শুদ্ধাচার হোক নতুন বছরের অঙ্গীকার
মোহাম্মদ আব্দুল হক
নতুন বছরের শুভেচ্ছা রইলো প্রিয় পাঠক ও প্রিয় পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালের প্রতি। যে বছর চলে গেছে তা-তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই একটু পিছনে ফিরে দেখে আসতে পারি, আমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে কতোটা ভালো করেছি বা কোথায় ভুল করেছি। এখন সময়, আসুন আমরা নিজে নিজেকে প্রশ্ন করি। আচ্ছা, মানুষ হিসেবে আমরা কি সদাচারী ছিলাম বিগত বছরগুলোতে? সকল প্রাণীর চেয়ে উন্নত মস্তিষ্ক পেয়ে এবং সেই সাথে জ্ঞান চর্চা করে অনেক দূর এগিয়ে আমরা কি সদাচারী মানুষ হতে পেরেছি? মানুষ হিসেবে অবশ্যই ভাবতে হবে এবং এখনই সময়।
সদাচার বললে কি বোঝায় তা এখনকার লেখাপড়া জানা মানুষের জানা আছে। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেনো, আমরা সকলেই এখনও জানি না, ঠিক সদাচারী মানুষ কাকে বলে। কথায়, হাঁটায় ও শরীরের ভঙ্গিমায় সুন্দর ফুটে উঠে যাদের মাধ্যমে, তাদেরকে আমরা বলি সদাচারী মানুষ। বাংলাদেশ ও অন্যান্য অনেক দেশে রাষ্ট্র প্রধান বা সরকার প্রধান কিংবা সরকারের মন্ত্রী বা বহু মানুষের নেতৃত্ব দানকারী নেতাদের বক্তব্যে কখনো কখনো সমাজে তোলপাড় চলে এবং বিশৃঙ্খলা বাধে। সমাজের বোধশক্তিহীন মানুষেরা হয়তো কিছুই বুঝতে পারেন না। কিন্তু; বোধশক্তি স¤পন্ন মানুষেরা দায়িত্বশীল মানুষের মুখের প্রকাশিত অশালীন কথায় এবং প্রদর্শিত অশোভন মুখ ভঙ্গিমায় ঠিকই লজ্জিত হন।
একটি দেশের মন্ত্রী পর্যায়ের মানুষ বা বড়ো কোনো দলের নেতা মূলত সেই রাষ্ট্রেরই প্রতিনিধিত্ব করেন। সেদিক থেকে তারা দায়িত্বশীল এবং অবশ্যই সমাজ ও দেশের জনগণের কাছে তারা দায়বদ্ধ। আমাদেরকে মনে রাখতে হয়, কোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে থেকে কোনো মানুষ যে কথা বলে, তা ওই প্রতিষ্ঠানের কথা হয়ে যায়। একইভাবে শুধু রাজনৈতিক দল নয় বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং একটি পরিবারের একজন বয়সী মানুষের কথা ওই পরিবারের কথা হয়ে যায়। তাই রাজনৈতিক দল ও পরিবারের বড়ো বা নেতৃস্থানীয় মানুষগুলোকে কথা বলায় সচেতন থাকতে হয়। কারণ, পরিবার হচ্ছে ছোটো ও বড়ো সকলের অন্যতম একটি শিক্ষালয়।
কোনো পরিবারের একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের কথা ও আচরণ, ওই পরিবারের পরিচয় তুলে ধরতে সহায়ক, তা মনে রাখতে হবে। তাই পরিবারের পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে কথা বলার সময় বা আনন্দ উৎসব পালন করার সময় অনেকটা সচেতন থাকতে হয়। কারণ, এখান থেকে ওই পরিবারের ছোটোরা ও অন্যান্যরা ভালো বা মন্দ গ্রহণ বা বর্জন করতে শিখবে। বাসার বসার ঘর বা বৈঠকখানায় দামি সোফা বা চেয়ার সাজিয়ে সৌন্দর্য্য বর্ধনের পাশাপাশি আমাদেরকে বৈঠকখানায় বা ড্রইংরুমে বসে সুন্দর ও শুদ্ধ উপস্থাপনায় সৌন্দর্য প্রকাশের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। একইভাবে যারা সারাদেশের নেতৃত্ব দিতে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে আছেন, তাদেরকেও সেভাবেই প্রস্তুতি নিতে হবে এবং সেভাবেই নিজেদের অনুসারী জনগণের কাছে দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে কথা বলতে হবে এবং আচরণ করতে হবে।
একজন মানুষ তার কথা বলার ভঙ্গিমায় সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে সমাজে সুন্দরের চর্চা করতে পারেন। আমি মনে করি, আমাদের পরিবার, মহল্লা, সমাজ, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, সংসদ, মন্ত্রিপরিষদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সকল ধরনের সামাজিক, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বশীল সকলকেই চলার সময় ও কথা বলার সময় বাচনভঙ্গি ও অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শনে শালীনতা বজায় রাখতে হবে। এখান থেকেই অন্যরা শিখবে। অতএব, মনে রাখতে হবে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল একজন মানুষ পরিবার ও সমাজে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। শিক্ষকের ভুলে শিক্ষার্থী দ্রুত গতিতে ভুল শিখবে, কারণ, মন্দের প্রভাব তাড়াতাড়ি ছড়ায় এবং সময় বেশি লাগলেও শিক্ষকের ভালো দেখতে দেখতে ও শুনতে শুনতে এক সময় শিক্ষার্থী ভালোটা গ্রহণ করবে।
একটি সমাজকে আলোকিত ও উন্নত করতে চাইলে, অবশ্যই বিভিন্ন পরিবার, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে থেকে পূর্ণ বয়স্ক মানুষকে কথায় ও আচার - ব্যবহার প্রদর্শনে সদাচারী হতে সর্বোচ্চ সচেতনতা দেখানো প্রয়োজন। কারণ, দায়িত্বশীলরা অন্যদের কাছে অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় হয়ে থাকেন। আমাদের এদেশীয় অধিকাংশ পরিবারের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, গ্রামের ও শহরের এমন দুয়েকজন মানুষ আছেন, যাদেরকে পরিবারের অন্য অনেক সদস্যরা হয় টাকার লোভে না-হয় দাপুটে শক্তির ভয়ে মেনে চলেন বা তাদেরকে কথায় কথায় জ্বি জ্বি বলে সমীহ করেন। ওই নেতৃত্বের দুয়েকজন মানুষ যদি তাদের কথায় ও কাজে সত্য ও সুন্দর প্রকাশ করেন এবং শুদ্ধতার চর্চা করেন, তাহলে নিশ্চয়ই তাদের অনুসারীরাও সত্য পথ পাবে এবং শুদ্ধস্বর ও শুদ্ধাচার চর্চায় মনোযোগী হবে। তখন নেতৃত্বে থাকা ওই মানুষরা তাদের অনুসারীদের পাশাপাশি পরিবার ও সমাজে আসল সম্মানটুকু নিয়ে বাঁচবে এবং মরণশীল মানুষ হিসেবে মৃত্যুর পরেও ভালোবাসায় স্মরণীয় হবে। সমাজকে ভালো কিছু দিলে সমাজ ঠিকই মূল্যায়ন করে।
দীর্ঘ লেখা অনেক সময় বিরক্তিকর হয়। নিশ্চয়ই আমাদের সচেতন ও বিজ্ঞান মনস্ক তরুণ-তরুণীরা চোখ ও কান খোলা রাখবে এবং আমাদের ভুলটা গ্রহণ করবে না। তারা আলোর পথে হাঁটবে এবং পৃথিবীর দেশে দেশে প্রকৃতির বাগানে ঘুরে ঘুরে বাগানের ফুল থেকে ভিমরুলের মতো বিষ গ্রহণ করবে না, বরং আমাদের তরুণ-তরুণীরা নিশ্চয়ই বাগানের ফুল থেকে মৌমাছির মতো মধু সংগ্রহ করবে। ভিমরুল মানুষের দেহে হুল ফুটিয়ে মানুষের সমাজে বিষ ঢেলে দিয়ে সমাজকে বিষাক্ত করে। আর মৌমাছি মানুষের পুষ্টি যোগায়। আমরা সদাচারী হলেই সমাজ হবে শুদ্ধ। শুদ্ধাচার হোক নতুন বছরের অঙ্গীকার।
[লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
