উন্নত বিশ্বে নির্বাচন আয়োজন, জাপানের অভিজ্ঞতা বিনিময়
- আপলোড সময় : ৩০-১২-২০২৫ ০৮:১৭:১৪ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩০-১২-২০২৫ ০৮:১৭:১৪ পূর্বাহ্ন
ড. আবুল হোসেন::>
১৯৯৮ সালের ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয় ওকিনাওয়া প্রদেশের গভর্নর নির্বাচন। প্রার্থী ছিলেন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মাসাহিদে ওতা এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির কেইছি ইনামিনে। প্রচারণার সময় আমরা রাজধানী নাহার একটি চার তারকা হোটেলে ছিলাম প্রায় এক মাস। প্রতিদিন রাজধানীতে অবস্থান এবং যাতায়াতের সময় নির্বাচনের কোনো প্রচারণা, পোস্টার, মিছিল, মিটিং লক্ষ করিনি। নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে একদিন দেখি একটি খোলা ট্রাকে চারজন সমর্থক হাতে পতাকা নাড়ছেন। অনুমান করলাম তারা সিটিং গভর্নর ওতার সমর্থক।
জাপানিরা মিছিল-মিটিং করে সাধারণ নাগরিকের অসুবিধা করতে চান না। স্থানীয় পত্রিকায় দুই প্রার্থীর বক্তব্য ও প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জানতে পারতাম। কখনো এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেছেন বলে মনে পড়েনি। নির্বাচনের কয়েক দিন আগে স্থানীয় একটি হোটেলে দুই প্রার্থী তাদের সমর্থকদের উপস্থিতিতে একটি বিতর্কে অংশগ্রহণ করেন। যেমনটি দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের সময় ট্রাম্প-বাইডেন বা ট্রাম্প-কমলার বিতর্ক। প্রার্থীদের বক্তব্য খুব সাজানো গোছানো এবং কথা বলার সময় প্রতিপক্ষের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেন। ইনামিনে বলেন, বর্তমান গভর্নর পাঁচ বছরে যেসব কাজ করেছেন তা যদি জনগণ পছন্দ করেন তাহলে তারা বর্তমান গভর্নর মি. ওতাকে পুনরায় ভোট দিয়ে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করার সুযোগ দিতে পারেন। আর যদি জনগণ বর্তমান গভর্নরের কাজে কোনো কারণে অসন্তুষ্ট হন তবে তারা নতুন প্রার্থী মি. ইনামিনেকে ভোট দিতে পারেন। মি. ওতার বক্তব্যেও অনুরূপ সৌজন্যতাবোধ প্রকাশ পেয়েছে।
নির্বাচন ছিল সোমবার, অফিস-আদালত খোলা। সরকারি ছুটি দেয়া হয়নি। আমাদের সেন্টারের পাশে একটি এলিমেন্টারি স্কুল ছিল। শুনলাম সেখানে ভোট হচ্ছে। তাই আমাদের মধ্যাহ্ন বিরতির সময় তিন বন্ধু গেলাম ভোট কেন্দ্রে। আশ্চর্য হওয়ার অনেক কিছু। স্কুলের সামনে বড় একটি খেলার মাঠ। কোনো প্রার্থীর সমর্থক বা বুথ বা ব্যানার - এরূপ কিছুই নেই। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্যকে দেখলাম না। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই এখানে ভোট হচ্ছে। স্কুলের ভেতর প্রবেশ করতেই দেখলাম, এটি টিচারদের জন্য নির্ধারিত রুম। গেটের কাছে টেবিলের ওপর একটি কাগজের বাক্স। সঙ্গে একটি ব্যালট পেপারের বই ও একটি কলম। কোনো ভোটারের সঙ্গে দেখা হলো না।
রুমের শেষ প্রান্তে চোখে পড়ল একজন মহিলা শিক্ষক ক¤িপউটারে কাজ করছেন। তাকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম, ভোটাররা তাদের সুবিধা অনুযায়ী এসে ভোট দিয়ে চলে যান। ভোটের বাক্স বা ব্যালট পেপারের কাছে কোনো লোক নেই। এমনকি প্রিসাইডিং বা পুলিং অফিসার বলে কাউকে দেখলাম না। শিক্ষককে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করায় মনে হলো তিনি আকাশ থেকে পড়েছেন। তিনি আসলে এসব বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত নন। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কোনো জাল ভোট পড়ে কিনা? এ ব্যাপারে তার কোনো ধারণা আছে বলে মনে হলো না। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম একজনের ভোট অন্যজন দেয় কিনা? তিনি আমাদের কথা শুনে অবাক। বললেন, একজনের ভোট আরেকজন কেন দেবে?
কেন্দ্রে ভোটার তালিকা, ভোটারকে শনাক্ত করার জন্য প্রার্থীর কোনো এজেন্ট, জাল ভোট প্রদান প্রতিরোধ করার জন্য হাতে অমোচনীয় কালি লাগানোর ব্যবস্থা কিছুই দেখলাম না। জাপানের ভোটের দিনের চিত্র দেখে বাংলাদেশের ভোটের চিত্র বারবার মানসপটে ভেসে আসছিল। সঙ্গে থাকা আমার দুই বন্ধুকে বাংলাদেশের নির্বাচন স¤পর্কে কিছু বললাম না।
নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথী কেইছি ইনামিনে জয়লাভ করলেন। রাত ৯টায় ফলাফল জানানোর পর বর্তমান গভর্নর মি. ওতা নবনির্বাচিত গভর্নরকে অভিনন্দন জানালেন। শুনেছিলাম, ভোটের নির্ধারিত সময় শেষে একজন স্কুল শিক্ষক ব্যালট পেপার গুনে দুই প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা স্থানীয় কাউন্সেলর অফিসে টেলিফোনে জানিয়ে দেন। ব্যালট পেপার পাঠানোর কোনো সিস্টেম নেই। নির্বাচিত গভর্নর জানুয়ারির শেষে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ততদিন তিনি বর্তমান গভর্নরের সঙ্গে কাজ করবেন সবকিছু বুঝে নেয়ার জন্য।
বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুতির দিকে খেয়াল করলে আমাদের নির্বাচনী সংস্কৃতি বোঝা যাবে। কয়েকটি জাতীয় পত্রিকার গত ১ জুলাই অনলাইন ভার্সনের সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট কেন্দ্র স্থাপনে জেলা প্রশাসন (ডিসি) ও পুলিশ সুপারের (এসপি) কর্তৃত্ব বাদ দিয়ে নিজস্ব কর্মকর্তাদের হাতে ক্ষমতা দিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)’। দিন শেষে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। ২৮ জুলাই কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের অনলাইন ভার্সনে দেখলাম, আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে ১ লাখ ৫০ হাজার পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। আর নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন সেনাবাহিনীর ৫০ হাজার সদস্য। তাদের প্রশিক্ষণের ব্যাপারে কোনো তথ্য জানা গেল না। তবে প্রিসাইডিং, পুলিং অফিসার, আনসার, ভিডিপিদেরও প্রশিক্ষণ হওয়ার কথা। এসব প্রশিক্ষণে নয়-ছয় হবে না তার নিশ্চয়তা কোথায়? দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার অনলাইন ভার্সনের একটি শিরোনাম ছিল এমন, ‘প্রশিক্ষণের নামে সাড়ে ৭ কোটি টাকা লোপাট, হুদা কমিশনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে দুদক’।
নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থী, তাদের প্রতিনিধি, এজেন্ট ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। এ দায়িত্ব নিজ নিজ দল নিতে পারে। অথবা স্থানীয় প্রশাসন ও বেসরকারি সংস্থা বা সংগঠনও এ দায়িত্ব পালন করতে পারবে। তারা সবাই যদি ভালো আচরণ করেন তাহলে ভোটের দিন শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ সম্ভব হবে। তবেই ভোটাররা নিরাপদে, সুস্থদেহে এবং জীবন নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা অনলাইনে করা যায়। পেমেন্ট বিকাশ বা নগদে পরিশোধ করা যায়। ফলে বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের শোডাউন করার সুযোগ থাকবে না। যেসব প্রার্থীর জনসমর্থন নেই বা দলে কর্মীর সংখ্যা কম তারা লোক ভাড়া করার ঝামেলা থেকে রেহাই পেতেন। প্রার্থী বাছাইয়ের সভাটিও জুম অনলাইন প্লাটফর্মে আয়োজন করা যায়। সংশ্লিষ্ট প্রার্থী ও তার সমর্থকরা সরাসরি প্রোগ্রামটি দেখতে পারবেন। যারা বাছাইয়ের দায়িত্বে থাকবেন তাদের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কেউ কোনো অভিযোগ বা প্রশ্ন উত্থাপন করবে না। ফলে নির্বাচন কমিশন বা উচ্চতর আদালতে অভিযোগ বা আপিল করার সম্ভাবনা থাকবেন না।
মনোনীত প্রার্থীর হলফনামায় যেসব তথ্য সরবরাহ করবেন তা জনগণের জানার জন্য নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট, সংশ্লিষ্ট দলের ওয়েবসাইট, স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে দেয়া যেতে পারে। সর্বোপরি সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকে প্রদান করা যায়। ফলে জনসাধারণ, বিশেষ করে ভোটাররা প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভালো ও যোগ্য প্রার্থী নির্বাচনে সফল হবেন। মনোনীত প্রার্থীদের পরিচিতিমূলক মিছিল-মিটিং আয়োজন, পোস্টার, ফেস্টুন, লিফলেট বা ব্রুশিউর ছাপানো, দেয়ালে লেখা ও বিলবোর্ডে স্থাপনের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া যেতে পারে। এতে নির্বাচনের খরচ বহুলাংশে হ্রাস পাবে এবং পরিবেশের ক্ষতি কম হবে। নির্বাচনের খরচ হ্রাস পেলে অপেক্ষাকৃত ভালো প্রার্থী যাদের বিপুল অর্থ নেই তারা এগিয়ে
আসবেন।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি কোড অব কন্ডাক্ট তৈরি করা যায়। তারা যাতে অন্য দলের বা অন্য প্রার্থীর সমালোচনা করার সময় শালীনতার মাত্রা অতিক্রম না করেন। তারা শুধু বলবেন নির্বাচিত হলে ওই এলাকা বা জনসাধারণের জন্য কী করতে চান? ভোটাররা যদি তার কথায়, আচরণে ও প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে তাহলে ভোট দেবেন। দেশের প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে ভোট কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা যায়। ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রিসাইডিং অফিসার ও অন্যান্য শিক্ষক পুলিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করতে পারেন। নির্বাচন কেন্দ্রে প্রার্থীর কোনো এজেন্ট থাকার দরকার নেই। কারণ শিক্ষকরা অধিকাংশ জনসাধারণকে চেনেন ও জানেন। জাল ভোট হওয়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে কমে যাবে।
ভোট কেন্দ্রে সাংবাদিক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের যাতায়াত অবাধ করা দরকার যাতে জনগণ ও বহির্বিশ্বের সবাই আমাদের ঐতিহাসিক ও সুষ্ঠু ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া দেখে বাংলাদেশ স¤পর্কে ইতিবাচক ধারণা পেতে পারেন। যেমন ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের বিষয়ে সাধারণ মানুষের কোনো অভিযোগ নেই। এসব নির্বাচনের পর ক্ষমতা হস্তান্তরও হয়েছিল শান্তিপূর্ণভাবে। প্রতিটি কেন্দ্রে ভোট গণনার বিষয়টি অনলাইনে দেখানো যেতে পারে। তাই মানুষের মধ্যে উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা কমে যাবে। যারা ভোট গণনায় জড়িত থাকবেন তাদের কর্মতৎপরতা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করার সুযোগ পাবেন না। এতে কারচুপি, সূক্ষ্ম কারচুপি, গণনায় পক্ষপাতিত্বের কোনো অভিযোগ থাকবে না। প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। শুধু একটি সার্কুলার জরুরি। তাহলো সরকারি কর্মকর্তা ও যারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকবেন তাদের শতভাগ সব প্রার্থীর বিষয়ে নিরপেক্ষতা, দায়িত্বপালনের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিদ্যমান বিধিবিধান অনুসরণ এবং ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করা। এ নির্দেশনার ব্যত্যয় হলে তাৎক্ষণিক ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণের নিশ্চয়তা। প্রয়োজন সবার মানসিকতার পরিবর্তন।
[ড. আবুল হোসেন: সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক