নিষ্ক্রিয়তার চড়া মূল্য : প্লেটোর দর্শন ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
- আপলোড সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ০৮:৫৮:৪৭ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৫-০৮-২০২৬ ০৮:৫৮:৪৭ পূর্বাহ্ন
শেরগুল আহমেদ :
“ইঁঃ ঃযব পযরবভ ঢ়বহধষঃু রং ঃড় নব মড়াবৎহবফ নু ংড়সবড়হব ড়িৎংব রভ ধ সধহ রিষষ হড়ঃ যরসংবষভ যড়ষফ ড়ভভরপব ধহফ ৎঁষব.” “ভালো মানুষেরা রাজনীতি এড়িয়ে গেলে, তাদের শাস্তি হলো খারাপ মানুষের শাসনের অধীন হওয়া।”
- আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর বলা এই কথাটি আজ ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে তাকালে এক অমোঘ ও নির্মম সত্য বলে মনে হয়। আমাদের সমাজে একটি বহুল প্রচলিত বাক্য রয়েছে- “রাজনীতি ভালো মানুষের জায়গা নয়” কিংবা “রাজনীতি নোংরা খেলা”। যুগের পর যুগ ধরে মধ্যবিত্ত ও সচেতন নাগরিক সমাজ এই আপ্তবাক্য বিশ্বাস করে দেশ পরিচালনা, নীতি নির্ধারণ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। সৎ, শিক্ষিত এবং যোগ্য মানুষেরা যখনই রাজনীতিকে একপ্রকার “অচ্ছুত” ভেবে ড্রয়িংরুমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ রেখেছেন, তখনই সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে সুবিধাবাদী, দুর্নীতিবাজ এবং পেশিশক্তির চর্চাকারীরা। সমাজ ব্যবস্থার অবক্ষয় ও শূন্যতার সুযোগে বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় এই রাজনৈতিক উদাসীনতার ফল এখন প্রতিটি স্তরে দৃশ্যমান। যোগ্য ও নীতিবান মানুষেরা ছিটকে যাওয়ার কারণে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এমন মানুষের আধিপত্য বেড়েছে, যাদের সাথে জনকল্যাণের কোনো সম্পর্ক নেই। এর ফলে:
দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ :
অর্থপাচার, ব্যাংক কেলেঙ্কারি এবং মেগা প্রজেক্টের আড়ালে লুটপাট সাধারণ নিয়মে পরিণত হয়েছে।
মেধাবীদের দেশত্যাগ (ব্রেন ড্রেন) :
দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ ভালো মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠায় তরুণ ও মেধাবীরা দলে দলে দেশ ছাড়ছেন।
বিচারের বাণী নীরবে কাঁদা :
সাধারণ মানুষ যখন কোনো অন্যায়ের শিকার হয়, তখন তারা আইনি ব্যবস্থার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে।
‘নিরপেক্ষতা’ যখন অপরাধ প্লেটোর এই উক্তি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, রাজনীতিতে ‘নিরপেক্ষ’ বা ‘নিষ্ক্রিয়’ থাকার কোনো সুযোগ নেই। আপনি রাজনীতিতে না জড়ালেও, রাজনীতির নেওয়া সিদ্ধান্ত আপনার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করবে। বাজারের নিত্যপণ্যের দাম কত হবে, আপনার সন্তান কী শিক্ষা পাবে, কিংবা হাসপাতালে আপনি সঠিক চিকিৎসা পাবেন কিনা - তা ঠিক করে রাজনীতিই। তাই ভালো মানুষের নিষ্ক্রিয়তা আসলে খারাপ মানুষদের অন্যায় করার লাইসেন্স বা অনুমতি দেওয়ার শামিল।
উত্তরণের পথ কী? :
বাংলাদেশ যদি একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তবে এই বৃত্ত ভাঙতে হবে। ভালো মানুষদের কেবল নিজেদের ভালো থাকার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
১. সচেতনতা বৃদ্ধি: সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যায় দেখে চুপ থাকার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে।
২. নেতৃত্বে অংশগ্রহণ: স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সৎ ও যোগ্য তরুণদের রাজনীতিতে যুক্ত হতে হবে।
৩. ভোটের অধিকার ও চর্চা: কেবল ভোটের দিন ছুটি কাটানো নয়, যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
উপসংহার :
ইতিহাস সাক্ষী, কোনো সমাজ চিরকাল খারাপ মানুষের শাসনে বন্দি থাকে না, যদি না ভালো মানুষেরা নিজেদের গুটিয়ে রাখে। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থাকে যদি আমরা একটি সুস্থ, মানবিক এবং দুর্নীতিমুক্ত রূপ দিতে চাই, তবে প্লেটোর এই সতর্কবাণীকে আমাদের বুকে ধারণ করতে হবে। রাজনীতিকে এড়িয়ে যাওয়া কোনো বুদ্ধিমত্তার পরিচয় নয়, বরং তা নিজের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দাসত্ব ডেকে আনার নামান্তর। ভালো মানুষেরা যখনই সাহসের সাথে দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসবে, তখনই সমাজ থেকে অন্যায়ের অন্ধকার দূর হতে বাধ্য।
[শেরগুল আহমেদ, প্রাক্তন অধ্যক্ষ]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

সুনামকন্ঠ ডেস্ক