মোহাম্মদ আব্দুল হক ::>
বিশ্বজুড়ে আছে মানুষের এক জাত। এই মানুষের আছে নানান রকম সংস্কৃতি। মানুষ মূলত তার সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এবং লালিত সংস্কৃতি আঁকড়ে ধরে একেকটি পরিচয়ে পরিচিত হয়ে একেকটি আলাদা জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে স্বাতন্ত্র্য অসাধারণত্ব নিয়ে প্রকাশিত হয়ে গৌরবের ইতিহাস ঘোষণা করে জাতির ঐতিহ্য সমুন্নত রেখে চলে। এই বিশ্বে হাজার বছরের গৌরবের ইতিহাস ঐতিহ্যের এক জাতি হচ্ছে বাঙালি সংস্কৃতির বাঙালি জাতি। মনে রাখতে হবে, শতশত বছরের পথ পাড়ি দিয়ে নানান রকম আচার-আচরণ এবং উৎসব আয়োজন নিয়ে গড়ে উঠা সংস্কৃতির গায়ে নতুন নতুন পালক সংযোজিত হয়ে সংস্কৃতি আরও মজবুত হয় এবং এভাবেই সংস্কৃতি সম্প্রসারিত হয়। সংস্কৃতি কখনও কখনও দেশভিত্তিক হলেও কখনও কখনও ভূরাজনৈতিক প্রভাবের কারণে যুদ্ধে লড়ে এবং নানান কৌশলগত চুক্তি করে একসময়ের বৃহৎ ভূখ-ে আলাদা ভৌগোলিক সীমারেখা টেনে দেশ আলাদা হলেও সংস্কৃতি প্রায় একই থেকে যায়। তখন আমরা ভিন্ন ভিন্ন দেশের একই রকম সংস্কৃতিকে আঞ্চলিক সংস্কৃতির পরিম-লে দেখি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের পশ্চিম বঙ্গের এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতির অনেক কিছুতেই মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সেজন্যে আমরা যখন বাঙালি সংস্কৃতির প্রসঙ্গে আলোচনা করি বা উৎসব আয়োজন করি তখন অনেক বিষয়ে শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ থাকি না। তখন আমরা দেখি ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বাঙালি সংস্কৃতির ধারকগণও আনুষ্ঠানিকভাবে তা পালন করে। আরেকটা উদাহরণ দেয়া যায়, আমাদের ভারত উপমহাদেশের যেমন কিছু সংস্কৃতি আছে প্রায় কাছাকাছি, যেমন - ‘বৈশাখী মেলা’। আবার জার্মান, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, পোল্যান্ড ইত্যাদি দেশের ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি যেমন আছে তেমনি সারা ইউরোপের কিছু সংস্কৃতিতে রয়েছে যথেষ্ট মিল যেখানে ইউরোপের সকল দেশের জনগণ মিলে যায়। এভাবেই আমরা ভৌগোলিক বাস্তবতা মেনে আলাদা আলাদা দেশের যেমন তেমনি আমরা আলাদা আলাদা সংস্কৃতির মানুষ। আমাদের আলোচনার বিষয় ‘বাঙালি সংস্কৃতি বাঙালির শিকড়’। আমরা যারা এই আলোচনা পাঠে অংশ নিয়েছি তারা পাঠান্তে ঠিকই উপলব্ধি করতে পারবো একটা সত্য। বাঙালি সংস্কৃতিই আমাদের ঐক্যের মূল ভিত্তি। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ যে বছরের ছয়টি ঋতুতে আবর্তিত তা এখন আর কাউকে বলে দিতে হয় না। প্রায় ১৪৭৫৭০ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বাংলাদেশ গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত ঋতুতে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফালগুন ও চৈত্র এই বারোমাস নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্য নিয়ে চলে। এখানে প্রতি দুই মাসে একটা ঋতু ধরা হয়েছে। বৈশাখ মাস হচ্ছে একই সাথে বাংলা সনের প্রথম মাস আবার গ্রীষ্ম ঋতুরও প্রথম মাস। প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী এই মাসে বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ফসল তোলা শুরু হয়। তাই বৈশাখ মাস ঘিরে বাঙালির মনে যে আনন্দ জাগে তার তুলনা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। এখানে বৈশাখ মাসে ‘বৈশাখী মেলা’ হয় যা বাঙালির প্রাণের মেলা। বাঙালি হিসেবে আমাদের এমন কিছু আছে যা একান্তই আমাদের নিজস্ব - পহেলা বৈশাখের বৈশাখী মেলা সর্বাগ্রে স্মরণীয়। যেখানে আন্তর্জাতিক পরিম-লে ইংলিশ ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে অর্থনৈতিক প্রায় সবকিছুই চলে সেখানে কিভাবে বৈশাখ মাস এবং বাংলা সন আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে তা জানা দরকার। একসময় বৃহৎ বাংলায় মোগল সা¤্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত ছিলো। তখন কৃষক প্রজাদের নিকট থেকে খাজনা আদায় করা হতো হিজরি সন অনুসরণ করে। কিন্তু হিজরি আরবি সন চন্দ্র মাসের হিসেবে চলে। অথচ বাংলায় ফসল উৎপাদিত হয় তার নিজস্ব আবহাওয়া ও জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী। এতে করে হিজরি সন অনুসরণ করে খাজনা দেয়া প্রজাদের পক্ষে কঠিন ছিল। সেজন্যে খাজনা ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে মোগল স¤্রাট আকবর চির বাঙালির বাংলায় বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। ওই সময়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহ উল্লাহ সিরাজি স¤্রাট আকবরের আদেশ অনুযায়ী প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনয়ন করেন তৎকালীন সৌর সন ও আরবি সনের ভিত্তিতে। এভাবেই আমরা বাংলা সন পাই। জানা যায়, ১৫৮৪ খ্রীষ্টিয় সালের ১০ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে প্রকৃত অর্থে বাংলা সনের গণনা কার্যকর করা হয় স¤্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহনের সময় থেকে। সেটা ছিল ১৫৫৬ খ্রীষ্টিয় সালের ৫ নভেম্বর। আমাদের এ সময়ের বাংলা বর্ষ তৎকালে অন্য নামে পরিচিত ছিল। প্রথমে তা ফসলী সন আর পরবর্তীতে তা বঙ্গাব্দ ও বাংলা বর্ষ নাম ধারণ করে। আমাদের বৈশাখী উৎসব মূলত স¤্রাট আকবরের সময় থেকেই ভিন্ন চেহারায় হয়ে আসছে। সেসময় নিয়ম ছিলো চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে কৃষক প্রজাদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে হবে। তারপর নতুন বছরের প্রথম দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমি-মালিকরা নিজ নিজ গ্রামের মানুষকে মিষ্টান্ন খাইয়ে সমাদর করতেন। এমন পরিবেশে বাংলার কৃষকেরা আনন্দ উপভোগ করতেন। সমাজের মানুষেরাও এ উপলক্ষে বিভিন্ন রকম উৎসব আয়োজন করতো। ওইসব উৎসবই কালের ¯্রােতে শত শত বছরের পথ পাড়ি দিয়ে একটা ভিত্তি পেয়ে হয়েছে বাঙালির খুশির সামাজিক অনুষ্ঠান। এভাবেই বাংলায় বসন্ত উৎসবসহ বারোমাস ব্যাপী আছে উৎসব। কোনোটা বড়ো পরিসরে আবার কোনোটা ছোটো পরিসরে। একসময় আধুনিক জ্ঞান চর্চা ও শিক্ষায় অনগ্রসর বাঙালি জাতির মধ্যে ধীরে ধীরে পুঁথিপাঠ, ছড়া, কবিতা, গল্প ইত্যাদি সাহিত্যচর্চা বাড়তে থাকে এবং সাহিত্য ও গবেষণা বিষয়ক বিভিন্ন গ্রন্থ প্রকাশিত হতে থাকে। সেই সাথে হরেক রকম মেলার সাথে একসময় যোগ হয় বইমেলা। প্রথম প্রথম বইমেলা বা গ্রন্থমেলা ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও বহু বছর ধরে তা এখন সারা দেশের সব শহরে হয়। আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের দিকে গুরুত্ব দিয়ে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে ঢাকায় যে গ্রন্থমেলা হয় তা আমাদের সংস্কৃতির সাথে অঙ্গাঙ্গী মিশে গেছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, বাংলাদেশের বাঙালি জাতির যতো গৌরবের অর্জন আছে তার ভিত্তিমূল হচ্ছে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি এবং ১৯৫২ খ্রীষ্টিয় সালের ভাষা আন্দোলন। এভাবেই আমরা বারবার আমাদের সংস্কৃতিকে ধারণ করে আমাদের ঐক্যের শক্তিতে বিজয়ী হয়ে যাই। আমাদের আছে বৈশাখী উৎসব, বসন্ত উৎসব, নানান ঋতুতে নানান রকম পিঠা উৎসব, বর্ষায় নৌকা বাইচ, পুতুল নাচ, আছে হাডুডু খেলা এবং বহু রকম মেলা। এসব কিছুই আমাদের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে হবে। আমাদের আছে একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস যা একান্তই আমাদের নিজস্ব যা আমাদের বহু শতাব্দীর ঐতিহ্যের সাথে সংস্কৃতির সাথে মিশে হয়েছে একাকার। এগুলোর মধ্যে আমরা আমাদের শিকড়ের সন্ধান পাই। আমরা বাঙালি হিসেবে নিজেদের সংস্কৃতি ঘেঁষে থাকলে যে কোনো দুর্যোগে পথ হারাবো না। প্রত্যেক জাতি তার সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচে সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে। সাংস্কৃতিক ঐক্য যতো মজবুত হবে আমরা ততোই শক্তিশালী হবো। আমরা আমাদের সংস্কৃতির শিকড়ের সন্ধান যতো করবো ততোই সমৃদ্ধ হবো। এখানে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষজন এবং হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষজন সকলে সহাবস্থানে বসবাস করে এবং নিজ নিজ ধর্ম পালন করেই বাঙালি হয়ে চলছে। আমরা বাংলাদেশের বহুধর্মের মানুষ বাংলাদেশের একান্ত নিজস্ব সংস্কৃতি লালন করে এবং পালন করে আমাদের শিকড়ের গভীরতা উপলব্ধি করি। সারা বিশ্বে আমাদের ঐক্যবদ্ধ এক সাংস্কৃতিক পরিচয়- আমরা বাঙালি। বাঙালি জাতির ঐক্যের শিকড় প্রোথিত রয়েছে বাঙালি সংস্কৃতিতে।
[লেখক মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
বাঙালি সংস্কৃতি বাঙালির শিকড়
- আপলোড সময় : ১৯-০১-২০২৬ ০৯:৫৫:৫৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৯-০১-২০২৬ ১০:১১:০০ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক