অফিস ব্যবস্থাপনায় সুশাসন
- আপলোড সময় : ২৭-০২-২০২৫ ১২:৩১:১৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৭-০২-২০২৫ ১২:৩১:১৩ পূর্বাহ্ন

ড. মো. আব্দুল হামিদ:
সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ গতানুগতিক মাইন্ডসেট বলে মনে করি। বহু বছর ধরে চলে আসা নানা কার্যক্রম ও চর্চা থেকে সরে এসে নতুন ধারণা গ্রহণের মানসিকতা বড়ই দুর্লভ। ফলে বিদ্যমান কার্যপদ্ধতিই সঠিক - এমন মনোভাব অধিকাংশ সেবা প্রদানকারী ব্যক্তিরা পোষণ করেন। এতে তাদের সামনে হাজির করা অনেক সহজ ও কার্যকর পদ্ধতিও বহুক্ষেত্রে উপেক্ষিত রয়ে যায়। তাই সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সর্বপ্রথম মানসিকতার উন্নয়নে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।
মোটাদাগে সুশাসনের তিনটি প্রধান অঙ্গগুলো হলো যোগ্য নেতৃত্ব, জবাবদিহিতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। আমাদের দেশে প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে ওই ক্ষেত্রগুলোয় দৃশ্যমান দুর্বলতা রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতৃত্ব বাছাই বা মনোনয়নের প্রক্রিয়া অস্পষ্ট। দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়নের বিষয়টি বহুক্ষেত্রে উপেক্ষিত। বরং পছন্দমতো লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসিয়ে নিজেদের মেয়াদকাল শেষ করা বা স্বার্থসিদ্ধি মুখ্য হয়ে ওঠে। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোয় পদায়নের প্রচলিত যে কাঠামো ও পদ্ধতি রয়েছে তা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বড় অন্তরায়।
অন্যদিকে একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে যে জবাবদিহিতা করতে হয় তা আমরা ভুলতে বসেছি। এমনকি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিও যে সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য... সেটা আমরা কল্পনাও করি না। অথচ টপ টু বটম এ চর্চা না থাকলে সেই প্রতিষ্ঠানে সুশাসন বাস্তবায়ন অসম্ভব।
অন্যদিকে প্রযুক্তি ও যোগাযোগের গতি তীব্র হওয়ায় এখন কর্মীদের নিত্যনতুন বিষয়ে দক্ষ হওয়া অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আগের দিনে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে একটি কাজ শিখলে হয়তো সারা জীবন সেটা করেই কাটিয়ে দেয়া যেত। কিন্তু এখন যুগের সঙ্গে তাল মেলাতে প্রায় নতুন বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করতে হয়। কিন্তু অধিকাংশ কর্মী বিষয়টাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে না। ফলে নিজেদের মানোন্নয়নে চেষ্টাও খুব একটা দেখা যায় না।
সুশাসনের অন্যতম ভিত্তি হলো সুচর্চা। কোনো দপ্তর সেটা করতে গেলে অন্তত চারটি বিষয়ের মধ্যে যথাযথ সমন্বয় দরকার। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কার্যকর জ্ঞান থাকা, প্রয়োজনীয় দক্ষতাগুলো অর্জন করা, প্রক্রিয়াকে সহজতর করা এবং নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। গত শতাব্দীর শেষের দিকে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী চর্চা হওয়া আমেরিকান আধিপত্যবাদ আমাদের স্কিলড হতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বহু ক্ষেত্রে আমরা সেটা অর্জনে মনোনিবেশ করেছি। কিন্তু ‘দুর্জন বিদ্বান হইলেও পরিত্যাজ্য’ এ বিষয় পর্দার আড়ালে চলে গেছে।
ফলে আমরা বহু ক্ষেত্রে দক্ষ মানুষ পেলেও সৎ ও নৈতিক মানুষের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমেছে। যেনতেনভাবে প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে নিজের স্বার্থসিদ্ধির বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠেছে। বিগত সময়গুলোয় বড় দুর্নীতিবাজদের অনেকেই পেশাগত দিক থেকে অনেক দক্ষ ছিলেন। কিন্তু নীতি-নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধের অভাবে সুশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে তারা শোষণ ও লুণ্ঠনের পথ বেছে নিয়েছেন। এটা স্পষ্টভাবে সুশাসনের পরিপন্থী।
কোনো প্রতিষ্ঠানে সত্যিকারের সুশাসনের সূচনা ও চর্চা করতে গেলে সংশ্লিষ্টদের ইতিবাচক মনোভাব থাকা অপরিহার্য। কারণ গোটা দুনিয়ায় প্রতিনিয়ত অসংখ্য কর্মপন্থার উদ্ভব হচ্ছে। সেগুলো নিজ কর্মক্ষেত্রে গ্রহণ এবং সবার মাঝে এর সুফল ছড়িয়ে দেয়া অতীব জরুরি। তাছাড়া প্রতিটি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা থাকা আবশ্যক। প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কোন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে এবং কীসের ভিত্তিতে একজন দায়িত্ব পাচ্ছেন সে বিষয়ে নীতি ও তার প্রয়োগ না থাকলে হয়তো একজন সুবিধা পাবে আর অনেকে ক্ষুব্ধ হবে। তখন নিজেদের উপেক্ষিত ও বঞ্চিত ভেবে তারা সর্বোচ্চ অবদান রাখবে না। এতে প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ব্যয় হলেও সর্বোচ্চ আউটপুট পাবে না। এছাড়া নির্দেশনা ও কর্মপরিকল্পনায় যথাযথ সমন্বয় থাকা জরুরি। নইলে অধস্তন কর্মীরা দিশাহারা হয়ে পড়ে ও দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় কার্যক্রম পরিচালনা করেন যা সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়।
আমরা পছন্দ করি বা না করি দুনিয়া দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। তার সমান গতিতে চললেও সেটা অগ্রগতি নয়; বরং টিকে থাকা হয়। তাই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে পরিবর্তনের গতির চেয়ে নিজেদের কর্মপদ্ধতি আরো গতিশীল থাকতে হবে। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান অবকাঠামো, লেটেস্ট প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও কার্যকরণ প্রক্রিয়ার মধ্যে সর্বোত্তম সমন্বয় হওয়া দরকার। এগুলোর একটি ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলেও বিপুল স¤পদের অপচয় হবে। প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যাবে না।
ফলে অন্যরা এগিয়ে যাবে এবং আমরা পিছিয়ে পড়ব। অন্যদিকে সার্বক্ষণিক আপডেটেড না থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বড় কিছু অর্জন করা কঠিন। সরকারি অসংখ্য প্রতিষ্ঠান এ সংকটে ভুগছে। তারা কেন টিকে আছে বা সামগ্রিক কার্যক্রমে তাদের কী অবদান তা নিজেরাও জানে না। অথচ রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ তাদের ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হচ্ছে!
এখন কথা হলো, প্রত্যেক অফিস তার কর্মপরিধির মধ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে গেলে কী কী করণীয়? সব প্রতিষ্ঠানে একই ফর্মুলা কাজ করবে না তা সহজেই অনুমেয়। তবে মৌলিক কিছু বিষয় গ্রহণ ও চর্চা করলে দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হওয়া সম্ভব। সেগুলোর প্রতি সংক্ষেপে আলোকপাত করছি:
আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো ফাংশনাল না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো আইনের শাসনের অনুপস্থিতি। একজন ব্যক্তি কখনই প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বড় হতে পারেন না। কিন্তু আমাদের দেশে এ চর্চা ব্যাপকভাবে রয়েছে। বহু ব্যক্তি নিজেকে প্রতিষ্ঠানের রীতিনীতি ও আইনের ঊর্ধ্বে বলে মনে করেন। আচরণে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। প্রতিষ্ঠানের সব পর্যায়ে আইনের শাসন প্রয়োগের মাধ্যমে এমন ব্যক্তিদের লাগাম দেয়া সম্ভব। প্রত্যেকে নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন। কেউ ধারাবাহিকভাবে সেটা করতে ব্যর্থ হলে তার শাস্তির বিধান থাকতে হবে। অর্থাৎ দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন এ চর্চা অগ্রাধিকার পাবে।
প্রতিষ্ঠানের সবার অংশগ্রহণের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা সুশাসনের পূর্বশর্ত। আমরা জানি, দেশে শত শত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বছরের পর বছর ওএসডি করে রাখা হয়! তারা রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে কিন্তু রাষ্ট্র তাদের কোনো সেবা পায় না। জনগণের সম্পদের এমন নিদারুণ অপচয় বিশ্বে সত্যিই বিরল।
আবার প্রতিষ্ঠানগুলোয় অঘোষিতভাবে একেক সময় একেক গোষ্ঠী অগ্রাধিকার পায়। কিন্তু আদর্শিক ভিন্নতার কারণে যোগ্য ব্যক্তিরাও অবদান রাখা থেকে বঞ্চিত হন। এটা প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ এবং প্রত্যাশিত সুশাসনের পথে বড় অন্তরায়। যোগ্য ব্যক্তিকে যথাযথ সম্মান ও দায়িত্ব দিলে সবার মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে ওঠে। প্রত্যেকে তেমন হওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করে। কিন্তু যখন অস্পষ্ট পদ্ধতিতে নিয়োগ ও পদোন্নতি হয় তখন সবাই হতাশ হয়ে পড়ে। কিছু উচ্চাভিলাষী মানুষ দলবাজি বা তৈলবাজিতে ব্যস্ত হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের জন্য কল্যাণকর নয়।
উচ্চপদে আসীন ব্যক্তিদের মধ্যে এক ধরনের অবজ্ঞা ও উপেক্ষার মনোভাব লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ তার কাছে যে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে তার জবাব দেয়া যে তার দায়িত্ব তিনি সেটা ভুলে যান। ফলে অধীনস্থ কেউ যখন কোনো বিষয়ে আবেদন করেন তখন তারা ন্যূনতম জবাব দিতেও অনীহা প্রকাশ করেন। এটা বুঝি তাদের ‘ইচ্ছা’র ব্যাপার। কিন্তু সুশাসন বাস্তবায়ন করতে হলে এ অধিকার চর্চা থাকবে। তিনি কেন প্রত্যাশিত ফল পেলেন না, প্রতিষ্ঠানের কোন নীতি বা আইনের কারণ তিনি যোগ্য বলে বিবেচিত হলেন না - এগুলো জানার অধিকার তাদের রয়েছে।
কিন্তু প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের অনেকেই এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। দীর্ঘমেয়াদে এমন চর্চা ছোট ছোট স্বৈরাচার তৈরি করে। তাই এর লাগাম দেয়া এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্য থেকে জবাবদিহিতার চর্চা করা উচিত। তাহলে প্রত্যেকে ইনক্লুসিভ অনুভব করবে এবং নিজের সর্বোচ্চ অবদান রাখতে সচেষ্ট থাকবে। নইলে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম হলে একসময় প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়বে যা সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অন্তরায়।
অবাধ তথ্যপ্রবাহ না থাকা আমাদের অফিসগুলোয় একটা বড় সংকট। একজন কর্মচারীর দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে স্পষ্ট নিয়মনীতি না থাকা। থাকলেও সেগুলোর ব্যাখ্যা নিয়ে জটিলতা। এমনকি সংশ্লিষ্ট অনেকের সেগুলো না জানা বড় সংকট তৈরি করে। বহু ব্যক্তি হয়তো যুগের পর যুগ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় বিধিগুলো ঠিকমতো জানেন না। বহুক্ষেত্রে মনগড়া ব্যাখ্যা দেন; এমনকি পদক্ষেপ নেন। এতে বহু কর্মী ভুক্তভোগী হন। তখন তারা নিবেদিতভাবে কাজ করার স্পৃহা হারিয়ে ফেলেন। এতে প্রতিষ্ঠান সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই প্রতিটি পদের দায়িত্ব-কর্তব্য ও তার কাছে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা স্পষ্ট করা দরকার। সেগুলোর ব্যত্যয় ঘটলে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে শৃঙ্খলা বজায় রাখা দরকার।
সর্বোপরি কথা হলো, প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান চলে টিমওয়ার্কের ভিত্তিতে। সেই টিম কেন গঠন করা হয়েছে বা তারা ঠিক কী কী অর্জন করতে চায় তা সবার কাছে স্পষ্ট হওয়া দরকার। তারপর যতটা সম্ভব কাজকর্ম ভাগ (বণ্টন) করে দেয়া প্রয়োজন। নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেগুলোর তদারকি ও মূল্যায়ন করা জরুরি। তার ভিত্তিতে সঠিক পরিকল্পনা নেয়া ও প্রয়োজনে স¤পদের পুনর্বণ্টন করা দরকার।
আর পুরো প্রক্রিয়ায় তথ্যপ্রবাহ হওয়া উচিত শরীরে রক্ত সঞ্চালনের মতো। শরীরের কোনো অংশে সেটা পৌঁছতে না পারলে যেমন অবশ হয়ে যায় ঠিক, তেমনিভাবে দরকারি ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বহু অংশ অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাই সত্যিকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে সব অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের লক্ষ্য অর্জনে যথাযথ অবদান রাখার সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার।
[ড. মো. আব্দুল হামিদ: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক, ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসিউরেন্স সেলের অতিরিক্ত পরিচালক ও মার্কেটিং র্স্ট্যাটেজি বইয়ের লেখক]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ