্তব অবস্থার সঙ্গে এই বরাদ্দের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বরং অক্ষত বাঁধের ওপর সামান্য মাটি চাপা দিয়ে বড় প্রকল্প দেখানোর প্রবণতা স্পষ্টভাবে চোখে পড়ছে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, জামালগঞ্জ উপজেলার ছয়টি হাওরের ৪১টি পিআইসির অনেক প্রকল্পেই একই ধরনের অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ বছর যেখানে মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকার বেশি, সেখানে প্রকৃত প্রয়োজন, পূর্ববর্তী বছরের কাজের অবস্থা এবং বাস্তব মাঠপর্যায়ের চিত্র - সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের অভিযোগ আরও গুরুতর। তাদের দাবি অনুযায়ী, দীর্ঘদিন একই স্থানে কর্মরত পাউবো শাখা কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠতা ও যোগসাজশের মাধ্যমে পিআইসি বণ্টন করা হয়েছে। এতে যোগ্য ও প্রকৃত স্থানীয় অংশীজনরা বঞ্চিত হয়েছেন, আর সুযোগ পেয়েছে ‘রফাদফা’য় থাকা একটি গোষ্ঠী। যদি এসব অভিযোগ সত্য হয়, তবে তা কেবল প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, এটি একটি সুসংগঠিত দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে পাউবো শাখা কর্মকর্তার বক্তব্যে বলা হয়েছে, এবার প্রাক্কলন পরিবর্তন হয়েছে, বাঁধের উচ্চতা বাড়ানো হবে, জিওটেক্স ব্যবহার হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো - এই পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কি মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান? অগভীর ক্লোজারকে কেন্দ্র করে এত বড় ব্যয়ের যৌক্তিকতা কি কোনো নিরপেক্ষ কারিগরি মূল্যায়নে প্রমাণিত? নাকি কাগজে-কলমের ইস্টিমেটই বাস্তবতাকে ছাপিয়ে গেছে?
হাওরাঞ্চলে প্রতিবছর বাঁধ ভাঙার দায় চাপানো হয় প্রকৃতি ও অকাল বন্যার ওপর। কিন্তু প্রকৃত দায় যদি থাকে অব্যবস্থাপনা, অতিরিক্ত বরাদ্দ ও তছরুপের মধ্যে - তাহলে তার দায় কার? অক্ষত বাঁধে অযৌক্তিক প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি অর্থ অপচয় শুধু রাষ্ট্রের ক্ষতিই করে না, ভবিষ্যতে প্রকৃত ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলোর জন্য বরাদ্দ সংকটও তৈরি করে।
এই প্রেক্ষাপটে জোয়ালভাঙা হাওরসহ জামালগঞ্জ উপজেলার সব ফসল রক্ষা বাঁধ প্রকল্পের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। প্রকৃত কাজ, মাটির পরিমাণ, ক্লোজারের গভীরতা ও বরাদ্দ - সবকিছুর মিল যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে পিআইসি গঠনে স্বচ্ছতা, স্থানীয় কৃষকের অংশগ্রহণ এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা না গেলে হাওর রক্ষা প্রকল্প বারবারই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। হাওর বাঁচাতে হলে আগে দরকার হাওর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা। না হলে ফসল রক্ষার নামে এই ‘বরাদ্দের বাঁধ’ই একদিন হাওরাঞ্চলের কৃষকের আস্থা ভেঙে দেবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়