বিমানবন্দর-রেল-মেট্রো-টার্মিনালে কড়া সতর্কতা, নিরাপত্তা বলয়ে দেশ
- আপলোড সময় : ১৩-১১-২০২৫ ০৮:৫৮:৩১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৩-১১-২০২৫ ০৮:৫৮:৩১ পূর্বাহ্ন
সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার সম্ভাব্য তারিখ আজ ১৩ নভেম্বর। দিনটি কেন্দ্র করে ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি দিয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগ। সারাদেশে বিরাজ করছে উত্তেজনা। সর্বোচ্চ সতর্ক রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে নানান ধরনের গুজব ও অপপ্রচার - যার মধ্যে রয়েছে গণসমাবেশ ঘটিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা এবং যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মতো প্রচারণা। দুর্বৃত্তরা টানা কয়েকদিন ধরে বেশ কিছু স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে চোরাগোপ্তা হামলা চালাচ্ছে। ১৩ নভেম্বর বড় কোনো নাশকতা যেন না ঘটাতে পারে সেজন্য সজাগ সরকার।
সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, দুষ্কৃতকারীরা ঢাকাসহ সারাদেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে তারা বেশকিছু স্থাপনার ভেতরে-বাইরে ককটেল বিস্ফোরণ, ধারাবাহিকভাবে কিছু বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ১৩ নভেম্বর সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, মেট্রোরেল স্টেশন, নৌ ও বাস টার্মিনালসহ সব ধরনের গণপরিবহন কেন্দ্র এখন কড়া নজরদারিতে রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কমলাপুর রেলস্টেশন ও উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল রুটে বাড়ানো হয়েছে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি।
নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, ১৩ নভেম্বর কেন্দ্র করে সম্ভাব্য যে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আগাম সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ঢাকার সব প্রবেশপথে বাড়ানো হয়েছে চেকিং, যাত্রী, লাগেজ স্ক্যানিং এবং সিসি ক্যামেরা মনিটরিং। মেট্রোরেল ও রেলস্টেশনগুলোর প্রবেশদ্বারে বাড়ানো হয়েছে আর্চওয়ে মেটাল ডিটেক্টর।
পুলিশ বলছে, কোনো সুনির্দিষ্ট থ্রেট না থাকলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সব তথ্য গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে অনুযায়ী নেওয়া হচ্ছে সর্বাত্মক প্রস্তুতি। প্রত্যেকটি বিষয় নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। শুধু তাই নয়, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা এরই মধ্যে শুরু করেছে আভিযানিক কার্যক্রম। ডিএমপির প্রত্যেক ক্রাইম ডিভিশনেই বাড়ানো হয়েছে আভিযানিক টিম। নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে নেওয়া হচ্ছে প্রযুক্তিগত সহায়তা।
ডিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যে ধরনের তথ্য পাচ্ছি সব ধরনের তথ্যকেই গুরুত্ব দিচ্ছি। বিভিন্ন মেসেঞ্জার ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ বিশ্লেষণ করে ইতোমধ্যে বেশকিছু দলীয় কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতারদের কাছ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সে অনুযায়ী, যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নাশকতামূলক কর্মকা-ে যারা অর্থায়ন করছে তাদেরও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, দেশকে অস্থিতিশীল করতে চায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর গত ১৪ মাসে তারা ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সংঘটিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়েছে। কিন্তু পুলিশি তৎপরতায় বারবার ব্যর্থ হয়েছে। তাই পুরোনো কৌশল বাদ দিয়ে এবার তারা নতুন কিছু করতে চায়। এরই অংশ হিসেবে যাত্রীবাহী বাসে আগুন দিয়ে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে জনমনে আতঙ্ক তৈরি করতে চায়।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ১৩ নভেম্বর সামনে রেখে নজরদারিতে রাখা হয়েছে ফ্যাসিস্টের বেশকিছু দোসরকে। যারা নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে পারে তাদের একটি তালিকাও তৈরি করেছে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা। সেই তালিকা ধরে মাঠপর্যায়ে অভিযান চালাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপি সদর দপ্তর থেকে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, মেট্রোরেল এলাকা, রেলওয়েসহ কেপিআইভুক্ত স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করার কথা বলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। তিনি বলেন, পেট্রোলিং বাড়ানো হয়েছে, কেপিআইগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
দেশের সব বিমানবন্দরে বাড়তি সতর্কতা :
হঠাৎ জ্বালাও-পোড়াওয়ের মধ্যে দেশের বিমানবন্দরগুলোতে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়াতে চিঠি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ-বেবিচক। মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) বেবিচক থেকে সবগুলো বিমানবন্দরে পাঠানো চিঠিতে সর্বোচ্চ সংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন, সবার নিরাপত্তা তল্লাশি ও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।
গত কয়েকদিনে রাজধানী ঢাকার বাড্ডা, মিরপুর, ধোলাইপাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে কেউ হতাহত না হলেও ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার ভালুকজান এলাকায় সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাসে আগুন দিলে বাসচালক জুলহাস মিয়া (৩০) নিহত হন। এছাড়া এনসিপি কার্যালয়, গ্রামীণ ব্যাংক ভবন, সেন্ট জোসেফ স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান টার্গেট করে ককটেল এবং পেট্রোলবোমা ছুড়েছে দুর্বৃত্তরা। এতে জনমনে ছড়িয়েছে আতঙ্ক।
বিজিবি মোতায়েন :
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা ও আশপাশের জেলায় ১৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার (১২ নভেম্বর) বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানীসহ ঢাকায় ১২ প্লাটুন ও আশপাশের জেলায় দুই প্লাটুনসহ মোট ১৪ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ, আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই :
ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট পুলিশের (এমআরটি) ডিআইজি সিদ্দিকী তানজিলুর রহমান বলেন, মেট্রোরেলের সব স্টেশনে নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন ও সার্ভিলেন্স বাড়ানো হয়েছে। স্টেশনের নিচে যেসব দোকানপাট ছিল তা উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু এমআরটি পুলিশ নয় আনসার, মেট্রোরেলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাও নিরাপত্তায় অংশ নিচ্ছে।
যাত্রীদের চেকিং বাড়ানো হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, গতকাল মঙ্গলবার একদিনে ২০০ গ্যাস লাইটার জব্দ করা হয়েছে। যেসব নিষিদ্ধ জিনিস রয়েছে সেগুলো নিয়ে স্টেশনে ওঠা নিষেধ। সন্দেহভাজন যাত্রীদের ব্যাগ চেক করা হচ্ছে। সার্বিক নিরাপত্তা দ্বিগুণ করা হয়েছে।
র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ‘১৩ নভেম্বর ঘিরে র্যাবের গোয়েন্দা টিম ও সাইবার মনিটরিং টিম গত কয়েকদিন ধরে কাজ করছে। অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার সুনির্দিষ্ট কোনো আশঙ্কা আমাদের নেই। তারপরও র্যাব সদস্যরা তৎপর। মাঠে নামার জন্য আমাদের প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলছে। অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন, টহল বৃদ্ধি ও চেকপোস্ট বাড়ানোর বিষয়টি নিয়ে যাচাই-বাছাই চলছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশে ৭০টির অধিক টহল দল মোতায়েন রয়েছে র্যাবের।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গত কয়েকদিনে ককটেল নিক্ষেপ ও বাসে আগুন লাগানোর ঘটনায় র্যাবের নিরাপত্তাসহ চেকপোস্ট বাড়ানো হয়েছে এবং সিসি ক্যামেরাও বাড়ানো হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লকডাউন নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। সবার সহযোগিতা নিয়ে যারা ভীতিকর পরিস্থিতি ও অপতৎপরতার চেষ্টা করছে এটা ডিবি কঠোর হস্তে দমন করবে। এক্ষেত্রে আইনের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করা হবে। ঢাকায় যারা নাশকতামূলক কর্মকা- পরিচালনা করছে তাদের নেপথ্যে যারা আছে তাদেরও গ্রেফতার করা হচ্ছে। আজও ৪৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় যারা বিভিন্ন উসকানি ও নির্দেশনা দিচ্ছে তাদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায়ই দেখা যায় কাউকে রাজপথে দেখা যায় না। একজন নিরীহ রিকশাওয়ালাকে ৫শ টাকা দিয়ে ¯ে¬াগান দেওয়ানো হয়েছে। সেটা ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে রিকশাচালকের অপরাধের ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় রিকশাচালকের কোনো অপরাধের তথ্য নেই।
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ১৩ নভেম্বর ঘিরে ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে আমরা অনেক ধরনের তথ্য পাচ্ছি। এসব তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলছে। ডিএমপির পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনিফর্ম পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মাঠে থাকবে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেশ কয়েকদিন ধরেই কাজ করছে।
আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো থ্রেট না থাকলেও আমরা বেশকিছু নেতাকর্মীকে নজরদারিতে রেখেছি।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো প্রোপাগান্ডায় বিভ্রান্ত হয়ে কেউ যাতে বিশৃঙ্খল কার্যক্রম চালাতে না পারে, সেজন্য পুলিশ সতর্ক। আওয়ামী লীগ হুটহাট করে যাতে কোথাও মিছিল-মিটিং করতে না পারে, জানমালের ক্ষতি করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, আওয়ামী লীগের ১৩ নভেম্বরের ঘোষিত কর্মসূচি নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার হওয়ায় একটা আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। তবে যে কোনো ধরনের নাশকতা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা আমাদের আছে, কারণ ঢাকাবাসী আমাদের সঙ্গে আছে।
অপরিচিত কাউকে আশ্রয় না দেওয়া এবং মেস, হোটেল, গেস্ট হাউজে জাতীয় পরিচয়পত্র দেখিয়ে কাউকে ওঠানোর অনুরোধ করে বলেন, কোনো আগন্তুককে সন্দেহজনকভাবে দেখলে থানায় অথবা ৯৯৯ ফোন করার অনুরোধ করছি। দুদিনে ১৭টি ককটেল, নয়টি যানবাহনে আগুন দেওয়ার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, এসব ঘটনায় ১৭টি মামলা হয়েছে। ৫০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে, মঙ্গলবার সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, ১৩ তারিখের ঘটনা নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শক্ত অবস্থানে নিয়েছে, শক্ত অবস্থানে থাকবে। পরিস্থিতি নরমাল থাকবে। কোনো ধরনের আশঙ্কা নেই।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক