হাম্মাদ আহমদ, মুহাদ্দিসে গাজিনগরী::>
এবারের নির্বাচনে জমিয়ত শতাধিক আসনে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। ব্যাপক সাড়া পাওয়া গিয়েছিল সর্বত্র। আমিও তার ব্যতিক্রম নই।
সুনামগঞ্জ-৩ আসনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে আমার নাম ঘোষিত হওয়ার পর দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিই। দেশে এসে যা দেখেছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দল-মত নির্বিশেষে মানুষের ভালোবাসা, ঐতিহাসিক শোডাউন, সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ - সব মিলিয়ে এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা। কেউ প্রকাশ্যে নির্বাচনী ব্যয় বহনের অঙ্গীকার করেছেন, কেউ চোখের জলে দোয়া করেছেন। একজন আলেম প্রার্থীর জন্য মানুষ কাঁদছে-এ দৃশ্য সত্যিই বিস্ময়কর। সকালে বের হতাম মানুষের কাছে, ফিরতাম গভীর রাতে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই ভালোবাসা আমি সরজমিনে দেখেছি। আমার বিশ্বাস, প্রায় সব আসনেই কমবেশি একই চিত্র ছিল। জোটবদ্ধতা বনাম সীমাবদ্ধতা : তবে জোটবদ্ধ নির্বাচনের বাস্তবতায় জমিয়তকে সীমিত আসনে প্রার্থী দিতে হয়েছে। যাঁরা মনোনীত হয়েছেন, তাঁরা যোগ্য, অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ। দলীয় সিদ্ধান্ত এখানেই চূড়ান্ত এবং আমরা সেই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। জমিয়তের প্রতি বিএনপির করণীয় : আজ যখন দেশকে কৃত্রিমভাবে ইসলামী ও অনৈসলামী দুই ভাগে বিভক্ত করার অপচেষ্টা চলছে, তখন বিএনপি জমিয়তকে জোটে রেখে প্রমাণ করেছে-তারা ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তির পাশে আছে। এখন দায়িত্ব হলো- জোটের শরিকদের বিজয় নিশ্চিত করা। বিদ্রোহী প্রার্থীদের বুঝানো, ত্যাগের মূল্যায়নের আশ্বাস দেওয়া এবং আন্তরিকতা দেখানো। কেবল বহিষ্কার সমস্যার সমাধান নয়। ভোটের প্রার্থীরা পরাজিত হলে, সেই দায় ইতিহাস বিএনপির কাঁধেই চাপাবে। শহীদ জিয়ার আদর্শে বিশ্বাসী হলে মনে রাখতে হবে-ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে আদর্শ বড়। মনোনয়নবঞ্চিতদের করণীয় : যাঁরা জোটের কারণে মনোনয়ন পাননি, তাঁদের ভূমিকা হওয়া উচিত আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা.-এর মতো। উচ্চারণের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি মুরুব্বিদের সম্মানে নীরব থেকেছেন। এটিই আদব, এটিই শিষ্টাচার।ভদ্রতা, সৌজন্য ও দলীয় শৃঙ্খলা আমাদের শক্তি-দুর্বলতা নয়। কেউ যদি এটিকে দুর্বলতা ভাবে, তবে সে মারাত্মক ভুল করবে। কেননা আমরা তো জমিয়ত করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। আর খেজুর গাছতো মুমিনের একটি নমুনা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- তুমি কি লক্ষ্য করোনি, আল্লাহ কিভাবে উপমা পেশ করেন? একটি পবিত্র বাক্য হলো একটি পবিত্র বৃক্ষের ন্যায়, যার শিকড় মাটির গভীরে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত এবং যার শাখা-প্রশাখা আকাশে বিস্তৃত। -সূরা ইবরাহিম। এই আয়াতের বাস্তব ব্যাখ্যা যেন আমরা পাই প্রিয় নবী সাল্লাাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে। আব্দুল্লাহ ইবন উমর রা. বর্ণনা করেন- একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করলেন, “একটি গাছ আছে, যার দৃষ্টান্ত একজন মুমিনের মতো-বল তো সেটি কোন গাছ?” ইবনে উমর রা. বলেন, আমার অন্তরে তখন দৃঢ়ভাবে উদিত হয়েছিল সে গাছটি হলো খেজুর গাছ। কিন্তু উপস্থিত বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবিদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধে আমি মুখ খুলিনি। পরে রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজেই বলে দিলেন- “সে গাছটি হলো খেজুর গাছ।” -সহিহ বুখারি ও মুসলিম। কেন সঠিক মুমিন খেজুর গাছের মতো? উপকারিতার বিচারে একজন সত্যিকারের মুমিনের সঙ্গে খেজুর গাছের তুলনা নিঃসন্দেহে গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। খেজুর গাছ যেমন তার প্রতিটি অংশ দিয়ে উপকার করে-ডাল, পাতা, কা-, ছায়া-ঠিক তেমনি একজন মুমিনও নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন মানুষের কল্যাণে। তিনি পরিবারে শান্তির প্রতীক, সমাজে ন্যায় ও মানবিকতার বাহক, রাষ্ট্রে দায়িত্বশীল নাগরিক-এক কথায় গোটা সৃষ্টিকুলের জন্য কল্যাণকর। মুমিন কেবল নিজের জন্য বাঁচেন না: তিনি বাঁচেন মানুষের জন্য, আদর্শের জন্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কুরআনের ভাষায় ‘পবিত্র বৃক্ষ’ কোনটি? আলহামদুলিল্লাহ, খেজুর গাছ-যা জমিয়তের দলীয় প্রতীক-মূলত ন্যায়পরায়ণতা, জনকল্যাণ, বহুমুখী উপকারিতা এবং ইনসাফভিত্তিক নৈত্তিক নেতৃত্বের প্রতীক। কুরআনের ভাষায় যে গাছকে ‘শাজারাতুন ত্বাইয়্যিবা’ বলা হয়েছে,তার বাস্তব রূপ যেন এই খেজুর গাছ। খেজুর গাছ কেবল একটি প্রতীক নয়-এটি শাজারাতুল ঈমান, ঈমানের বৃক্ষ। এটি মাসালুল মুমিন-মুমিনের বাস্তব দৃষ্টান্ত। জনকল্যাণ, মানবতার মুক্তি, দক্ষ নেতৃত্ব এবং সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি। জমিয়তের শিকড় কেন এত মজবুত? যেভাবে খেজুর গাছ শক্ত শিকড়ে ভর করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক তেমনি জমিয়তও দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহওয়ালাদের ইনকিলাবি চিন্তা-চেতনার ওপর। জন্মলগ্ন থেকেই এই সংগঠন মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে আশা ও অনুপ্রেরণার প্রদীপ জ্বলিবে আসছে। আকাবিরের আমানত হিসেবে, রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবে শতবর্ষ অতিক্রম করেও জমিয়ত আজও আপন মহিমায় দৃঢ়, অবিচল, আত্মমর্যাদাশীল। ইনশাআল্লাহ, ভবিষ্যতেও এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। পরিশেষে, দল-মত নির্বিশেষে যাঁরা জমিয়তের জন্য আন্তরিকভাবে মেহনত করেছেন তাঁদের প্রতি রইল গভীর কৃতজ্ঞতা। সবে মিলে করি কাজ, হার-জিতে নাহি লাজ। আল্লাহ তাআলা সবাইকে আন্তরিকতা, ঐকা ও তাওফিক দান করুন। আমিন।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
জমিয়ত ও জোটবদ্ধ নির্বাচন : একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা
- আপলোড সময় : ১৪-০১-২০২৬ ০৭:৫৪:২৯ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৪-০১-২০২৬ ০৭:৫৫:৩৭ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক