দ্রোহ ও মানবতার জয়গান : বায়রনের ‘প্রমিথিউস’ এবং নজরুলের ‘বিদ্রোহী’
- আপলোড সময় : ২৮-০৮-২০২৬ ০৮:৫২:০১ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৮-০৮-২০২৬ ০৮:৫২:০১ পূর্বাহ্ন
শেরগুল আহমেদ:
সাহিত্য সবসময়ই অন্যায়, অবিচার এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। ভিন্ন সময়, ভিন্ন ভূগোল এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন সংস্কৃতির দুজন মহান কবি- লর্ড বায়রন এবং কাজী নজরুল ইসলাম - তাঁদের লেখনীর মাধ্যমে মানবাত্মার অদম্য স্বাধীনতা ও দ্রোহের যে মশাল জ্বালিয়েছিলেন, তা আজও বিশ্বসাহিত্যে দেদীপ্যমান। ১৮১৬ সালে প্রকাশিত বায়রনের ওড বা স্তোত্রধর্মী কবিতা ‘প্রমিথিউস’ (চৎড়সবঃযবঁং) এবং ১৯২১ সালে রচিত নজরুলের কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’ - উভয় সৃষ্টির মূল দর্শনই হলো স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে ব্যক্তির একক অবাধ্যতা এবং মানবকল্যাণে চরম আত্মত্যাগ।
১. মিথলজির যুগান্তকারী রূপান্তর :
উভয় কবিই তাঁদের কবিতায় প্রচলিত ধর্মীয় ও পৌরাণিক (গুঃযড়ষড়মরপধষ) চরিত্র এবং প্রতীককে স¤পূর্ণ নতুন ও বৈপ্লবিক অর্থে ব্যবহার করেছেন।
বায়রনের প্রমিথিউস :
গ্রীক পুরাণের টাইটান দেবতা প্রমিথিউস, যিনি দেবতাদের রাজা জিউসের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে স্বর্গ থেকে আগুন (জ্ঞান ও সভ্যতা) চুরি করে এনেছিলেন মানুষের জন্য। বায়রনের কাছে প্রমিথিউস কোনো দূরবর্তী দেবতা নন, বরং তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানবীয় প্রতিরোধের এক জীবন্ত প্রতীক।
নজরুলের বিদ্রোহী:
নজরুল তাঁর কবিতায় হিন্দু ও ইসলামিক উভয় পুরাণের সমাহার ঘটিয়েছেন। তিনি একাধারে শিবের তা-ব, কৃষ্ণের বাঁশরি, পরশুরামের কুঠার এবং আরবের বেদুইন ও চেঙ্গিসের ঝড়ের রূপ ধারণ করেছেন। প্রথাগতভাবে এই শক্তিগুলোকে ধ্বংসাত্মক মনে হলেও, নজরুলের দর্শনে তা ছিল জরাজীর্ণ ও পরাধীন সমাজকে ভেঙে নতুন করে গড়ার এক পরম পবিত্র ‘সৃজন-বেদনা’।
২. স্বৈরাচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন দ্রোহ :
উভয় কবিতার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো কোনো অবস্থাতেই অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করা। বায়রনের জিউস ছিলেন একজন অত্যাচারী, প্রতিহিংসাপরায়ণ শাসক, যিনি প্রমিথিউসকে অনন্তকাল ধরে পাহাড়ে শিকল দিয়ে বেঁধে ঈগল পাখি দিয়ে তাঁর কলিজা খাইয়ে নির্যাতন করতেন। কিন্তু প্রমিথিউস জিউসের অসীম ক্ষমতার সামনেও তাঁর স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিকে (ডরষষ) বিসর্জন দেননি। তাঁর এই নীরব, দীর্ঘস্থায়ী সহনশীলতাই ছিল স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চপেটাঘাত।
নজরুলের লড়াই ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে এবং সমাজের শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে। তিনি বুক চিতিয়ে বলতে পেরেছিলেন- “আমি চির-উন্নত শির! / শির নেহারি’ আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!” নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা মহাবিশ্বের যেকোনো আধিপত্যবাদী শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করতে দ্বিধা করেনি।
৩. মানবতাবোধ ও চরম আত্মত্যাগ :
এই দুই কবির দ্রোহ কিন্তু কোনো অন্ধ ধ্বংসলীলা নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে মানবজাতির প্রতি এক গভীর, অকৃত্রিম ভালোবাসা। প্রমিথিউস জানতেন জিউসের নির্দেশ অমান্য করলে তাঁর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু মানবজাতিকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে তিনি নিজের অমরত্ব ও সুখ বিসর্জন দিয়েছিলেন। বায়রনের মতে, প্রমিথিউসের এই কষ্টই মানুষকে শিখিয়েছে কীভাবে নিজের দুঃখকে এক মহান শক্তিতে রূপান্তর করতে হয়। নজরুলও ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় কেবল নিজের অহং প্রকাশ করেননি। তাঁর বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য ছিল নিপীড়িত মানুষের মুক্তি।
কবিতার শেষ অংশে তিনি স্পষ্ট করে দেন তাঁর এই শান্ত হওয়ার শর্ত- “যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না, / অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না— / বিদ্রোহী রণ-ক্লান্ত / আমি সেই দিন হব শান্ত।”
৪. মৃত্যু ও পরাজয়কে জয়ে রূপান্তর :
দুটি কবিতার দার্শনিক সমাপ্তি ঘটে এক পরম আশাবাদে, যেখানে অত্যাচারীর আপাত জয়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানুষের আত্মিক বিজয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বায়রন তাঁর কবিতার শেষ লাইনে প্রমিথিউসের এই অদম্য চেতনাকে মানুষের জীবনের পথপ্রদর্শক হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন- “গধশরহম উবধঃয ধ ঠরপঃড়ৎু” (মৃত্যুকে একটি বিজয়ে পরিণত করা)। অর্থাৎ, শরীর ধ্বংস হলেও আদর্শের কখনো মৃত্যু হয় না। নজরুলও নিজেকে ঘোষণা করেছেন “চির-বিদ্রোহী বীর” হিসেবে, যিনি বিশ্ব ছাড়িয়ে এক মহিমান্বিত উচ্চতায় একাকী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছেন। শৃঙ্খল ভাঙার এই গান মানুষকে কাপুরুষতার গ-ি থেকে বেরিয়ে বীরত্বের স্বাদ দেয়।
উপসংহার :
লর্ড বায়রনের ‘প্রমিথিউস’ যদি হয় নীরবে চরম নির্যাতন সহ্য করে স্বৈরাচারকে পরাজিত করার এক দার্শনিক ধ্রুপদী রূপ, তবে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ হলো সেই শিকল ভেঙে অন্যায়ের বুক চিরে বজ্রকণ্ঠে নিজের অধিকার আদায়ের এক উত্তাল কালবৈশাখী ঝড়। দেড়শত বছরের ব্যবধানে এবং ভৌগোলিক দূরত্বের গ-ি পেরিয়েও এই দুই কবির দর্শন এক বিন্দুতে এসে মিলেছে - তা হলো মানুষের জয়গান।
বর্তমান বিশ্বের যেকোনো প্রান্তেই যখনই মানুষের স্বাধীনতা হরণ করা হয়, তখনই বায়রনের প্রমিথিউসের নীরব অহংকার এবং নজরুলের বিদ্রোহীর রণ-হুংকার আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস যোগায়।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক