সাংস্কৃতিক লড়াই যে কারণে জরুরি
- আপলোড সময় : ১৩-০৯-২০২৬ ০৯:১৮:৩৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ১৩-০৯-২০২৬ ০৯:১৮:৩৭ পূর্বাহ্ন
সংস্কৃতি কোনো সমাজের নিছক বিনোদনের বিষয় নয়; সংস্কৃতি একটি জাতির চিন্তা, চেতনা, মূল্যবোধ ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান শক্তি। তাই সাংস্কৃতিক পরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা মানে মানুষের চিন্তার স্বাধীনতাকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বক্তব্য- “সাংস্কৃতিক লড়াই সব লড়াইয়ের ভিত্তি” - এই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে মানুষ কী ভাববে, কী বলবে, কী গান গাইবে, কোন শিল্পচর্চা করবে কিংবা কোন মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবে - এসব বিষয়ে ভয়, চাপ বা নিষেধাজ্ঞা থাকতে পারে না। অথচ আমাদের সমাজে এখনো শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা প্রকাশকে কখনো রাজনৈতিক, কখনো ধর্মীয়, কখনো সামাজিক অজুহাতে বাধাগ্রস্ত করার প্রবণতা দেখা যায়। এটি শুধু শিল্পের জন্য হুমকি নয়; দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রের জন্যও বিপজ্জনক।
সংস্কৃতির শক্তি সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায় তখনই, যখন সমাজ সংকটে পড়ে। গণআন্দোলন, দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো জাতীয় সংকটে গান, কবিতা, নাটক, গ্রাফিতি ও শিল্প মানুষের মধ্যে সাহস ও সংহতি তৈরি করে। কারণ সংস্কৃতি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়; যুক্তির পাশাপাশি বিবেক ও চেতনাকে নাড়া দেয়। যে কারণে সাংস্কৃতিক কর্মকা-কে দুর্বল করে কোনো সমাজকে দীর্ঘদিন সুস্থ ও গণতান্ত্রিক রাখা সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের ইতিহাসও এর সাক্ষ্য বহন করে। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে সাম্প্রতিক গণআন্দোলন - প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে সংস্কৃতিকর্মীরা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। গান-কবিতা-নাটক মানুষের মধ্যে প্রতিরোধের ভাষা তৈরি করেছে। ফলে সংস্কৃতিকে কেবল মঞ্চ, মেলা কিংবা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এর প্রকৃত শক্তিকে খাটো করা হয়।
তবে সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের অর্থ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, দল বা মতের বিরুদ্ধে আরেকটি সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা নয়। বরং এর লক্ষ্য হওয়া উচিত বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অবস্থান এবং নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মর্যাদা নিশ্চিত করা। ভিন্নমতকে সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান শর্ত।
রাষ্ট্রেরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। কোনো গোষ্ঠীর চাপের মুখে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করা, শিল্পচর্চায় অযাচিত হস্তক্ষেপ কিংবা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। রাষ্ট্রকে হতে হবে সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক, নিয়ন্ত্রক নয়।
আজ প্রয়োজন সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বিভাজন কমিয়ে একটি মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা। কারণ মানুষের চিন্তার স্বাধীনতা যত শক্তিশালী হবে, গণতন্ত্রের ভিতও তত দৃঢ় হবে। সংস্কৃতির লড়াই তাই কেবল শিল্পীদের লড়াই নয় - এটি মুক্তচিন্তা, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের লড়াই।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সম্পাদকীয়