ব্যাংক যখন ব্যবসায়ীদের পকেটঘড়ি : খেলাপি ঋণের চোরাবালিতে অর্থনীতি
- আপলোড সময় : ২৯-০৯-২০২৬ ০৯:২১:১০ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৯-০৯-২০২৬ ০৯:২১:১০ পূর্বাহ্ন
::শেরগুল আহমেদ ::
আজকের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম ব্যাংকিং খাতের অরাজকতা। দেশের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩২.৭৮ শতাংশই এখন খেলাপি। আন্তর্জাতিক মানদ-ে যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকাকে নিরাপদ মনে করা হয়, সেখানে আমাদের এই চিত্র বিশ্বমঞ্চে এক লজ্জাজনক রেকর্ড।
প্রশ্ন জাগে, একটি উদীয়মান অর্থনীতিতে কীভাবে এই খাতের এমন চরম বিপর্যয় ঘটল? উত্তরটি লুকিয়ে আছে দুটি কাঠামোগত ব্যাধির মধ্যে- প্রথমত, প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যাংকের সংখ্যা এবং দ্বিতীয়ত, দেশের বড় বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে ব্যাংকের মালিকানা চলে যাওয়া।
অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম উপেক্ষা করে বাংলাদেশে বর্তমানে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যাংকের সংখ্যা ৬৩টি। আমাদের চেয়ে বহুগুণ বড় অর্থনীতির দেশ ভারতেও ব্যাংকের সংখ্যা মাত্র ৩৩টি। এই অতিরিক্ত ব্যাংকের সংখ্যা বাজারে কোনো সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি করেনি, বরং তৈরি করেছে এক ‘বিধ্বংসী প্রতিযোগিতা’। আমানত সংগ্রহের জন্য ব্যাংকগুলোর মধ্যে চলে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যা তাদের তহবিল ব্যয় বা ‘কস্ট অব ফান্ড’ বাড়িয়ে দেয়। আর এই বাড়তি খরচ তুলতে গিয়ে ব্যাংকগুলো কোনো সঠিক যাচাই-বাছাই ছাড়াই ঝুঁকিপূর্ণ, অনুৎপাদনশীল এবং নামসর্বস্ব প্রকল্পে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করতে বাধ্য হয়। ফলশ্রুতিতে, যা হওয়ার তাই হচ্ছে-ঋণের টাকা আর ব্যাংকে ফেরত আসছে না। তবে ব্যাংকিং খাতের আসল রক্তক্ষরণ ঘটছে এর মালিকানা কাঠামোর কারণে।
কর্পোরেট গভর্নেন্স বা সুশাসনের মূল কথা হলো- যিনি ব্যাংকের মালিক বা পরিচালক, তিনি কোনোভাবেই সেই ব্যাংকের প্রধান ঋণগ্রহীতা হতে পারেন না। একে অর্থনীতিতে ‘এজেন্সি সমস্যা’ বলা হয়। বাংলাদেশে এই তাত্ত্বিক নিয়মটিকে পুরোপুরি বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে। এখানে বড় বড় শিল্প ও ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো একেকটি ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়েছে বা জোরপূর্বক পর্ষদ দখল করেছে। ফলে, ব্যাংকগুলো আর সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপদ অভিভাবক থাকতে পারেনি; সেগুলো পরিণত হয়েছে একেকটি ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নিজস্ব ‘পকেটঘড়িতে’। এর ফলে জন্ম নিয়েছে ‘পরিচালক ঋণ’ বা ইনসাইডার লেন্ডিং-এর এক কুৎসিত সংস্কৃতি। এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংকের পরিচালকের সাথে সমঝোতা করে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছেন। এই ‘ক্রস-লেন্ডিং’ বা পারস্পরিক যোগসাজশের ঋণের বড় অংশই আর ব্যাংকিং সিস্টেমে ফেরত আসে না, বরং তা সুকৌশলে দেশের বাইরে পাচার হয়ে যায় কিংবা অনুৎপাদনশীল খাতে আটকে পড়ে। এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে টিকিয়ে রেখেছে ‘মুরাল হ্যাজার্ড’ বা নৈতিক ঝুঁকি এবং ‘ক্রোনী ক্যাপিটালিজম’।
যখন কোনো ঋণখেলাপি নিশ্চিত জানেন যে ঋণের টাকা ফেরত না দিলেও রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রভাবে পার পেয়ে যাওয়া যাবে, তখন তিনি আর টাকা ফেরত দেওয়ার তাগিদ অনুভব করেন না। উল্টো, বারবার ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ কিংবা বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে খেলাপিদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। এই সংস্কৃতির কারণে দেশের সৎ ও প্রকৃত ব্যবসায়ীরাও ঋণ পেতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন, আর ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা’ ক্রমান্বয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। অতীতে কৃত্রিম হিসাব এবং দুর্বল নীতিমালার মাধ্যমে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ওগঋ) এবং বৈশ্বিক মানদ- মেনে যখন প্রকৃত হিসাব সামনে আনা হলো, তখন দেখা গেল পুরো খাতটি এক গভীর চোরাবালিতে নিমজ্জিত। এই বিপর্যয় থেকে অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে এখন আর জোড়াতালির সংস্কারে কাজ হবে না। উপার্জনের চেয়ে ব্যয়ের খাত বড় হওয়া এই ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে, দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত (গবৎমবৎ) করে ব্যাংকের সংখ্যা দ্রুত কমিয়ে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থের সংঘাত দূর করতে হবে; পর্ষদে স্বাধীন ও পেশাদার পরিচালকদের সংখ্যা বাড়াতে হবে। সর্বোপরি, কেন্দ্রীয় ব্যাংককে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। ব্যাংক খাতের এই ক্ষত যদি এখনই নিরাময় করা না যায়, তবে এর মাশুল দিতে হবে দেশের সাধারণ জনগণকে এবং পুরো অর্থনীতিকে।
[২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬খ্রি.]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক