বিশ্বজিত রায় ::
সুনামগঞ্জে বৃক্ষরোপণের আড়ালে বরাদ্দ লুটপাটের আয়োজন বেশ জমে উঠেছে। ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির শুরুতে লোভের হাত লাগায় সামাজিক বনায়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের চেষ্টা নস্যাতের শঙ্কা প্রকাশ করছেন পরিবেশকর্মী ও স্থানীয়রা। এ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ থাকলেও গাছ রোপণ সংক্রান্ত দায়সারা তথ্য ও বক্তব্য দায়িত্বশীল দপ্তরের লোকজনের। বন, বন্যপ্রাণী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ‘ন্যাশনাল গ্রিন মিশন’ নামে দেশব্যাপী ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সরকার। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলাই এ কর্মসূচির উদ্দেশ্য। সম্প্রতি একাধিক প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখার পাশাপাশি খোঁজ নিয়ে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের ‘মাঠেমড়া’ পরিস্থিতির কথা জানা গেছে।
পরিবেশ কর্মী ও স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট ভালো। গাছ লাগানোর নামে জেলাজুড়ে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে। কোথায় কিভাবে কি গাছ লাগানো হবে সে ব্যাপারে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা নেই। জনসাধারণকে ধোঁকা দিয়ে সরকারি বরাদ্দ লুটপাটের অভিযোগ স্থানীয়দের। সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এ বছর ১০ হাজার গাছ রোপণ করা হবে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ১০০০, শান্তিগঞ্জে ১০০০, জগন্নাথপুরে ৫০০, দিরাইয়ে ৫০০ ও ছাতকে ২০০০ গাছসহ মোট ৫ হাজার বিভিন্ন জাতের গাছ লাগানো হয়েছে। এলজিইডি’র এ তথ্যের সাথে মাঠপর্যায়ে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, দিরাইয়ে ‘৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ কর্মসূচির আওতায় উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক রোপণকৃত চারার তথ্য প্রেরণ সংক্রান্ত পত্রে ৯৮৯টি গাছ লাগানোর কথা উল্লেখ আছে। এর মধ্যে কুলঞ্জ ইউনিয়নের কুলঞ্জ গ্রামে ৫০০টি এবং ১৬৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিভিন্ন জাতের ৩টি করে মোট ৪৮৯টি গাছ রোপণ করা হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে বৃক্ষরোপণের গ্রহণযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
দিরাই উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাহিমা বেগম, তামিমা আক্তার ও আব্দুল আলী (ছদ্মনাম) মুঠোফোনে জানিয়েছেন, নিজস্ব খরচে বনজ, ফলজ ও ঔষধিসহ তিন জাতের গাছ লাগানো হয়েছে। তাঁদের বিদ্যালয়ে সরকার প্রদত্ত কোনো গাছ লাগানো হয়নি।
কুলঞ্জ গ্রামের আফতাব চৌধুরী বলেন, যতটুকু জানি- পার্শ্ববর্তী তেতুইয়া-ইসলামপুর গ্রামে দেড়-দুইশ গাছ লাগানো হয়েছে। কুলঞ্জ গ্রামে এক বছরের মধ্যে কোন গাছ লাগানো হয়নি।
সম্প্রতি কয়েকটি উপজেলা ঘুরে দেখা যায়, মধ্যনগর বাজারসংলগ্ন সোমেশ্বরী নদীর সেতু এলাকা থেকে ধর্মপাশামুখী সড়কের কিছু অংশে শতাধিক গাছ লাগানো হয়েছে। ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার একাধিক সড়ক ঘুরলেও গাছ রোপণের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, কর্মসূচির রোপণকৃত চারার তথ্য প্রেরণ সংক্রান্ত পত্রে জামালগঞ্জ-মান্নানঘাট সড়কের নয়াহালট-চাঁনপুর অংশে ৯৩০টি এবং জামালগঞ্জ-নোয়াগাঁও সড়কের ঘাগটিয়া-বড় ঘাগটিয়া অংশে ৯৩০টিসহ মোট ১ হাজার ৮৬০টি গাছের কথা উল্লেখ আছে। কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী, জামালগঞ্জের দুই সড়কে ২ হাজার গাছ রোপণের কথা থাকলেও গাছ লাগানো হয়েছে ৫শ’র কিছু বেশি। ২ হাজার বৃক্ষরোপণ সংক্রান্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ লক্ষ ৭৭ হাজার ২০০ টাকা। অন্য আরেকটি পত্রে দুই সড়কে বনজ, ফলজ ও ঔষধিসহ আরও ৫০০টি গাছ রোপণের তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ লক্ষ ১৯ হাজার ৩০০ টাকা।
গত বুধবার সরজমিনে গিয়ে জামালগঞ্জ-সেলিমগঞ্জ সড়কের নয়াহালট-চাঁনপুর অংশে রোপণকৃত গাছ গণনা করে দুই-আড়াইশ গাছের হিসাব পাওয়া গেছে। পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশির ভাগ গাছ মরে গেছে। মশারি সদৃশ্য জালের টুনকো বেড়ায় রক্ষা হয়নি গাছের নিরাপত্তা। জামালগঞ্জ-নোয়াগাঁও সড়কের ঘাগটিয়া-ছোট ঘাগটিয়া অংশে রোপণকৃত গাছের অবস্থাও নাজুক।
জানা যায়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় কর্তৃক স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের বাস্তবায়নাধীন বৃক্ষরোপণের চারা ক্রয় ও সংগ্রহ ২০০ টাকা, রোপণ ৫৩৩ টাকা, পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ১০৫ টাকাসহ একটি গাছে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ৮৩৮ টাকা। আলাদা শ্রমিক দিয়ে পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা থাকলেও লোভের হাত লাগায় রোপণকৃত গাছে মড়ক সৃষ্টি হচ্ছে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জামালগঞ্জের চাঁনপুর গ্রামের প্রবীণ মো. হারুন মিয়া বলেন, বেশির ভাগ গাছ মইরা তেজপাতা হইয়া গেছে। এই গাছ রোপণ কইরা জনগণ ও সরকার কারো কোন উপকার হইতো না। মাঝপথে লাভ হইবো যারা রোপণ করছে তারার। সাধারণ মানুষ কিচ্ছু জানে না।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সুনামগঞ্জের সদস্য সজল কান্তি সরকার বলেন, বৃক্ষরোপণের চেয়ে সংরক্ষণ ও পরিচর্যা বেশি জরুরি। আমাদের অনেকের দেশপ্রেম, প্রকৃতি, পরিবেশ প্রেম কিছু নেই। বৃক্ষরোপণ কাদের দিয়ে করলে ভালো হবে, প্রকল্প গ্রহণের আগে সেটা ভাবা দরকার। সবকিছু রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় হয়। কোন জবাবদিহিতা না থাকায় অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে।
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সঞ্জীব সরকার বলেন, উপজেলায় পৃথক পৃথকভাবে গাছ রোপণ করা হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় একাধিক দপ্তর সম্পৃক্ত আছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গাছ রোপণের বিষয়ে শিক্ষা অফিস বলতে পারবে।
সুনামগঞ্জ বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, আমরা ২৭ লক্ষ গাছ রোপণের প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কিন্তু এখনও অনুমোদন হয়নি। গাছ রোপণের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা এখন বলা যাচ্ছে না।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. মতিউর রহমান খান বলেন, বিভিন্ন দপ্তর গাছ রোপণ করছে। সড়ক, জলমহাল, খালের পাশে গাছ রোপণ করা হবে। কতটি রোপণ হবে তা বন বিভাগ বলতে পারবে। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখা হবে।
সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, জেলায় সর্বমোট ১০ হাজার গাছ রোপণ করা হবে। এর মধ্যে ৫ হাজার রোপণ হয়েছে। বাকিগুলো কেন লাগায়নি জানতে চাওয়া হবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি
নামমাত্র চারা লাগিয়ে বরাদ্দ লুটপাটের আয়োজন
- আপলোড সময় : ১৪-০৯-২০২৬ ০৯:২০:৩৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৪-০৯-২০২৬ ০৯:২৩:১১ পূর্বাহ্ন
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ