সুনামগঞ্জ , শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ , ১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
সুনামগঞ্জে ৪৪৪ মণ্ডপে দুর্গাপূজা, নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রশাসনের প্রস্তুতি সম্পন্ন পূজার ছুটিতে পর্যটকদের অপেক্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওর ১৫০ বছরের পুরোনো মূর্তি ও গহনা চুরি অপারেশন ক্লিন হার্টের মতো অভিযানের পরিকল্পনা নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে বহিরাগতদের উপদ্রব দুর্গাপূজায় থাকবে তিন স্তরের নিরাপত্তা গ্রামীণ কল্যাণের ৬৬৬ কোটি টাকা কর দ্রুত আদায়ে নির্দেশ হাইকোর্টের নিউইয়র্কে হেনস্তার শিকার ড. মুহাম্মদ ইউনূস শাল্লায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ প্রবাসীর স্ত্রীকে ৬ টুকরো করে হত্যা, আসামি জিতেশের মৃত্যুদন্ড সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজে আরও ছয় বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু চারলেন প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্নের দাবি, নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৭০ শতাংশ সংস্কৃতি চর্চায় সুনামগঞ্জে ইনস্টিটিউট করা হবে : এমপি কয়ছর আহমদ সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের চেক বিতরণ জামালগঞ্জে নজরুল বর্ষের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ১১৭ শিক্ষার্থীকে পুরস্কার প্রদান ‎জামালগঞ্জে আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত, র‍্যালি ও মহড়া ইউপি নির্বাচন ৫ ধাপে, প্রথম ধাপের ভোট ২১ জানুয়ারি ধর্ম নয়, নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার নিশ্চিত করা আমার দায়িত্ব : প্রধানমন্ত্রী একটি সেতুর অভাবে পাঁচ গ্রামের মানুষ দুর্ভোগে ধর্মপাশায় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য কাজলের রহস্যজনক মৃত্যু, সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে এলাকাবাসীর মানববন্ধন

ভাটি বাংলা, হাওর ও বিল প্রসঙ্গ

  • আপলোড সময় : ০৪-১২-২০২৫ ০১:৪২:৫৭ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ০৪-১২-২০২৫ ০১:৪৫:১৯ পূর্বাহ্ন
ভাটি বাংলা, হাওর ও বিল প্রসঙ্গ
মোহাম্মদ আব্দুল হক::>
বাংলাদেশের যেসব জেলায় হাওর এবং বিল বেশি সেগুলোর মধ্যে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় ছড়ানো বিল ও হাওরাঞ্চলে হাওরের নাম অধিক শোনা যায়। বাংলাদেশের মানুষের কাছে হাওর এবং বিল এখন অন্যতম পর্যটন অঞ্চল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের নাম এখন সারাদেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষের কাছে ভ্রমণের তালিকার শীর্ষে থাকে। সেজন্যে দেখতে পাওয়া যায় টাঙ্গুয়ার হাওরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ইত্যাদি বিভিন্ন জেলার মানুষদের। মানুষ হাওর দেখতে চায়, মানুষ হাওরে বেড়াতে যায়। হাওর হচ্ছে এক চমৎকার আকর্ষণীয় মনোহারি নৈসর্গিক সৌন্দর্য যা একবার দেখতে গেলে বারবার দেখার ইচ্ছে জাগে। এই হাওরের সৃষ্টি রহস্য নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে।
আমাদের বিশাল বঙ্গোপসাগর নিয়ে যে প্রশ্ন সবাই করেন না, হাওরের প্রসঙ্গ টেনে সে প্রশ্ন করে অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করেন। প্রশ্ন হলো, কিভাবে সৃষ্টি হলো এতো বিশাল আয়তনের হাওর? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে আমরা ভৌগোলিক বাস্তবতার দিকে ও নানান ভূ-প্রাকৃতিক ঘটনার আলোকে প্রাকৃতিক পরিবেশের ইতিহাসের দিকে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করলে দেখতে পাই শতশত বছরেরও বেশি সময়ের ভূ-প্রকৃতির দুর্যোগের কারণে বিল ও হাওর এর প্রকাশ ঘটেছে। স্বাভাবিকভাবে আমরা হাওর বলতে বুঝি প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপায়ে গড়ে উঠা বিশাল আয়তন নিয়ে চওড়া অগভীর জলাধার বা জলাভূমি। অন্যভাবে বলা যায়, হাওর মূলত প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নিচু ভূমি যা বর্ষাকালে অধিক বৃষ্টিজল ও নদীর পানিতে প্লাবিত হয়ে এক বিশালাকার জলাশয় হিসেবে দেখা দেয়। আমাদের দেশের এমন হাওরগুলো প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে কানায় কানায় জলে পরিপূর্ণ হয় এবং স্বাভাবিক বন্যায় হাওর জলে প্লাবিত হয়ে যায়। বিশাল হাওরের বুকে কোনো কোনো বিস্তৃত স্থান তুলনামূলক গভীর থাকে। যেগুলো বর্ষা শেষ হলেও পানিতে নিমজ্জিত থাকে। তখন ওইসব নিমজ্জিত জলাশয় বিল নামে পরিচিত হয়ে উঠে। এছাড়া পুরো হাওর বর্ষা পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠে বিশাল প্রাকৃতিক মাঠের মতো। বিল তখনও প্রচুর মাছের আশ্রয় হয়ে যায়। হাওর এলাকায় বসবাসকারী মানুষের জীবন এক ব্যতিক্রমী সংগ্রামের জীবন। এখনও দেখতে পাওয়া যায় হাওরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য উন্নত ব্যবস্থা হিসেবে শিল্প কারখানা গড়ে তোলা হয়নি। হাওর পাড়ের মানুষের জীবন প্রকৃত অর্থে অভাব-অনটনের জীবন। কৃষক ও মৎস্যজীবী মানুষরা বৈশাখী ধান ফসল ও মাছের উপর অধিক নির্ভর। এই-যে এতো বিশাল আয়তনের একেকটা হাওরের সৃষ্টির পিছনে খুঁজে পাওয়া যায় বড়ো বড়ো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ভূমি ওলট-পালট হয়ে যাওয়ার ইতিহাস।
আমাদের সুনামগঞ্জ-সিলেটের বেশির ভাগ এলাকা ভাটি অঞ্চল বলে পরিচিত। আমরা বলি ‘ভাটি বাংলা’। আমরা অনেকে বিশেষ করে সিলেট বিভাগের মানুষরা প্রায় সময় প্রাসঙ্গিক কিংবা অপ্রাসঙ্গিক ভাবে ‘ভাটি বাংলা’ শব্দ দুটি খুব জোরেশোরে একত্রে মিলিয়ে উচ্চারণ করি। কিন্তু আমি দেখেছি, আমরা অনেকে জানি না ‘ভাটি বাংলা’ বললে ঠিক কোন দৃশ্য চোখের সামনে ভাসে। এখানে সংক্ষেপে বলি, ‘ভাটি বাংলা’ মূলত খ্রীষ্টিয় চতুর্দশ - পঞ্চদশ শতকের হাওরের পর হাওর ও খাল, বিল, ছোটো নদী ইত্যাদি জলাশয়ে নিমজ্জিত ভূমি বুঝতে হবে। কবি ও শিল্পীগণ প্রাচীন কালের বিভিন্ন পুঁথিতে এবং প্রাচীন যুগের নানান রকম গানে ওইসব জলমগ্ন এলাকাকে ‘কালীদহ সাগর’ রূপে উল্লেখ করেছেন। এসব সেই প্রাচীন কালের কথা। তবে এখন আর সে সময়ের সকল অঞ্চল বারোমাস জলে নিমজ্জমান হয়ে থাকে না। আমরা লেখাপড়া জানা কৌতুহলী মানুষ বিভিন্ন ধরনের পাঠে পাই, খ্রীষ্টিয় চতুর্দশ - পঞ্চদশ শতকের বানিয়াচং, সরাইল পরগণার একাংশ, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী, ইটনা, শাল্লা, তাহিরপুর, দিরাই, জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, কালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, জগন্নাথপুর ইত্যাদি ভূমি নি¤œভূমি থাকায় ওইসব অঞ্চলকেই ‘ভাটি-বাংলা’ বুঝায়। কালক্রমে পলি দ্বারা কিছু কিছু এলাকা ভরাট হওয়ায় ওইসব ভরাট ভূমিতে জনবসতি গড়ে উঠে। ভাটি-বাংলায় জনবসতি গড়ে উঠার শুরুটা অনেকটা এভাবেই। ভাটি অঞ্চল সম্পর্কে সহজে ধারণা পেতে শব্দ ও বাক্যে প্রকাশ করা যায় এভাবে- ভাটি অঞ্চল হচ্ছে সেই অঞ্চল যেসব অঞ্চলে বছরের প্রায় ছয়মাস পানি থাকে এবং বাকি সময়টায় ওই অঞ্চল শুকিয়ে যায়।
সেদিক বিবেচনায় বাংলাদেশের ঈশান কোণের সিলেট বিভাগের চার জেলা এবং কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিস্তৃত অঞ্চল ভাটি অঞ্চল। হাওরাঞ্চলের মানুষ অর্থাৎ ভাটি বাংলার মানুষের জীবন চলে প্রকৃতির স্বাভাবিক গতি এবং বিরূপ প্রভাবের সাথে যুদ্ধ করে। তাদের জীবনে বোরোধান চাষাবাদ, পশুপালন ও মৎস্য শিকার ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে। কিন্তু সাধারণ চাষি ও মাছ শিকারী মানুষ সেখানে স্থানীয় অধিক ভূমি মালিকদের দ্বারা প্রায়শই নির্যাতিত। হাওরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের বসতবাড়ি সাধারণত অন্যান্য পাহাড়ি এলাকা বা সমতল এলাকার ঘরবাড়ি থেকে আলাদা চেহারায় দেখা যায়। ভাটি অঞ্চলের মানুষের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যও ভিন্ন রকম। এখানে মানুষের মন কবি-মন। প্রকৃতি এখানে মানুষকে উদাস করে। ভাটি অঞ্চলে বর্ষাকালে নৌকা-বাইচ খুবই আনন্দদায়ক। সব মিলিয়ে মানুষের জীবনে চাকচিক্য খুব বেশি না-থাকলেও ভাটি অঞ্চল বা হাওরাঞ্চল নৈসর্গিক অপার সৌন্দর্যে ভরা। তাই শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে মুক্ত হয়ে একটু স্বস্তি পেতে মানুষ বর্ষায় ছুটে যায় বিল-হাওরের পানে। শীতকালে পানি সরে গেলে ভাটি বাংলার আরেক রূপ। অবারিত মাঠের ঘাসের উপর সন্ধ্যায় নামে কুয়াশার চাদর আর ভোরের শিশিরে ভেজা ঘাস মাড়িয়ে পায়ে পায়ে পথ চলার আনন্দ অতুলনীয়। আলোচনায় যে ভাটি অঞ্চল বা হাওরাঞ্চল সেখান থেকে উৎপাদিত মাছ দেশের আভ্যন্তরীণ মাছের চাহিদার বড়ো অংশ মিটায়। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চাল উৎপাদনেও হাওরাঞ্চলের গুরুত্ব অধিক। আমার বাড়ি সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ জেলায়। আমি ছোটোবেলা থেকে বিল ও হাওর কাছে থেকে দেখে এসেছি। সুনামগঞ্জের ধান ফসলের মাঠ, হাওর আমাকে কবি করে বাঁচিয়ে রাখে শতো রকমের জীবন যন্ত্রণা ভুলিয়ে। সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে যে সুরমা নদীর বয়ে চলা, সেই নদীর তীরে দাঁড়িয়ে মেঘালয় পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ অন্য রকম আনন্দের। ভাটি বাংলার মানুষের মাথার উপর যেমন মেঘমুক্ত নীল আকাশ তেমনি আকাশ থেকে বৃষ্টি ঝরে আবার রোদ উঠলে এখানে মানুষ সূর্যের আলোতে অবগাহন করে। তারপরও মানবতার প্রশ্নে মানুষের দিকে এবং পরিবেশের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। সুনামগঞ্জে লেখক সাংবাদিক সুশীল সমাজ হাওর বাঁচাও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। কারণ, এখানে পরিবেশ সচেতন মানুষ হাওরের পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ঐতিহাসিকভাবে সত্য সিলেট সুনামগঞ্জসহ সকল হাওরাঞ্চল একটা সময় ছিলো জীববৈচিত্র্যে যথেষ্ট সমৃদ্ধ। কিন্তু এখানে এখন অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদ হয় বিলুপ্ত হয়ে গেছে না-হয় প্রায় বিলুপ্তির পথে। কাজেই পরিবেশ রক্ষায় এখনই জনগণ এবং সরকার সকলকেই সচেতন হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা জানি, কোনো একটি ভৌগোলিক অবস্থানে উদ্ভিদ, প্রাণী, ছত্রাক ও অনুজীব মিলিয়ে গড়ে উঠে জীব বৈচিত্র্যের সমাহার। আর এটিই হচ্ছে প্রতিবেশ। আর প্রতিবেশের প্রত্যেকেই পর¯পর নির্ভরশীল। আমাদের পরিবেশ ও প্রতিবেশ বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এখানে শিক্ষা, চিকিৎসা ও সড়ক যোগাযোগে অবহেলা চোখে পড়ে। যেখানে একটি দেশের জনগণের বিরাট অংশ হাওরাঞ্চলে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ। তাদের জন্যে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি সুযোগ সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া জরুরি। মানুষের জন্য পরিবেশ। তাই আমাদের বাঁচার জন্যে বায়ুম-লের উষ্ণতা স্বাভাবিক রাখতে এবং পরিবেশ বাঁচাতে সর্বোচ্চ মনোযোগ দিতে হবে।
[লেখক : মোহাম্মদ আব্দুল হক, কলামিস্ট ও কথাসাহিত্যিক]

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে বহিরাগতদের উপদ্রব

সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে বহিরাগতদের উপদ্রব