সুনামগঞ্জ , রবিবার, ৩০ মার্চ ২০২৫ , ১৬ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
জামালগঞ্জে বৌলাই নদীতে নৌকা ডুবে নিহত ৪, আহত ১ জামালগঞ্জে দূর্নীতির অভিযোগে সদর ইউপি চেয়ারম্যান কামাল হোসেন বরখাস্ত অর্ধযুগ পর পরিবারের সঙ্গে ঈদ করবেন খালেদা জিয়া “এমন ভূমিকম্প গত ২০ বছরে দেখা যায়নি মিয়ানমারে” ডিসিদের প্রতি ১২ নির্দেশনা প্রধান উপদেষ্টার বিএনপি নেতা কামরুলের উদ্যোগে ইফতার মাহফিলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের জোয়ার ‘জয় বাংলা’ স্লোগান কারও দলের নয় : কাদের সিদ্দিকী সয়াবিন তেল লিটারে ১৮ টাকা বাড়াতে চান ব্যবসায়ীরা জুলাই যোদ্ধাদের আর্থিক অনুদানের চেক বিতরণ পণাতীর্থে লাখো মানুষের পুণ্য স্নান শান্তিগঞ্জ-ডুংরিয়া সড়ক নির্মাণকাজের তথ্য নিয়ে লুকোচুরি স্বাধীনতার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে : জেলা প্রশাসক পূর্ব শত্রুতার জের : বিষ প্রয়োগে রাজহাঁস হত্যা জাফরগঞ্জে জামায়াতের ইফতার ও দোয়া মাহফিল জামালগঞ্জে দরিদ্র্যদের মধ্যে ঈদসামগ্রী বিতরণ জামালগঞ্জে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা গ্রেফতার বাদশাগঞ্জ ক্রিকেট লীগ উদ্বোধন আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের মধ্যে ঈদ উপহারসামগ্রী বিতরণ গৌরবময় স্বাধীনতা দিবস আজ আজ থেকে শুরু হচ্ছে পণাতীর্থে গঙ্গাস্নান

‘খুন’ হচ্ছে হাওরের নদ-নদী-খাল

  • আপলোড সময় : ২৫-০৩-২০২৫ ০১:১০:১২ পূর্বাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৫-০৩-২০২৫ ১১:২১:৫০ পূর্বাহ্ন
‘খুন’ হচ্ছে হাওরের নদ-নদী-খাল ছবি: দেখার হাওরের উথারিয়া নদীতে বাঁধ
শামস শামীম, হাওরাঞ্চল ঘুরে এসে::

কোথাও যোগাযোগের জন্য রাস্তা, কোথাও ফসলরক্ষা বাঁধ, কোথাও অন্য কোন স্থাপনা নির্মাণ করে হাওরের নদ-নদী খাল ‘খুনকরা হচ্ছে।

এতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নামছে বর্ষাকালে। পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে সড়ক বা বাঁধ নির্মিত দীর্ঘায়িত হচ্ছে বর্ষাকালীন পানি নিষ্কাশন। এছাড়া জলবায়ুগত পরির্তনের কারণে হাওরে আঘাত এসেছে জীবন জীবিকা ও জীববৈচিত্র্যের উপরও। এতে নানা প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে বন্ধ হয়ে যাওয়া নদ-নদী ও খালগুলো।
​পরিবেশবিদ, কৃষিবিদ ও স্থানীয় অভিজ্ঞ কৃষকরা বলছেন, বাঁধের বদলে রাবারড্যাম দেওয়া হলে নদী ও খাল রক্ষা হবে। এতে প্রকৃতিরও ক্ষতি হবেনা। বর্ষায় প্রতিক্রিয়া দেখাবেনা নদ নদীগুলো। হাওরের নদ নদীর এই অবস্থায় গবেষকরা সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণার কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

সম্প্রতি টাঙ্গুয়ার হাওর গিয়ে দেখা যায়, গোলাবাড়ি ওয়াচ টাওর এলাকায় পাটলাই নদীর সংযোগখাল খালগাঙ-এ বিশাল বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধটি গুরমার হাওরের ফসলরক্ষা করে বললেও এই নদীর দক্ষিণ তীরে আলাদাভাবে বাঁধ রয়েছে। এর পূর্বে নজরখালিতেও স্থায়ী বাঁধ রয়েছে। এখানে বাঁধ দেওয়ার কোনও যৌক্তিকতা নেই বলে জানালেন কৃষকরা। এই বাঁধের ফলে নদীটি মরে গেছে। এ কারণে দুই দিকে চর জেগেছে। ব্যাহত হচ্ছে নৌ চলাচল। এতে মৎস্যসম্পদেরও ক্ষতি হচ্ছে।
জেলার চারটি উপজেলায় বিস্তৃতি দেখার হাওর। এই হাওরের গুরুত্বপূর্ণ নদীটির নাম মহাসিং নদী। এই নদী থেকে নাইন্দা ও উথারিয়া নদীর উৎপত্তি। শান্তিগঞ্জ উপজেলার আস্তমা ও আসামপুর চকে এসে তিনটি নদীর মিলন ঘটেছে। এর মধ্যে আস্তমা থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে উথারিয়া নদীতে ২০০৬-২০০৭ অর্থ বছরে স্থায়ী বাঁধ দিয়ে নদীটি খুন করা হয়েছে। উথারিয়া নদী হয়ে একসময় পানি মহাসিং নদীতে নামতো।

এই গ্রামের কৃষক নেতা এনাম আহমদ বলেন, উথারিয়া নদীটির ধারা বড়দই বিল সংলগ্ন খালের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই খালটি আবার সুনামগঞ্জের ধোপাখালি খালের সঙ্গে সুরমা নদীতে সংযুক্ত ছিল। এছাড়াও দেখার হাওরের পানি নিষ্কাশনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম পান্ডারখাল স্বাধীনতার পর স্থায়ী বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে সুরমা নদীর উপর পাহাড়ি ঢলের একক চাপ তৈরি হয়েছে। যা বর্ষাকালে ছাতক, দোয়ারাবাজার ও সুনামগঞ্জবাসীকে চরম ভোগাচ্ছে। ক্ষতি হচ্ছে রাস্তাঘাট, কার্লভার্ট সেতুসহ সরকারি বেসরকারি স্থাপনার। দেখার হাওরের উথারিয়া বাঁধটি ফসলের সুরক্ষা দিলেও প্রকৃতির বিরাট ক্ষতি করছে বলে জানান তিনি। শাল্লা উপজেলার সরসপুর ও আসানপুর গ্রামের গিয়ে দেখা যায়, সনচাতল গ্রুপ অব ফিশারিজটি মূলত কালনী নদীর একটি অংশ। চিকন একটি লম্বাটে খাল। দুটি গ্রামের মাঝের অংশে স্থায়ী বাঁধ দিয়ে পাকা রাস্তা করা হয়েছে। নদীর মাঝখানে সড়ক হওয়ায় দুই দিকের ঢালুতে প্রিকাস্ট ফাইল দিয়ে মজবুত করা হয়েছে সড়কটি। এই নদীটিকে বেঙড়ার ডোয়ার বলেন স্থানীয়রা। এটি কালনী নদীর সঙ্গে যুক্ত। এছাড়া এর পাশেই কালনী নদীর আরেকটি শাখা আসানপুর খালে (প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ) বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এর আগে একই কালনী নদীর অংশ সরালিটোপাতেও বাঁধ দিয়ে খালটি স্থায়ী বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই উপজেলার বেথুর নদীও মিলনবাজারের কাছে স্থায়ী বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, এভাবে হাওরের নদী সুরমা, কুশিয়ারা, মহাসিং, পুরান সুরমা, কালনীসহ প্রধান নদ-নদীর সঙ্গে সংযুক্ত নদী ও খালগুলো বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কখনো উন্নয়নের নামে, কখনো ফসলরক্ষা বাঁধের নামে নদ নদী খালগুলো ক্রমশ খুন করা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ছোট বড়ো মিলিয়ে ১০৬টি নদী রয়েছে। পাউবোর হাতে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও দুই শতাধিক ছোট বড়ো খাল রয়েছে। এর মধ্যে খননযোগ্য একটি খালের তালিকা সম্প্রতি প্রকাশ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। কখনো পানি উন্নয়ন বোর্ড, কখনো স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, কখনো স্থানীয় সরকার বিভাগ বা প্রশাসন এসব খাল নদী ভরাট করছে বলে জানান স্থানীয়রা। কি পরিমাণ নদী ও খাল ভরাট করে বাঁধ ও স্থাপনা দেওয়া হয়েছে তার পরিসংখ্যান নেই কোথাও। পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ আদালত নদীকে জীবন্ত সত্ত্বা উল্লেখ করলেও উন্নয়নের ক্ষেত্রে সেটাও মানা হচ্ছেনা। উন্নয়ন বাস্তবায়নকারী সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো হাওরের কি পরিমাণ নদী-খাল ভরাট করে বাঁধ দিয়েছে তার তথ্য নেই। বেসরকারিভাবেও কারও কাছে কোনও তথ্য নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল এই নদী ও খালগুলোই নয়, ছাতক উপজেলার বোকা নদী, সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মিয়ারখাল, জয়নাকালি, ওজিখালি, জগাইরগাওর নদী, নূরুল্লা নদী, জামালগঞ্জের কানাইখালি, গজারিয়া, নোওয়াগাওয়ের নদী, শাহপুরের খাল বিভিন্ন স্থানে স্থায়ীভাবে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। ২০১২ সালে তাহিরপুর উপজেলার উত্তরশ্রীপুর ইউনিয়নের কালাগাঙ নদীতে বাঁধ দেওয়ার পর স্থায়ী দোকানপাট ও বাসা-বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এই উপজেলার মনাই ও সরমরা নদীও বাঁধ দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। এভাবে অগুণতি নদী খাল সড়ক, বাঁধ ও নানা স্থাপনায় স্থায়ী ভরাট করা হয়েছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু সুফিয়ান বলেন, সুনামগঞ্জ জেলায় তারের মতো জড়িয়ে ছিল অসংখ্য নদী ও খাল। একসময় আজমিরিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ভৈরব, নেত্রকোণা থেকে সরাসরি খাল, নদী হয়ে সুনামগঞ্জ সহজে যাতায়াত করতো মানুষ। এটা নতুন প্রজন্মের কাছে এখন কল্পনা। অথচ স্বাধীনতার আগেও নৌপথ চালু ছিল। প্রথমে নদী-খালে বাঁধ দিয়ে প্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। পরে দখল, দূষণে ভরাট হয়ে হারিয়ে গেছে।

হাওর বাঁচাও আন্দোলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, অপরিকল্পিত বাঁধ, রাস্তাঘাট ও উন্নয়ন অবকাঠামো এখন হাওরের গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। হাওরে জোরপূর্বক এমন উন্নয়ন নিতে চাচ্ছেনা প্রকৃতি। এ কারণে বর্ষাকাল আমাদের কাছে বন্যা হয়ে দেখা দেয়। বাঁধের কারণে মাছ কমে গেছে। অন্যান্য জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে। বন্যার পানি বিলম্বে ভাটিতে নামছে। একসময় পাহাড়ি ঢলের পানি এসব নদী নালা ও খাল দিয়ে সুরমা-কুশিয়ারা হয়ে মেঘনায় গিয়ে নামতো বলে জানান তিনি।

উন্নয়ন পরামর্শক ও এসোসিয়েটস ফর ইনোভেটিভ রিসার্স এন্ড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড-এর পরিচালক আব্দুল হাই চৌধুরী বলেন, হাওরের নদ নদী খালগুলো পলি, অবৈধ দখল, অপরিকল্পিত বাধ, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সংকটে পড়েছে। এর ফলে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে জীববৈচিত্র্য ও জীবিকা হুমকিতে আছে। হাওরে পরিকল্পিত অবকাঠামো, স্থানীয় সম্পৃক্ততা, কঠোর আইন প্রয়োগ প্রাকৃতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া ক্ষতি যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তার জন্য সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণায় যুক্ত করা যেতে পারে।

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন হাওলাদার বলেন, সুনামগঞ্জ জেলায় ১০৬টি ছোট বড়ো নদী রয়েছে। খালের নির্দিষ্ট তালিকা নেই। তবে খালের খননযোগ্য একটি তালিকা আমরা করেছি। শুধু বাঁধ নির্মাণের কারণেই নয়, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ ও পলিতে অনেক নদী খাল ভরাট হয়ে গেছে। আমরা হাওরের পানি নিষ্কাশনের জন্য সরকারকে খননের প্রস্তাব দিয়েছি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha

কমেন্ট বক্স