বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিন
- আপলোড সময় : ০৭-১১-২০২৬ ০৬:৩০:৪৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০৭-১১-২০২৬ ০৬:৩০:৪৭ পূর্বাহ্ন
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা কেবল একটি পরিবারের শোক ও বেদনার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং জাতির আত্মপরিচয়ের ওপর এক গভীর আঘাত। যে মানুষটি একাত্তরে জীবন বাজি রেখে দেশ স্বাধীন করার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন, স্বাধীন দেশে মৃত্যুর পর তাঁর শেষ বিদায়টুকুও যদি বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাজনক ঘটনা আর কী হতে পারে!
পিরোজপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনায় সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষোভ ও প্রতিবাদ আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। বৃহ¯পতিবার সুনামগঞ্জ শহরের আলফাত স্কয়ারে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশে তাঁরা যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, তা কেবল একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রতি অসম্মানের প্রতিবাদ নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার মর্যাদা রক্ষার দাবিও।
১৯৭১ সালে এ দেশের মানুষ একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের জন্য যুদ্ধ করেননি শুধু, তাঁরা লড়েছিলেন একটি মর্যাদাপূর্ণ, মানবিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়ে। সেই যুদ্ধে অসংখ্য মানুষ জীবন দিয়েছেন, অনেকে হারিয়েছেন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, কেউ হারিয়েছেন স্বজন ও সহায়-সম্পদ। তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। মুক্তিযোদ্ধারা তাই কেবল একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি নন, তাঁরা জাতির গৌরবময় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী।
একজন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর পর তাঁর দাফনে বাধা দেওয়ার ঘটনা সেই ইতিহাসের প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল। কারা, কী কারণে এবং কোন যুক্তিতে এমন বাধা দিয়েছেন, তা অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বের করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে একজন মুক্তিযোদ্ধার শেষ বিদায় বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকলে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তবে অভিযোগের সত্যতা যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদর্শন শুধু জাতীয় দিবসে ফুল দেওয়া কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। তাঁদের জীবদ্দশায় মর্যাদা নিশ্চিত করা, মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় সম্মানে শেষ বিদায়ের ব্যবস্থা করা এবং তাঁদের অবমাননার ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই প্রকৃত সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষায় রাষ্ট্রের অবস্থান হতে হবে স্পষ্ট, দৃঢ় ও আপসহীন।
সুনামগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধারা এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পিরোজপুরের ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে প্রশাসনকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। ভবিষ্যতে দেশের কোথাও যেন কোনো মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা ক্ষুণ্ন না হয়, সে জন্যও প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ।
মনে রাখতে হবে, মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ছোট করা যায় না। বরং এমন ঘটনা জাতির বিবেককে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। যে মানুষগুলোর ত্যাগে আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক, তাঁদের শেষ বিদায়টুকু সম্মানজনক হওয়া রাষ্ট্র ও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব। মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা রক্ষা কোনো অনুগ্রহ নয়, এটি জাতির প্রতি তাঁদের অবদানের ন্যূনতম স্বীকৃতি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়